kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রহস্যজট

তমাপ্পির রহস্যভেদ

প্রিন্স আশরাফ

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



তমাপ্পির রহস্যভেদ

অঙ্কন : মানব

হঠাৎ এক রবিবার পূর্ণতা মায়ের কাছে আবদার ধরল, তমাপ্পির কাছে বেড়াতে যাব। পূর্ণতার রেজাল্ট বরাবরই ভালো।

সে জন্য মাও আর তেমন আপত্তি করলেন না। তমাপ্পির বাসায় গিয়ে দেখে আপ্পি বাসায় নেই। আন্টি বিরক্ত স্বরে বললেন, ‘গোয়েন্দাগিরির ঠেলায় মেয়ের কি আর বাসায় থাকার জো আছে। থানা থেকে ওর ইন্সপেক্টর চাচু ফোন দিয়েছেন। সে ফোন পেয়েই দৌড়ে গেছে। ’

পূর্ণতার তমাপ্পির কাছে আসা এই গোয়েন্দাগিরির সাগরেদ হওয়ার জন্য। সে জিজ্ঞেস করল, ‘কোন থানায়?’

‘কেন? তুই কি এক্ষুনি সেখানে ছুটবি নাকি? তোদের যে কী হয়েছে! ডানপিটেমো। ’ আন্টি গজগজ করতে করতে থানায় ফোন করে জানিয়ে দিলেন, পূর্ণতা যাচ্ছে।

থানায় পৌঁছেই দেখল তমাপ্পি ইন্স্পেক্টর জাহিদ চাচ্চুর সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় করছে। পূর্ণতাকে দেখে তমাপ্পি বলল, ‘ওঠ, গাড়িতে ওঠ। যেতে যেতেই বলব। বেশি দূরে না। ’

সত্যি অল্প সময়েই ওরা পৌঁছে গেল ঘটনাস্থলে। আবাসিক এলাকা। এখানকার একটা ফ্ল্যাটে গত রাতে খুন হয়েছেন রহিম আখন্দ। যদিও বাড়ির লোকেরা পুলিশকে ঘটনাটি জানায় দিনের বেলা। ভদ্রলোক ছিলেন হিরে ব্যবসায়ী। বড় বাজারে তাঁর স্বর্ণালংকারের দোকান আছে। ফ্ল্যাটের লণ্ডভণ্ড অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে, ডাকাতির উদ্দেশ্যে এসেছিল। ডাকাতি করার সময় রহিম আখন্দকে খুন করে রেখে যায়। তিনি বিয়ে থা, ঘর-সংসার করেননি। তবে ব্যাচেলর হলেও একেবারে নিঃসঙ্গ ছিলেন না। চাকরবাকর, আত্মীয়-পরিজন দিয়ে বেশ কয়েকজনই ওই বাড়িতে থাকত। বড় বোনের ছেলে সুমন মামার কাছে থেকে কলেজে পড়ে। সে নাকি অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করে। চাচাতো ভাই শিহাব ব্যবসার কাজে গ্রাম থেকে এসে এখানেই আশ্রয় নিয়েছে। ব্যবসাপাতি এখন লাগসই মতো করে উঠতে পারেনি। ভাইয়ের এখানে খায়দায় আর ব্যবসার সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। রহিম আখন্দ তাঁর স্বর্ণকারের ব্যবসায় লাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে নাকি স্বাধীন ব্যবসা করবে। আর আছে বিদেশ ফেরত এক বোনজামাই নূর হোসেন। সে-ও কিছুদিনের জন্য এখানে এসেছে। কোমর ব্যথার চিকিত্সা নিতে। রান্না ও ঘরের দেখাশোনার কাজের লোক জিতু মিয়া আছে। একটু মেয়েলি স্বভাবের হলেও ঘরের কাজ খুব ভালোই করে।

ইন্সপেক্টর জাহিদ তমাপ্পি আর পূর্ণতাকে নিয়ে খুনের রুমে ঢুকলেন। ভেতরের ভারী লোহার আলমারিটা খোলা। চেয়ার-টেবিলও জায়গা থেকে সরে গেছে। বিছানার ওপরটা এলোমেলো। ধস্তাধস্তির স্পষ্ট চিহ্ন। খাটের পাশে মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে আছেন রহিম আখন্দ। বুকের ঠিক বাঁ পাশে ধারালো ছুরি বেশ অনেকটাই ঢুকে গেছে।

তমাপ্পির সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণতাও গোয়েন্দার দৃষ্টিতে গোটা কামরাটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। পূর্ণতাই তমাপ্পিকে জিনিসটা দেখালেন। খাটের নিচে একটি জ্বলন্ত টর্চলাইট তখনো বেশ উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে জ্বলছে। যদিও দিনের আলো বেশ ভালোভাবে ফুটে গেছে। তবুও টর্চের আলোও কিছুটা দেখা যাচ্ছে। একপাশে একটা দামি সিগারেট লাইটার পাওয়া গেল। হাত থেকে পড়ে গিয়ে একপাশে একটু ভেঙে গেছে।

