kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

রহস্যজট

টনি

শেখ আবদুল হাকিম

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



টনি

অঙ্কন : মানব

রবিবার সকাল। লব্ধ সৈকত আর নিষ্ঠা নিরবধি বাসে চড়ে কক্সবাজারের আরেক প্রান্তে যাচ্ছে ওদের বন্ধু কোমল শান্তার সঙ্গে দেখা করতে।

শান্তা তার পোষা ভেড়া টনিকে ট্রেনিং দিচ্ছে, ওটা যাতে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ভেড়া হয়ে উঠতে পারে।

শান্তাদের বাড়ি রাস্তার ধারেই। বাস থেকে নামার সময় ওরা দেখতে পেল, টনি নামের ভেড়াটা ব্যায়াম করছে। শান্তার পোষা কুকুরছানা বাহাদুর, লোমে পুরো ঢাকা, দুই সারি দাঁতের ফাঁকে একটা রশি আটকে ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে ছুটছে—রশির অপর প্রান্ত টনির গলায় জড়ানো। কাজেই তাকেও বাহাদুরের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটতে হচ্ছে।

‘উঁচুনিচু রাস্তা টনির পেশি তৈরিতে সাহায্য করছে। ’ গোয়েন্দা বন্ধুদের স্বাগত জানানোর পর বলল শান্তা।

মৃদুু শিস দিল নিষ্ঠা। ‘কে বিশ্বাস করবে, অতটুকু একটা কুকুর অত বড় একটা ভেড়াকে দৌড় খাটাচ্ছে!’

‘টনিকে আমি কিছু সহজ হুকুম পালন করতে শিখিয়েছি। ’ গর্বের সুরে বলল শান্তা। ‘আমি চাই, তাকে যেন স্মার্টও মনে হয়। ’

‘একটা ভেড়াকে ট্রেনিং দেওয়ার এই আইডিয়া তোমার মাথায় ঢুকল কিভাবে?’ জানতে চাইল নিষ্ঠা।

‘কাগজে দেখলাম, গিরগিটি থেকে শুরু করে বাঘ, সিংহ, হাতি, এমনকি বনমানুষকেও ট্রেনিং দেওয়া যায়, তাই আমিও ভাবলাম, একটা ভেড়াকে ট্রেনিং দেব...’

বাহাদুর আর টনি শান্তার পাশে এসে দাঁড়াল। দুটি পশুরই গা চাপড়ে দিল সে, তারপর রশিটা খুলে নিল।

‘টনির মাত্র ১০ মাস বয়স। ’ বলল সে। ‘আমি তাকে ধীরে ধীরে বড় করছি, তবে এরই মধ্যে পাঁচ মণ ধানসহ চাকা লাগানো গাড়ি টানতে পারে। ’

‘আগে তাকে পুরোপুরি বড় হতে দাও। ’ বিড়বিড় করল সৈকত।

‘তখন ২০ মণ অনায়াসে টানতে পারবে সে। ’ আশ্বস্ত করল শান্তা। ‘এখনই ওর গায়ে যে শক্তি...’

মেঠোপথ ধরে গোয়েন্দা বন্ধুদের বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে শান্তা। টনি তার বন্ধুর সঙ্গে ছোট ছোট পদক্ষেপে ওদের পিছু নিয়ে আসছে। ব্যা ব্যা করে বারকয়েক সন্তোষ প্রকাশ করল ভেড়াটা।

বাড়ির পাশের লনে তিনজন লম্বা কিশোরকে দেখা গেল। ওদের চিনতে পারল সৈকত। করম নাজি, মিশু মারুফ, অনন্ত উল্লাস। ওরা সবাই প্রতিবেশী চাষিদের ছেলে।

কোমল ও শান্তা বলল, ‘ওরা এখানে এসেছে আমার ভেড়াটা দেখতে। তবে ওদের একজন খুুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমার সন্দেহ, ওই ছেলেটাই কাল রাতে ভেড়াটা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বাহাদুর ঘেউ ঘেউ করে ভাগিয়েছে তাকে। ’

হঠাৎ করে নিজের ঠোঁটে একটা আঙুল চেপে ধরল শান্তা, ফিসফিস করে বলল, ‘ওরা প্র্যাকটিক্যাল জোক ভালোবাসে। লক্ষ করো!’

