kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দরজার ওপাশে

মৃত্যুপুরী দারগাভস

রাশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গ্রাম দারগাভস। বেশির ভাগ মানুষের কাছে গ্রামটি পরিচিত ‘দ্য সিটি অব ডেডস’—অর্থাৎ মৃতদের শহর হিসেবে। লিখেছেন ফাহমিদা হক

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মৃত্যুপুরী দারগাভস

নানা লোককাহিনী আর রহস্যেঘেরা দারগাভস অবস্থিত দক্ষিণ রাশিয়ার উত্তর ওসেশিয়ায়। ককেসাস পর্বতমালার ভেতরে বেশ লুকোনো অবস্থায় রয়েছে গ্রামটি।

সমতল থেকে এখানে যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় তিন ঘণ্টার বিপজ্জনক আর আঁকাবাঁকা পথ। পাহাড়ের ওপর এক সমতলে গ্রামটির অবস্থান।

রাশিয়ার সবচেয়ে রহস্যময় জায়গাগুলোর একটি এই দারগাভস। এর কারণ গ্রামটিতে রয়েছে বহু পুরনো এক গোরস্তান। যেখানে গ্রামের লোকজন নিজেদের মৃত স্বজনদের কবর দিত, তা-ও আবার তাদের জামাকাপড় আর পছন্দের জিনিসপত্র সঙ্গে দিয়ে। গোরস্তানটিতে রয়েছে প্রায় ১০০টি পাথরের সমাধি।

ভীষণ পুরনো এসব সমাধি আর এতে থাকা মৃত মানুষের জিনিসপত্র দেখে ৪০০ বছর আগে এ গ্রামে থাকা মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া সম্ভব। আর তাই প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে গবেষণার জন্য ভীষণ আকর্ষণীয় এক জায়গা দারগাভস।

আর এসব সমাধির জন্যই হয়তো গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে নানা বিচিত্র কাহিনী। বিশেষ করে স্থানীয় মানুষের মনে একসময় ধারণা ছিল যে একবার যে এই গ্রামে প্রবেশ করে, সে আর কখনো জীবিত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পারে না। আরেক স্থানীয় গল্প অনুসারে, আঠারো শতকে ওসেশিয়াজুড়ে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে প্লেগ। আর তাই আক্রান্ত ব্যক্তিদের থেকে যাতে আর রোগ ছড়াতে না পারে, সে জন্য তাদের পাথরের তৈরি বিশেষ এই ঘরের মধ্যে রেখে দেওয়া হতো। সঙ্গে অবশ্য খাবার আর দরকারি জিনিস রাখা হতো। কিন্তু ঘরের বাইরে তাদের কিছুতেই বের হতে দেওয়া হতো না। একসময় এখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। ভীষণই কষ্টের আর একাকিত্বে ভরা ছিল সেই সব মানুষের শেষ কয়েকটি দিন।

নতুন কেউ এ গ্রামে ঢুকলে প্রথমেই তাঁদের নজর কাড়বে সাদা রঙের বাড়ির মতো দেখতে সমাধিগুলো। এমন শখানেক সমাধি আছে গোরস্তানটিতে। প্রতিটি সমাধি ওপরের দিকে খানিকটা সরু হয়ে গেছে, সেই সঙ্গে মাথায় রয়েছে বাঁকানো ছাদ। সবচেয়ে বড় সমাধিগুলো দুই থেকে চারতলা বাড়ির সমান উঁচু। পুরো জায়গাটার পেছনে রয়েছে আবার একটি ওয়াচ টাওয়ার, যার ওপরের অংশটি ভেঙে গেছে। বলা হয় যে এই টাওয়ার বানানো হয়েছিল আত্মাদের বিচরণ লক্ষ করার জন্য।

সমাধিগুলোর ভেতরে ঢুকে দেখা যায় যে মৃতদেহগুলো দাফন করা হয়েছে নৌকার মতো দেখতে কিছু কাঠের জিনিসে। এমনকি একটা নৌকার পাশে আবার বৈঠাও পাওয়া গেছে। রহস্য আরো বাড়ে তখন, যখন দেখা গেল যে গ্রামের আশপাশে নৌকা চলাচলের মতো তেমন কোনো নদী নেই। তাহলে এই নৌকার মতো জিনিসগুলো কিভাবে আর কেনই বা এলো সেখানে? একটা তত্ত্ব অনুসারে মৃত আত্মারা এসব নৌকায় চড়ে হয়তো পাড়ি জমাত কোনো নদীতে, স্বর্গে পৌঁছানোর জন্য, অনেকটা প্রাচীন মিসর আর মেসোপটেমিয়ার মৃতদের গল্পের মতো। আবার প্রতিটি সমাধির সামনেই রয়েছে একটি করে কুয়ো। সেসব কুয়োতে পাওয়া গেছে অনেক মুদ্রা। ধারণা করা হয়, ওসেশিয়ার লোকেরা নিজেদের মৃত স্বজনদের কবর দেওয়ার পর কুয়োতে মুদ্রা ছুড়ে মারত। যদি সেটা কুয়োর নিচে কোনো পাথরকে আঘাত করত, তবে মনে করা হতো, মৃত ব্যক্তির আত্মা স্বর্গে পৌঁছে গেছে। এখন যেসব পর্যটক এ গ্রামে বেড়াতে আসেন, তাঁরাও এসব কুয়োর মধ্যে পয়সা ছুুড়ে মারেন। যদি তা নিচে থাকা পাথরে আঘাত করে, তাকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়।

 


মন্তব্য