kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সত্যিই

আগুনে ছেঁকা মমি

নাবীল অনুসূর্য

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আগুনে ছেঁকা মমি

মমি বললেই তো সারা গায়ে সরু সাদা কাপড় বাঁধা কতগুলো মৃতদেহের কথা মনে পড়ে। মানে ওই মিসরের মমিগুলো আর কি।

বিশাল বিশাল পিরামিডের ভেতরে যেগুলো হাজার হাজার বছর ধরে সংরক্ষিত আছে। অনেকের তো ধারণা, মমি বানানোর সংস্কৃতি শুধু মিসরীয়দের মধ্যেই ছিল। তাই মমি বললেই ধরে নেওয়া হয় মিসরের মমির কথাই বুঝি বলা হচ্ছে। আসলে কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই তেমন নয়। মমি বানানোর প্রক্রিয়া জানা ছিল প্রাচীনকালের অনেক জাতিরই। তবে ভিন্ন ভিন্ন জাতির মমি বানানোর প্রক্রিয়াটা ছিল আলাদা।

বিচিত্র এক প্রক্রিয়ায় মমি বানানোর প্রথা ছিল ফিলিপাইনের বেঙ্গুয়েৎ প্রদেশের কাবায়ন অঞ্চলে। ওখানে যেসব আদিবাসী গোষ্ঠীর বাস, তাদের মধ্যে প্রধান ‘ইবালোই’। এই ইবালোইরা তাদের গোত্রপতি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মৃতদেহ মমি বানিয়ে রাখত। ওদের এই মমিগুলো বিভিন্ন নামে পরিচিত—কাবায়ন মমি, ইবালোইয়ান মমি, বেঙ্গুয়েৎ মমি, ফায়ার মমি। শেষ নামটা থেকেই বোঝা যায়, ইবালোইদের এই মমি বা মৃতদেহ সংরক্ষণের প্রক্রিয়াটা মিসরীয়দের প্রক্রিয়ার থেকে একেবারেই আলাদা। ইবালোইরা মমি বানাত মূলত মৃতদেহকে পানিশূন্য করার মাধ্যমে, মৃতদেহকে শুকিয়ে একদম কাঠ বানিয়ে। আর এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, প্রক্রিয়াটা মৃত্যুর আগেই শুরু করা হতো।

ইবালোইরা মূলত তাদের বিভিন্ন গোত্রের প্রধানদের মৃতদেহ মমি বানিয়ে সংরক্ষণ করত। কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা দেখা দিলে, তখন থেকেই তাকে মমি বানানোর আয়োজন শুরু হতো। সে আয়োজনের অংশ হিসেবে মরতে বসা মানুষটিকে এক বিশেষ ধরনের পানীয় পান করানো হতো। সে পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে লবণ ব্যবহার করা হতো। এই লবণ মরার আগেই লোকটির শরীরকে পানিশূন্য করার কাজ শুরু করত। আর লোকটির মৃত্যুর পর কয়েক সপ্তাহ থেকে মাসখানেক পর্যন্ত চলত মৃতদেহকে মমি বানানোর আয়োজন। তার অংশ হিসেবে মৃতদেহ আগুনে ছেঁকা হতে থাকত মৃতদেহ শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত। শুধু তা-ই নয়, শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শুকানোর জন্য মৃতদেহের মুখ দিয়ে ক্রমাগত তামাকের ধোঁয়া দেওয়া হতো। তারপর একদম পানিশূন্য হয়ে পড়লে শরীরে এক ধরনের ভেষজ রস মাখানো হতো। তারপর সেই মমি কোনো এক গুহায় নিয়ে গিয়ে কাঠের বাক্সে সমাধিস্থ করা হতো।

কাবায়নের কর্দিলেরা পর্বতমালায় এমন অনেকগুলো গুহার খোঁজ পাওয়া গেছে। সংখ্যাটা ৫০ থেকে ৮০ পর্যন্ত হতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এগুলো ১২ থেকে ১৫ শতকের মধ্যকার মৃতদেহ। ১৫ শতকের পর থেকে ইবালোইদের মধ্যে মমি বানানোর চল বন্ধ হয়ে যায়। কারণ—স্প্যানিয়ার্ডদের শাসন। অবশ্য এখনো ইবালোইরা তাদের পূর্বপুরুষদের মৃতদেহের প্রতি যথেষ্টই শ্রদ্ধাশীল। এমনকি এই মমিগুলোর ব্যাপারে তাদের বেশ কিছু আচার-বিশ্বাসও আছে।

উনিশের শতকে এসে এই মমিগুলোর প্রতি বিশ্বের নজর পড়ে। পুরাতাত্ত্বিক কারণে মহাগুরুত্বপূর্ণ এই গুহাগুলো তখনো এক রকম অরক্ষিতই ছিল। সে সুযোগ নেয় পাচারকারীর দল। বেশ কয়েকটা মমি চুরি হয়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত চুরির ঘটনাটি ঘটে ১৯০০ সালে। সে বছর ‘অ্যাপো আনু’ নামের একটা বিখ্যাত মমি চুরি হয়। বলা হতো, জীবদ্দশায় ইবালোইদের এই গোত্র প্রধান ছিলেন এক দুর্দান্ত শিকারি। এমনকি এমন কথাও প্রচলিত আছে—তিনি ছিলেন অর্ধেক মানব, অর্ধেক দেবতা। তার মমি চুরি হওয়ার পর স্থানীয় ইবালোইরা রীতিমতো ভেঙে পড়ে। তাদের মনে এমন ধারণা বদ্ধমূল হয় যে অ্যাপো আনু চুরি যাওয়ায়ই তাদের ওপর একে একে প্রাকৃতিক দুর্যোগ—খরা-ভূমিকম্প, রোগ-শোক-দারিদ্র্য নেমে আসছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য অ্যাপো আনুকে উদ্ধার করা যায়। তারপর রীতিমতো ঘটা করে তাকে তার গুহায় আবার স্থাপন করা হয়।

তবে সব চুরি যাওয়া মমির বেলায় এমনটা ঘটেনি। এখনো ওখানকার অনেকগুলো খোয়া যাওয়া মমিই উদ্ধার করা যায়নি। তাই মমিগুলোর গুহা নিয়ে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ রীতিমতো লুকোচুরি খেলা শুরু করেছে। কোনো গুহার অবস্থানের কথাই তারা প্রকাশ করেনি। সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে নানা ধরনের বিধিনিষেধ জুড়ে দিয়েছে। এখন কেবল একটা মমির গুহায়ই যাওয়া যায়। সেখানে অল্প সময়ের জন্যই থাকতে দেওয়া হয়। তাতে যাওয়াটাও মুখের কথা নয়। নিকটবর্তী শহর থেকে প্রথমে পাঁচ ঘণ্টা যেতে হয় গাড়িতে। তারপর আবার ঘণ্টাপাঁচেক পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়।

তারপর অবশ্য যার দেখা মেলে, তাতে সে কষ্ট সার্থক হয়ে যায়—বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত শত শত বছরের পুরনো মৃতদেহ। তা-ও আবার ঠিক সেই কাঠের বাক্সে, যে কাঠের বাক্সে মমি বানানোর মৃতদেহটা রাখা হয়েছিল।


মন্তব্য