kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রহস্যজট

বুড়ো লোকটা খেয়ালি ছিল

ইশতিয়াক হাসান

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বুড়ো লোকটা খেয়ালি ছিল

অঙ্কন : মানব

‘বাবা এমনিতেই একটু খেয়ালি টাইপের মানুষ ছিলেন। আর মারা যাওয়ার আগে আরো কেমন পাগলাটে আচরণ করছিলেন।

তারপর মাকে যখন একটা খাম দিয়ে বললেন, ওটা আমাদের জন্য একটা উপহার, তখন মা খুব একটা পাত্তা দেননি। বাবা মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর পর গতকাল খামটা আমি খুলে দেখি। তুই আজ আসছিস, তাই ওটা নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি করিনি। তুই এলে একসঙ্গে এটার সুরাহা করা যাবে ভেবে রেখে দিয়েছি। ’ অনেক কথা একটানা বলে থামল রবি।

কিছু না বলে নীল রঙের খামটা হাতে তুলে নিল গোয়েন্দা রবিন হাসান। খামটা খোলার আগে কিছু সময় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। আজ সকালেই সে বন্ধু রবির বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। বান্দরবানের রুমায় বিশাল বাড়ি রবিদের। শুধু বেড়ানোই তার এখানে আসার উদ্দেশ্য ছিল। আজ সকালে বান্দরবান পৌঁছে দেখে বাস স্টেশনেই তাদের জিপটা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে রবি। রুমা পর্যন্ত পৌঁছতেই লেগেছে ঘণ্টা আড়াই। নাশতা-পানি খাওয়ার পরই রবি এনে দিল খামটা।

নীল খামটা খুলতেই একটা ছোট কাগজ পেল রবিন। ভেতরের লেখাটা পড়ল, ‘খুদে খুদে মানুষ। আমার খুব প্রিয়। অশুভ সংখ্যা হলেও আমার ভারি পছন্দ। মনে রাখবে, ভুল ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত তাতে কিছু আসে-যায় না। তবে অনেক সময় ভুলটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ’

‘আমি বাবার এই লেখার কোনো মাথামুণ্ডু পাচ্ছি না। এটা কী শেষ বয়সে শুধুই খেয়ালের বসে লেখা। নাকি জরুরি কোনো সংকেত! বুঝতে পারছি না। ’ হতাশা প্রকাশ করল রবি।

‘চল তো আংকলের রুমটা একটু দেখি। ’ বলল রবিন।

রবি ওকে ডাইনিং রুম থেকে একটু প্যাসেজ ধরে বেশ বড়সড় একটা কামরায় নিয়ে এলো। তারপর বলল, ‘বাবা এই কামরাটায়ই থাকতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর মা সামনের দিকের একটা কামরায় চলে এসেছেন। এটা মোটামুটি আগের মতোই রেখে দেওয়া হয়েছে। ’

কামরাটায় বেশ বড়সড় একটা দেয়াল আলমারি, একটা শোকেস আর পুরনো আমলের একটা খাট আছে। শোকেসের ওপরের তাকেই অনেকগুলো পুতুল চোখে পড়ল রবিনের। গুনে দেখল মোট ১৩টা। একটা পুতুল বুড়ো একজন লোকের। মাথায় বাজারভর্তি একটা ঝুড়ি। মাথায় করে কলসি নিয়ে যাওয়া আদিবাসী এক মেয়েও আছে। একটা পুতুল আবার বছর বারো-তেরোর একটা ছেলের। কিন্তু পা দুটি উল্টো দিকে। একটা আবার শিশু কোলে এক মায়ের। কোমরে পিস্তল ঝোলানো আমেরিকান এক আউটলর আদলে গড়া একটি পুতুলও আছে। আছে ইংরেজ সেনা আর রাইফেল হাতে এক ডাকুর পুতুলও।

শোকেসের অন্য সব জিনিসের দিকে নজর দিল। অ্যান্টিক ছুরি, খুদে একটা তলোয়ার, পুরনো কলমদানিসহ আরো নানা জিনিস চোখে পড়ল। রবির অনুমতি নিয়ে শোকেস থেকে একটা জিনিস তুলে নিল রবিন। পকেটে পুরল। তারপর বলল, ‘চল বাড়ির বাইরেটা একটু দেখে আসি। ’