করম নাজি মাটিতে পিঠ দিয়ে শুয়ে আছে, যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। করম নাজির পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে তার জুতার ফিতা দুটি এক করে বাঁধছে মিশু মারুফ। তখনই অনন্ত উল্লাস পা টিপে টিপে মারুফের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

অনন্ত উল্লাস খুব সাবধানে মারুফের জুতার সোল আর ওপরের অংশের মাঝখানে কয়েকটা দেশলাইয়ের কাঠি গুঁজে রাখল। তারপর কাঠিগুলো জ্বালাল। মারুফ যেই নাজির জুতার ফিতা এক করে বাঁধা শেষ করেছে, অমনি তার নিজের জুতায় আটকানো দেশলাইয়ের কাঠিগুলোর আগুনের আঁচ লাগল পায়ে।

মারুফ ‘উফ! উফ!’ করে ব্যথায় চিৎকার করতে লাগল। এদিকে নাজি চমকে উঠে লাফ দিয়ে সিধা হলো, চেষ্টা করল পা ফেলতে; কিন্তু পায়ে পরা জুতা জোড়া একটি আরেকটির সঙ্গে বাঁধা থাকায় পড়ে গেল। হাসিতে ফেটে পড়ল অনন্ত উল্লাস।

‘মারুফের পায়ে কিছু ফোস্কা পড়বে। ’ মন্তব্য করল সৈকত।

‘আমি এ ধরনের ঠাট্টা একদমই পছন্দ করি না। ’ রাগের সঙ্গে বলল নিষ্ঠা।

একপেয়ে হাঁসের মতো এদিক-সেদিক কয়েক মিনিট লাফাল মারুফ, তারপর একটা গাছের গায়ে হেলান দিল। তবে জুতো খুলল না।

‘উল্লাসের গায়ের কাপড় ভেজা কেন?’ জিজ্ঞেস করল সৈকত।

‘ব্যাপারটা বুঝতে হলে আমার সঙ্গে যেতে হবে তোমাদের। ’ জবাব দিল শান্তা, তারপর গোয়েন্দা বন্ধুদের নিয়ে বাড়ির পেছন দিকে চলে এলো। ওরা দেখল, পেছনের বারান্দা পানিতে ভেসে যাচ্ছে।

‘আজ আমি বাড়িতে একা। ’ বলল শান্তা। ‘একটু আগে উল্লাস বাড়িতে এসে পানি খেতে চাইল। সে যখন বাড়ির ভেতরে এসে বসেছে, মারুফ কিংবা নাজি আমাদের লোহার জাল লাগানো দরজার মাথায় কায়দা করে পানিভর্তি একটা প্লাস্টিকের বালতি বসিয়ে রেখে আসে।

উল্লাস যখন বেরিয়ে এলো, অমনি ওর ওপর খসে পড়ল পানিসহ বালতি। ’

‘সে কসম খেয়ে বলেছে, এর বদলা নিয়ে ছাড়বে। ওরা তিনজন পরস্পরকে খুব একটা পছন্দ করে না। ’ শান্তা যোগ করল।

‘আর কাল রাতে টনিকে চুরি করার ব্যাপারটা?’ জিজ্ঞেস করল সৈকত।

‘চোরের জন্য আমি একটা ফাঁদ পেতেছি। ’ জবাব দিল শান্তা। ‘কালো একটা ছোট খাতায় ভেড়াটার ডায়েট রেকর্ড করে রেখেছি। আজ সকালে ওই তিনজনকে দেখিয়েছি, কোথায় সেটা আছে। ’

‘এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে?’ সন্দেহ প্রকাশ করল নিষ্ঠা।

‘ওই খাতায় সব উল্টাপাল্টা লেখা আছে। ’ বলল শান্তা। ‘টনি আসলে কী খায় তা শুধু আমি জানি। ওই খাতা ভুল তথ্য দেবে। ’

মুচকি হাসল সৈকত। ‘যে ছেলেটা ভেড়াটা চুরি করতে ব্যর্থ হয়েছে, সে এবার খাতাটা চুরি করার চেষ্টা করবে, তারপর নিজেই হারকিউলিস ভেড়া বানানোর কাজে হাত দেবে। ’

‘সে যখন খাতাটা সরানোর চেষ্টা করবে, তখন আমি তাঁকে খপ করে ধরে ফেলব!’ বলল শান্তা।

খাতাটা নিয়ে আসার জন্য বসার ঘরে ঢুকল সে, গোয়েন্দা বন্ধুদের দেখাবে। কিন্তু খাতাটা ওখানে নেই!

