kalerkantho


দরজার ওপাশে

পেট্রিনার বিশ্বভ্রমণ

অল্প কিছু টাকা পুঁজি করে মালয়েশীয় এক তরুণী ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর নানা দেশ। তাঁর সেই অভিযানে পাঠকদের সঙ্গী করেছেন ফাহমিদা হক

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পেট্রিনার বিশ্বভ্রমণ

২০০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১৬ হাজার টাকা। যেখানে পুরো মাসের খরচ চালানোও হয়তো কারো কারো জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে এ টাকায়, সেখানে ২৯ বছরের পেট্রিনা থঙ্গ এ টাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ২২টি দেশ।

গোটা ভ্রমণে তাঁর সময় লেগেছে ১৩ মাসের বেশি। মালয়েশিয়ার পেট্রিনা গত বছরের জুন মাসে পাড়ি জমান সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে। উদ্দেশ্য সঙ্গে থাকা সামান্য টাকায় যতটা সম্ভব পৃথিবীটা চষে বেড়ানো।

আর এ বছরের জুলাই মাসে পেট্রিনা যখন নিজের শহর কুয়ালালামপুরে ফিরে আসেন, তত দিনে পার হয়ে গেছে এক বছরেরও বেশি। সেই সঙ্গে তাঁর দেখা হয়ে গেছে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য আর প্রাচ্যের অনেকগুলো দেশ। পেশায় ফ্রিল্যান্স স্ক্রিপ্ট রাইটার পেট্রিনার এই ভ্রমণ মোটেও কোনো সহজ ব্যাপার ছিল না। এত কম টাকায় এতগুলো দেশ ঘুরে বেড়ানোর জন্য তাঁকে যথেষ্ট মাথা খাটাতে হয়েছে, চলতে হয়েছে অনেক হিসাব করে।

প্রথমে পেট্রিনা ধারণা করেন, ২০০ ডলারে হয়তো তিন থেকে ছয় মাসের মতো ঘুরে বেড়াতে পারবেন। তাঁর টাকাটা শেষও হয়ে যায় তিন মাসেই। এরপর সাহসী পেট্রিনা বেছে নেন নতুন এক পন্থা, আর তা হলো বিনা পয়সায় মানুষের সাহায্য নিয়ে যত দূর যাওয়া সম্ভব যাত্রা করা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে চলন্ত গাড়ি থামিয়ে লিফট নিয়ে যেতে থাকেন এক শহর থেকে আরেক শহর, কিংবা এক দেশ থেকে আরেক দেশে। থাকা-খাওয়া কোনো কিছুরই ঠিক ছিল না। খাওয়ার জন্য বেছে নিতেন ডাস্টবিনে ফেলে রাখা উচ্ছিষ্ট কিংবা রেস্তোরাঁগুলোতে মানুষের ফেলে রেখে যাওয়া খাবারের অংশ। এমনকি মার্কেটে গিয়ে বিক্রির অযোগ্য ফলও জোগাড় করে খেতে হয়েছে। সন্ধ্যা হলেই রাস্তার ধারে ক্যাম্প করে থাকার ব্যবস্থা করতেন। অবশ্য হঠাৎ হঠাৎ কারো বাসায় থাকারও নিমন্ত্রণ পেয়ে যেতেন।

রোমাঞ্চকর এ যাত্রায় কিন্তু বিপদের আশঙ্কাও কম ছিল না। একবার যেমন পেট্রিনাকে ইরানের সীমান্ত পেরিয়ে বেলুচিস্তান হয়ে পাকিস্তানে আসতে হলো। জায়গাটা পাড়ি দেওয়া ভীষণই বিপজ্জনক ব্যাপার ছিল, কেননা সেখান থেকে মানুষ অপহরণের অনেক ঘটনা ঘটে। আর তাই স্বভাবতই পেট্রিনাকে সীমান্ত পার হওয়ার অনুমতি পেতে যথেষ্ট ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। ইরানের সীমান্ত পার হওয়ার সময় তাঁকে চড়তে হয়েছিল পুলিশের গাড়িতে। আর তাঁকে পাহারা দেওয়ার জন্য ছিল দুজন বন্দুকধারী প্রহরী। প্রথম চেকপয়েন্ট অতিক্রমের পর তাঁকে তুলে দেওয়া হয় আরেকটি পুলিশের ট্রাকে। এরপর দ্বিতীয় চেকপয়েন্ট পার হওয়ার পর এক সেনাসদস্য তাঁকে আরেক চেকপয়েন্ট পার করিয়ে দেন। তারপর তাঁকে আরো তিনটি ট্রাক বদলাতে হয়। শুধু তা-ই নয়, চেকপয়েন্টগুলো পার হওয়ার সময় খোলা জায়গায় দাঁড়ানোরও অনুমতি পাননি। বরং এক ট্রাক থেকে দ্রুত আরেক ট্রাকে উঠে যেতে হতো। পুরো অভিযানের মধ্যে এ অংশটাই সবচেয়ে ক্লান্তিকর ছিল তাঁর জন্য।

অবশ্য ভালো লাগার জিনিসেরও কমতি ছিল না। পেট্রিনার সবচেয়ে আনন্দ পাওয়া জায়গাগুলোর একটি হলো লিথুয়ানিয়া, যেখানে পাহাড়ের কোলে ‘রেইনবো গ্যাদারিং’ নামে এক উৎসব চলছিল তখন। এক সপ্তাহ ধরে চলা সে উৎসবে সেখানকার একটি সম্প্রদায়ের মানুষ একে অন্যের সঙ্গে সময় কাটায়। নিখাদ আনন্দময় এক অভিজ্ঞতা ছিল সেটা। এ ছাড়া বসনিয়ার বেশ কিছু জায়গা খুব ভালো লেগেছে তাঁর।

এই যাত্রায় পেট্রিনা সুইডেন হয়ে ডেনমার্ক, জার্মানি, পোল্যান্ড পেরিয়ে বাল্টিক অঞ্চল অতিক্রম করেন। এরপর আলবেনিয়া, কসোভো, বুলগেরিয়াসহ ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করে প্রবেশ করেন তুরস্কে। সেখান থেকে ইরান, পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড হয়ে নিজের দেশ মালয়েশিয়ায় চলে আসেন। মধ্যপ্রাচ্য আর এশিয়ার দেশগুলো পেরোনোর সময় মানুষের অনেক প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। বিশেষ করে একজন মেয়ে হয়ে এভাবে একা একা পৃথিবী পাড়ি দিচ্ছেন, ব্যাপারটা অনেকেরই বোধগম্য হয়নি।

তবে এত কিছুর পরও পেট্রিনার মতামত হলো, যেকোনো মেয়েরই পৃথিবী ঘুরে দেখা উচিত, আর তা একা হলেও মন্দ নয়। আমরা হয়তো পৃথিবীর অজানা অনেক কিছুকে ভয় পাই, তবে সেটা অমূলক। আর যাত্রাটা ভীষণ কষ্টকর হলেও এতে পেট্রিনার পৃথিবী সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি অনেক পাল্টে গেছে। অনেক অচেনা মানুষই তাঁকে অভিভূত করেছে আতিথেয়তা আর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে।


মন্তব্য