একটা পাহাড়ের ওপর বাড়িটা। গোটা পাহাড়টাই রবিদের। ওর দাদা প্রায় ৬০-৭০ বছর আগে প্রথম এখানে বাড়ি বানিয়ে থাকা শুরু করেন। রবির বাবাও পাহাড়ি জায়গাটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। তাই ব্যবসার কাজে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করলেও অন্য কোথাও আর বাড়ি বানাননি। এই দুর্গম জায়গায়ই পড়ে ছিলেন। এখন এখানে আছে কেবল রবির মা আর বড় ভাই। রবি ঢাকায় চাকরি করে। ছুটি পেলেই ঘুরে যায়। জায়গাটা টানেও ওকে। পাহাড়ি পথ ধরে দুজন হাঁটতে শুরু করল। পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে বেশ। টিয়ার একটা ঝাঁক মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখে খুব ভালো লাগল রবিনের। দূরের একটা জঙ্গল হাতের ইশারায় দেখিয়ে রবি বলল, ‘ওখানে হরিণ আছে। বুনো শুয়োর, এমনকি কখনো কখনা চিতাও আস্তানা গাড়ে। ও জায়গাটাও পড়েছে আমাদের সীমানায়। বাবা বন্য প্রাণী ও জঙ্গল ভালোবাসতেন। তাই আমরাও এগুলো আগের মতোই রেখে দিয়েছি। ’

একটা গাছের নিচে বসে পড়ে পকেট থেকে জিনিসটা বের করল রবিন। একটু খুঁজতেই পেছনে কাঠের গায়ে ছোট্ট একটা আলগা জায়গা পেয়ে গেল। টান দিতেই খুলে এলো। ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে দোমড়ানো একটা নীল খাম বের করে আনল। খামের ভেতরে একটা কাগজ।

‘খাইছে, তুই তাহলে এসেই বাবার ধাঁধাটা সমাধান করে ফেললি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আরো একটা ধাঁধা উপস্থিত। ’

কাগজটা খুলে রবিকে দেখায় রবিন। লেখা, ‘আঁকাআঁকি ভারি মজা। ঠিক যেন সত্যিকারের পৃথিবী। আগের নির্দেশটা মনে রাখবে, তবেই চলবে। ’

‘হায়! এটারও তো কোনো আগামাথা পাচ্ছি না। ’ মাথায় হাত দিয়ে বলল রবি।

‘তোর বাবা, মানে আংকেল কি ছবি আঁকতেন। ’ এক মুহূর্ত ভেবে জানতে চাইল রবিন।

‘না, বাবা ছবি আঁকতেন না। তবে ছবি ভালোবাসতেন। মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগেও এক বন্ধুকে দিয়ে চারটা ছবি আঁকিয়েছিলেন। বেশ সুন্দর ওগুলো। আমাদের ড্রইংরুমের দেয়ালেই ঝোলানো আছে। ’

‘চল তো একবার দেখি। ’ বলে উঠে-পড়ে দ্রুতগতিতে হাঁটতে শুরু করল রবিন। তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে প্রায় দৌড়াতে হলো রবিকে। বাড়ির কাছে এসে গতি কমাল রবিন। দুজন ঢুকে পড়ল ড্রইংরুমে। এই কামরাটার ভেতর দিয়েই বাড়ির অন্দরমহলে গিয়েছিল রবিন। তবে তখন ঠিকভাবে দেখার সুযোগ পায়নি। পুরনো ধাঁচের বিশাল কামরা। মুখোশ, হরিণের শিং, তলোয়ারসহ আরো নানা জিনিসের সঙ্গে দেয়ালে ঝোলানো চারটি ছবিও দেখল। চার দেয়ালে চারটা ছবি। পূর্ব পাশের দেয়ালের ছবিটা একটা গ্রামের দৃশ্য। বাড়িগুলো ছনের। বিশাল একটা পুকুর। উঠোনে মেয়েরা কাজ করছে, পাশেই আবার একটা ক্ষেতে ফসল বুনছে কৃষক। সদ্য ফসল কাটা একটা জমিতে ছেলেমেয়েরা খেলছে। উত্তরের দেয়ালের ছবিটায় আবার কয়েকটা রাখাল ছেলে গরু চরাচ্ছে। একজন আবার গরুর পিঠে চড়ে বসেছে। পশ্চিমের দেয়ালের ছবিতে পাহাড়ের মধ্যে একটা জঙ্গল। এক পাল শুয়োর মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। একটার মাথার শিং জোড়া আবার সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে। দূরে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে শরীর টানটান করে শুয়ে আছে একটা বাঘ। যেকোনো সময় ঝাঁপিয়ে পড়বে পালের কোনো একটা প্রাণীর ওপর। শেষ ছবিটা সবচেয়ে অদ্ভুত। একটা লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তার কাঁধে বছর পনেরোর এক কিশোর। তার কাঁধে আবার বছর তিনেকের এক শিশু। তিনজনের মুখেই হাসি। ছবিগুলোর সব খুঁটিনাটি মনে গেঁথে নিল রবিন। তারপর রবির সঙ্গে নিজের কামরাটায় চলে এলো। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ঘণ্টা দুয়েক ঘুমাল রবিন। গত রাতে গাড়িতে ঘুম হয়নি।