‘তাহলে ইতিমধ্যে এটা চুরি হয়ে গিয়েছে। তোমরা আসার কয়েক মিনিট আগে টেলিফোন ধরার জন্য সিটিংরুম থেকে যখন আমি বেরিয়ে গেছি, তখনই চুরিটা করেছে কেউ। ’

চারদিকে ক্লু খুঁজে বেড়াচ্ছে সৈকত। খালি হলঘরের মেঝেতে ভেজা পায়ের কিছু ছাপ দেখতে পেল সে। বাড়ির পেছনের দরজা থেকে ভেতরে ঢুকে সিটিংরুমের কার্পেট পর্যন্ত পৌঁছেছে, তারপর ফিরে গেছে।

‘মাথায় কিছু ঢুকছে না!’ নিষ্ঠা থই পাচ্ছে না। ‘পায়ের ছাপ এমন কেন? যেন কেউ দস্তানা পরে হাঁটাহাঁটি করেছে। ’

‘দস্তানা নয়, মোজা। ’ ব্যাখ্যা করল সৈকত। ‘কিন্তু তার মোজায় গর্ত আছে, সেই গর্ত থেকে বেরিয়ে পড়েছিল বুড়ো আঙুল। ’

‘সে তাহলে ভেজা বারান্দায় তার জুতা খুলে রেখেছিল, আওয়াজ হওয়ার ভয়ে। ’ বলল শান্তা।

‘আমাদের এখন শুধু প্রতিটি ছেলেকে সার্চ করে খাতা আর দুটি ন্যাংটা বুড়ো আঙুল বের করতে হবে। ’ জানাল নিষ্ঠা।

‘ধরো, ওরা যদি সার্চ করতে না দেয়?’ জিজ্ঞেস করল শান্তা।

‘তুমি ঠিক বলেছ, ওরা বয়সে বড়। ’ বলল নিষ্ঠা। ‘কাজেই... প্রথমে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে, চুরিটা কে করেছে। ’

‘আনন্দ উল্লাস চোর হতে পারে। ’ বলল শান্তা।

‘অসম্ভব নয়। ’ বলল নিষ্ঠা। ‘বালতির পানিতে ভিজে যাওয়ার পর সে তার দেশলাইয়ের কাঠি শুকনো রাখল কিভাবে? তবে কি ও তোমাদের বাড়িতে আবার ঢুকে দেশলাইটা আনে? সে ক্ষেত্রে তখনই খাতাটা সরায়। ’

‘দুঃখিত। ’ বলল শান্তা। ‘কী ঘটেছে বলতে হচ্ছে আমাকে। পানিতে ভেজার পর দেশলাইটা আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছে সে। ’

‘তাহলে মারুফকেই আমরা খুঁজছি। ’ নিষ্ঠা বলল, যদিও ইতস্তত ভঙ্গিতে। ‘খেয়াল করেছিলে, কেমন পা টিপে টিপে করম নাজির পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে? তার আঙুলও খুব হালকা। পা দুটি এমন দক্ষ হাতে বাঁধল, নাজির ঘুম ভাঙল না!’

‘আবার এমনও হতে পারে, নাজির আসলে জেগেই ছিল। ’ বলল শান্তা। ‘হয়তো আমাদের বিশ্বাস করাতে চাইছিল, খাতাটা যখন চুরি হয়েছে তখন সে ঘুমাচ্ছিল। ’

নিষ্ঠাকে অসহায় দেখাল। ‘এই কেসটা সমাধান করা আমার কাজ নয়। তুমি কী ভাবছ, সৈকত?’

‘আমি ভাবছি। ’ শিশু গোয়েন্দা বলল, ‘আমরা অনায়াসে অভিযুক্ত করতে পারি...’

 

পাঠক বলুন তো কাকে?


মন্তব্য