জেরা করার জন্য সবাইকে ডাকা হলো। প্রথমে এলো ভাগ্নে সুমন। জানাল, অন্যান্য দিন অনেক রাত জেগে পড়লেও কাল লোডশেডিং থাকার কারণে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ করে ধস্তাধস্তি আর চিত্কার-চেঁচামেচির শব্দে অন্ধকারের মধ্যেই উঠে বসে।

‘তখন রাত কত হবে?’ তমাপ্পি জিজ্ঞেস করল।

‘ঘড়ি দেখিনি। তবে খুব বেশি রাত বোধ হয় হয়নি। ৯টার দিকে লোডশেডিং হওয়ায় ঘুমিয়ে পড়ি। আগের থেকেই এই এলাকায় মাইকিং হয়েছিল ৩ ঘণ্টা ইলেকট্রিসিটি থাকবে না। যখন জেগে উঠি, তখনো ইলেকট্রিসিটি আসেনি। কাজেই ১০টা-১০টা হবে হয়তো। ধড়ফড় করে উঠে অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে মামার রুমে গেলাম। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।

‘আপনি কি আপনার মামার রুমে সবার আগে গিয়েছিলেন?’

‘না। আমি গিয়ে দেখি শিহাব মামা, নূর মামা ও জিতু মিয়া—সবাই ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। ’

এরপর জেরার জন্য এলেন চাচাতো ভাই শিহাব। ভাইয়ের শোকে বেশ ম্রিয়মাণ দেখাল তাঁকে। জানালেন, বাইরের লোকেরই কাজ। ভাইয়ের অলংকারের দোকানে নতুন অনেক হিরে এনেছিল। তার বেশ কিছু ভাই দোকান থেকে বাসার আলমারিতে এনে রাখতেন। তাঁর ধারণা, সে কারণেই কেউ তাঁর পিছু নিয়ে এসে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে খুন করে যায়।

‘কিন্তু আপনাদের এই সুরক্ষিত বাসায় তা কিভাবে সম্ভব?’

‘ভাইয়ের কামরার পেছন দিকটা রাস্তার লাগোয়া। আর দোতলায় হওয়ায় রাস্তার পাশের নিমগাছ বেয়ে অনায়াসে ভাইয়ের রুমের খোলা বারান্দায় উঠে আসা যায়। আর ভাই গরমের দিনে মাঝেমধ্যেই ওই পাশটা খুলে রাখত। লোডশেডিং ছিল বলে গরমের কারণে...’

‘হ্যাঁ। বুঝতে পেরেছি। আমরা ওদিক দেখেছি। ’ ইন্সপেক্টর বললেন, ‘এখন বলুন, আপনি কখন টের পেলেন?’

‘ভাইয়ের রুম থেকে ধস্তাধস্তি ও চিত্কারের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি ওটা কোনখান থেকে আসছে। ভাবছিলাম, নিচের রাস্তায় কোনো গ্যাঞ্জাম। তাই গুরুত্ব দেইনি। পরে ধস্তাধস্তির শব্দ তীব্র হতেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি। মাথার কাছে ছিল দুই ব্যাটারির টর্চ। গ্রাম দেশের মানুষ, টর্চ ছাড়া চলাচল করে না। বাড়িতেও ব্যবহার করতাম। টর্চ নিয়ে ধস্তাধস্তি আর গোঁ গোঁ আওয়াজের উেসর দিকে এগিয়ে গেলাম। লোডশেডিংয়ের কারণে গোটা রুম ছিল অন্ধকার। টর্চের আলো জ্বেলে ভাইয়ের ঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই মনে হলো কেউ রুম থেকে পেছনের দরজা দিয়ে বারান্দা পেরিয়ে লাফ দিয়ে নিচে নেমে গেল। মনে হলো, ঘরে দুজন ছিল। কারণ আমি ঢুকতেই আরেকজন আমার মাথায় আঘাত করে পালিয়ে গেল। অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। আমার হাত থেকে জ্বলন্ত টর্চটা পড়ে গড়িয়ে চলে যায় খাটের নিচে। ’

‘ঠিক আছে, আপনি আসুন। ’