বিকেলে দুই বন্ধু বের হলো এলাকাটা ঘুরেফিরে দেখতে। মাইল দুয়েক দূরে মারমাদের একটা পাড়া আছে। ছোট একটা টিলার ওপর পাড়াটা। পাড়ার অনেকেই রবিকে চেনে। পাড়ার বুড়ো কারবারি টিটু মারমার সঙ্গে আলাপ বেশ জমে উঠল রবিনের। পুরনো দিনের অনেক গল্প বললেন বুড়ো। বললেন রবির দাদা আজমল সাহেব আর বাবা ইয়াসিন সাহেবের গল্পও। আরো বললেন, রবির বাবার সঙ্গে নাকি মাঝেমধ্যেই জঙ্গলের পুরনো বাড়িটায় যেতেন তিনি। মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগেও গেছেন।

‘ওখানে কোনো বাড়ি আছে নাকি?’ জানতে চাইল রবিন।

‘দাদার তৈরি করা একটা ছোট কাঠের বাড়ি আছে। পাশেই একটা ছড়া আছে। বন্য প্রাণীরা আসে। বাবা ওদের দেখতেই কখনো রাত কাটাতেন বাড়িটায়। ’ জবাব দিল রবি।

সন্ধ্যার আগেই ওরা ফিরে এলো রবিদের বাড়িতে। নাশতা করে রবিন অনেকক্ষণ আবার ঘুরেফিরে ছবিগুলো দেখল। তারপর একটা ছবির নিচে এসে রবিকে ওটা নামাতে বলল। রবি একটা টুল এনে ছবিটা নামিয়ে সাবধানে রবিনের হাতে দিল। তবে রবিনের চোখ ছবির পেছনের দেয়ালে। একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ দেয়ালের সঙ্গে সাঁটা। ওটা খুলে আনতেই ভেতরে একটা নীল খাম পেল রবিন। আগের মতোই একটা কাগজ বের হলো ভেতর থেকে। লেখা—‘জঙ্গলের মধ্যে এক বাড়ি। ওপরে নয়, নিচে। সূত্র আছে গোড়া থেকেই। ’

‘একটা টর্চ আন। ’ রবিকে বলল রবিন।

রবি টর্চ আনতেই তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলল, ‘চল তোদের ওই জঙ্গলবাড়িতে। ’ মিনিট দশেক হাঁটতেই জঙ্গলের সামনে পৌঁছে গেল। একটা সরু পথ ঢুকে গেছে ভেতরে। রবির টর্চের আলোতে ওই পথে চলল দুজন। হঠাৎ দুজনকে চমকে দিয়ে একটা বনবিড়াল ছুটে গেল সামনে দিয়ে। চার-পাঁচ মিনিট হাঁটতেই বাড়িটা দেখা গেল। একটা পাহাড়ি ঝিরির পাশে কাঠের একতলা বাড়ি। ভেতরে ঢুকে কী যেন খুঁজতে শুরু করল রবিন। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেল। একটা ট্র্যাপ ডোর। ওটা সরাতেই নিচে নামার সিঁড়ি।

‘এটা দিয়ে যে নিচে নামা যায় জানতামই না। কে বানিয়েছিল এটা—বাবা, না দাদা কে জানে?’ অবাক হয়ে বলল রবি।

টর্চের আলো ঘুটঘুটে অন্ধকার দূর করতে পারছে কমই। তবে এর মধ্যেই পাতালের কামরাটায় নেমে এলো দুজন সিঁড়ি বেয়ে। ভালোভাবে টর্চ মারতে দেখা গেল, একটা ১০ বাই আট ফুট কামরা। দেয়ালের গায়ে আটকানো চারটা বাক্স। একটার রং সবুজ, একটা হলুদ, একটা নীল আর একটা লাল। দেরি না করে নির্দিষ্ট বাক্সটা খুলে ফেলল রবিন। ভেতর থেকে বেরোল একটা স্ট্যাম্প অ্যালবাম। অ্যালবামটা ভালোভাবে দেখে রবিন বলল, ‘দুষ্প্রাপ্য সব স্ট্যাম্প আছে এখানে। তোর বাবা এগুলো কিভাবে সংগ্রহ করলেন জানি না। তবে এখানে এমন কিছু স্ট্যাম্প আছে, যেগুলোর দাম লাখ টাকা। আর এগুলোই তোদের জন্য তাঁর উপহার। মারা যাওয়ার আগে একটু হেঁয়ালি করে গিয়েছিলেন খেয়ালি বুড়ো মানুষটা।

পাঠক রবির বাবার ধাঁধাগুলোর সমাধান করতে হবে আপনাকেও।


মন্তব্য