বোনজামাই নূর হোসেন বলল, ‘বিদেশে চিকিত্সা খুবই ব্যয়বহুল। কোমর ব্যথার চিকিত্সা নিতেই দেশে এসেছি। আবার সবার সঙ্গে দেখাও হয়ে গেল এই সুযোগে। এখানে এক মাস ফিজিওথেরাপি নিতে হবে। তাই নিচ্ছি। সঙ্গে ব্যথার ওষুধ, ও হালকা পাওয়ারের ঘুমের ওষুধও দেয়। আগের থেকে লোডশেডিংয়ের কথা জানা থাকায়, সন্ধ্যার পরপরই রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে ব্যথার ওষুধ, ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুম এসে যায়। চিত্কার, হট্টগোল শুনে ঘুম ভাঙে। তারপর বিছানা ছাড়ি। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় টাইম সাইকেল চেঞ্জ হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে প্রথমে কোথায় কী হচ্ছে বুঝে উঠতে পারিনি। সিগারেট খাওয়ার বদভ্যাস থাকায় হাতের কাছে লাইটার ছিল। লাইটার জ্বালালাম। তারপর ভালোভাবে খেয়াল করে বুঝতে পারলাম, শব্দটা রহিমের ঘর থেকে আসছে। লাইটার জ্বালিয়ে রেখেই সেদিকে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, গোটা ঘর অন্ধকার। শিহাব অচেতন হয়ে পড়ে আছে। আর রহিমের বুকে ছুরি বেঁধানো। সব শেষ। ভয়ে আমার হাত থেকে সিগারেট লাইটার অন্ধকারের মধ্যে পড়ে গেল। আর ওটা খুঁজে পাইনি। পাওয়ার চেষ্টাও করিনি। ’

সব শেষ কেয়ারটেকার জিতু মিয়াকে জেরা করা হলো। মেয়েলি স্বভাবের ছেলেটি ভয়ে আধমরা হয়ে গেছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জানাল, ‘লোডশেডিংয়ের মাইকিংয়ের কারণে স্যার আমাকে আগেভাগেই রাতের খানা দিতে বলেছিলেন। আমি কারেন্ট থাকতে থাকতেই রাতের খানা দিয়ে এসেছিলাম। খানা খেয়ে উনি বিছানায় শুয়ে পড়েছিলেন। ’

‘বারান্দার দরজা কি খোলা ছিল?’ তমাপ্পি প্রশ্ন করল।

‘অত খেয়াল করিনি ম্যাডাম। তবে মাঝেমধ্যে লোডশেডিং হলে স্যার বারান্দার দরজাটা খুলে রাখতেন। ওই দিন ছিল কি না মনে পড়ছে না। খানা খাওয়া শেষ হলে টেবিল-প্লেট গুছিয়ে রুম থেকে চলে আসি। তারপর কারেন্ট চলে যায়। আমিও শুয়ে পড়ি। রান্নাঘরের লাগোয়া ঘরে শুই বলে আর আমার ঘুম বেশি হওয়ার কারণে তেমন কিছু শুনতে পাইনি। যখন জেগে উঠি, ওই ঘরে যাই, তখন কর্তা আর বেঁচে নেই। ’

‘ঠিক আছে। তুমি এখন যেতে পারো। পরে দরকার হলে ডাকব। ’

ইন্সপেক্টর জাহিদ হতবিহ্বলভাবে তমাপ্পির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তমা আমি কিন্তু স্রেফ ডাকাতির কেসই দেখতে পাচ্ছি। লোডশেডিংয়ের কারণে রহিম আখন্দ পেছনের দরজা খুলে রেখেছিলেন। আততায়ীরা লোডশেডিংয়ের ব্যাপারটা আগে থেকে জানত, জানত রহিম আখন্দের দরজা খুলে রাখার স্বভাবের কথা। আর বাড়িতে রাখা হিরে-জহরতের কথাও জানত। তাই ডাকাতি করতে এসে খুন করে রেখে যায়। এটা ডাকাতির কেসই। ’

তমাপ্পি দুদিকে মাথা নাড়ল। ‘আমার তা মনে হয় না। আমার মনে হয়. বাড়ির কেউই এই খুনটা করেছে। আর কেসটা এমনভাবে সাজিয়েছে যেন ডাকাতির কেস বলে মনে হয়। চারজনের একজন মিথ্যে কথা বলছে। খুনটা কেন করেছে এটা এখনই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। হতে পারে, পুরনো কোনো ক্ষোভ ছিল। কিংবা হিরো চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিল। এটা চাপ দিলে বের হয়ে আসবে। ’

পূর্ণতা অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কে মিথ্যা কথা বলছেন তমাপ্পি?’

‘আমি তো বের করেছি। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তুই-ই খুঁজে বের কর কে মিথ্যাবাদী? কে খুন করেছে?’

 

এখন পাঠক বলুন তো, রহিম আখন্দকে কে খুন করেছে? তমাপ্পি তা কিভাবে বুঝতে পারলেন? বুঝিয়ে বলুন।


মন্তব্য