kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

ভ্রমণ ধাঁধা

পৃথিবীর এমন কয়েকটি জায়গার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার প্রতিটিই পর্যটকদের পছন্দের। তবে একটিরও নাম উল্লেখ করা হয়নি। বর্ণনা পড়ে পরিচয় খুঁজে বের করতে হবে। আজব এই ভ্রমণে আপনার সঙ্গী নাবীল অনুসূর্য

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভ্রমণ ধাঁধা

প্রবালরাজ্য

পৃথিবীতে এখানেই সবচেয়ে বেশি ধরনের প্রবালের দেখা মেলে। ৪১১ ধরনের শক্ত প্রবাল আছে এখানে।

পৃথিবীতে যত ধরনের নরম প্রবল আছে, তার এক-তৃতীয়াংশেরই দেখা মেলে। আর ওগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সবচেয়ে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান। ওই এক জায়গায় বাস করে প্রায় ২১৫ জাতের পাখি, ২২ জাতের সামুদ্রিক পাখি, ১৭ ধরনের সামুদ্রিক সাপ আর দেড় হাজারেরও বেশি জাতের মাছ। মানে পৃথিবীতে মোট যত জাতের মাছ আছে, তার ১০ শতাংশের দেখা পাওয়া সম্ভব ওই একটি জায়গায়ই। আছে ১৩৪ জাতের হাঙর আর ৩০ জাতের সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী। সামুদ্রিক কচ্ছপের সাতটি প্রজাতিকে বিলুপ্তপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টিরই দেখা মেলে ওখানে। মোলাস্কা, মানে খোলসওয়ালা অমেরুদণ্ডী সামুদ্রিক প্রাণী আছে তিন হাজার ধরনের। আরো আছে দেড় হাজারেরও বেশি বিভিন্ন খুদে আকৃতির সামুদ্রিক প্রাণী। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ওই প্রবালরাজ্যটি বেশ বড়। প্রায় দুই হাজার ৩০০ কিলোমিটার লম্বা। তাতে প্রবালদ্বীপ আর প্রবালপ্রাচীর আছে ৯৪০টি। সাগরসহ হিসাব করলে আয়তন প্রায় সাড়ে তিন লাখ বর্গকিলোমিটার। মানে সাত কোটি ফুটবল মাঠের সমান! আর এই প্রবালরাজ্যের বয়সও নিতান্ত কম নয়, প্রায় দুই কোটি বছর!

 

 

মসি-ওয়া-টানিয়া

জলপ্রপাতটি লম্বা বা চওড়া—কোনো দিক দিয়েই এক নম্বর নয়। কিন্তু দুটি মিলিয়ে এটিকেই বলা হয় সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত। জাম্বেসি নদী যেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলপ্রপাত তৈরি করে, সেখানে নদীটি চওড়ায় প্রায় সোয়া মাইল বা দুই কিলোমিটার। আর ঝাঁপিয়ে পড়ে সোজা ১০৮ মিটার নিচে। গিয়ে পড়ে ব্যাসাল্টের একটা বিশাল মালভূমির ওপর। আর তাতে যে পানির মেঘ বা কুয়াশার সৃষ্টি হয়, সেটা দেখা যায় অন্তত ২০ কিলোমিটার দূর থেকেও।

জলপ্রপাতটি বিশ্ববাসীর নজরে আনেন বিখ্যাত স্কটিশ অভিযাত্রী ডেভিড লিভিংস্টোন। ধারণা করা হয়, প্রথম ইউরোপীয় হিসাবে এর কাছে পৌঁছান তিনিই, ১৮৫৫ সালে। জলপ্রপাতটির একটি ইউরোপীয় নামও দেন। তার আগে স্থানীয় আদিবাসীরা ওটাকে ডাকত মসি-ওয়া-টানিয়া নামে, তার বাংলা করলে দাঁড়ায়—‘যে ধোঁয়ায় বাজ ডাকে। ’ জলপ্রপাতটির একপাশের দেশ জিম্বাবুয়ে আগেই শ্বেতাঙ্গদের দেওয়া অনেক নাম ঝেড়ে ফেলেছে। সম্প্রতি তারা জলপ্রপাতটিরও পুরনো নাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে।

 

 

ডারউইন এসেছিলেন এখানে

আগ্নেয় দ্বীপগুলোর অবস্থান ইকুয়েডর থেকে ৬০০ মাইল পশ্চিমে। দ্বীপপুঞ্জটিতে প্রথম জাহাজ ভেড়ান টমাস ডি বেরলাঙ্গা, ১৫৩৫ সালে। তখন দ্বীপগুলোর ব্যাপারে কেউই তেমন একটা মনোযোগ দেয়নি। প্রথম একটু-আধটু মনোযোগ পায় ষোড়শ শতকের শেষদিকে। তা-ও মূলত ওখানকার বিশাল বিশাল সব কচ্ছপের জন্য। গাবদা-গোবদা সাইজের কচ্ছপগুলোর একটা মারলেই অনেকে মিলে খাওয়া যেত। তাই তিমিশিকারি জাহাজগুলো ওই দ্বীপগুলোতে গিয়ে আস্তানা গাড়তে শুরু করে।

এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাণী ওই বিশাল কচ্ছপগুলোই। স্কোলোপেন্দ্রা নামের ছোট্ট এক জাতের বিছেও আছে। ওরা পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ প্রাণীগুলোর একটি। সামুদ্রিক ইগুয়ানার বাসও এই দ্বীপগুলোতেই। এখানকার পানকৌড়িগুলো এতটাই গাবদা-গোবদা হয়ে গেছে যে আর উড়তেই পারে না। পুরো উত্তর গোলার্ধে এটাই একমাত্র জায়গা, যেখানে পেঙ্গুইন বংশবিস্তার করতে পারে। আর শুধু মোলাস্কাই পাওয়া যায় প্রায় ৮০০ জাতের। মোলাস্কা বলতে খোলসওয়ালা অমেরুদণ্ডী সামুদ্রিক প্রাণীদের বোঝানো হয়। এর মধ্যে পরে শামুক থেকে শুরু করে স্কুইড-অক্টোপাস পর্যন্ত।

যাওয়ার জন্য খুব ভালো জায়গা হলেও ওখানে যাওয়া মোটেই সহজ নয়। এই দ্বীপপুঞ্জই ইকুয়েডরের প্রথম জাতীয়ভাবে সংরক্ষিত প্রাকৃতিক অঞ্চল। ইউনেসকোও দ্বীপগুলোকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করেছে। ইকুয়েডর ওখানে যাওয়াটা এখন রীতিমতো হিসাব-নিকাশ করে নিয়ন্ত্রণ করে। কোনোভাবেই যাতে দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি না হয়। জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি দ্বীপটি আরেকটি কারণেও ভীষণ বিখ্যাত। ১৮৩৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এইচএমএস বিগল নামের জাহাজে চড়ে এই দ্বীপে আসেন তরুণ চার্লস ডারউইন। এই দ্বীপে তাঁর গবেষণার ভিত্তিতেই তিনি জগদ্বিখ্যাত বিবর্তনবাদতত্ত্ব প্রবর্তন করেন।

 

 

বিশাল গিরিখাদ

পর্যটকদের কাছে আমেরিকার সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটি একটা মরুভূমির মতো রুক্ষ এলাকা। সেখানে মাইলের পর মাইল কোনো সবুজ নেই। কোনো লতাপাতা-আগাছাও নেই। তবে যেটি আছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। একটা গিরিখাদ। অবশ্য কোনো হিসাবেই ওটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গিরিখাদ নয়। না লম্বায়, না চওড়ায় আর না গভীরতায়। কিন্তু প্রকৃতির রুক্ষতা, ও গিরিখাদটির বিশালতা এমন একটা অনুভূতির জন্ম দেয়, যার তুলনা নেই।

গিরিখাদটি লম্বায় প্রায় ৪৪৫ মিটার। চওড়ায় দুই মিটার থেকে শুরু করে কোথাও কোথাও ২৯ মিটার পর্যন্ত। গভীরতা কোথাও কোথাও পুরো এক মাইল। বিশাল এই গিরিখাদটি সৃষ্টির জন্য দায়ী কলোরাডো নদী। ওখানকার পাথরের বুক চিরে নদীটি লাখ লাখ বছর ধরে বইতে বইতে এই গিরিখাদের সৃষ্টি। এই গিরিখাদটির আরেকটি বিশেষত্ব আছে। গিরিখাদটির চারপাশের পাহাড়গুলো যে পাথর দিয়ে গঠিত, সেগুলো লাখ লাখ বছর ধরে ঠিক আগের মতোই আছে। তেমন কোনো পরিবর্তনই হয়নি। আর এখানকার বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে বাস করে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানরা। জায়গাটিতে এখনো আমেরিকার সবচেয়ে পুরনো রেড ইন্ডিয়ান বসতির দুটি আছে—হাভাসুপাই আর হুয়ালাপাই।

 

 

আশ্চর্য এক শহর

মায়া সভ্যতার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এই ধ্বংসাবশেষ বা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনটির অবস্থান বর্তমান মেক্সিকোতে। কানকুনের ১২৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরের ধ্বংসস্তূপটি ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় জায়গাও করে নিয়েছে।

মনে করা হয়, প্রাচীন এই শহরই ছিল মায়া সভ্যতার সবচেয়ে বড় শহর। শহরটিতে মায়ানরা গড়ে তুলেছিল আকাশচুম্বী পিরামিড, বৃহদায়তন মন্দির, সর্পিল স্তম্ভ, বিশালাকৃতির খেলার ময়দানের মতো সব স্থাপনা। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার জন্য যেমন গবেষণাগার বানানো হয়েছিল, তেমনি ছিল বিশাল বিশাল সব ধর্মীয় স্থাপনা।

নগরটির এই স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পিরামিড। এটি আবার বানানো হয়েছিল জ্যোতির্বিদ্যার নানা হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে। পিরামিডটার চারপাশজুড়ে মোট ধাপের সংখ্যা ৩৬৫টি, সৌরবছরের হিসাবে। প্যানেল আছে মোট ৫২টি, এক সৌরবছরে মোট সপ্তাহের হিসাবে। নগরটিতে দেবতাদের উদ্দেশে নরবলির জন্যও বানানো হয়েছিল আকাশচুম্বী এক স্থাপনা। টেম্পল অব দ্য ওয়ারিয়ার্স বা টেম্পল অব থাউজেন্ড কলামস নামের সে মন্দিরটির একদম চূড়ায় যে পাথর আছে, তাতে দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করা মানুষের হৃপিণ্ড রাখা হতো। শহরে একটা পবিত্র গুহাও ছিল। সেটিও ব্যবহৃত হতো দেবতাদের উদ্দেশে নরবলি দেওয়ার জন্য। আরেক ধরনের গুহা ছিল শাস্তি দেওয়ার জন্য। ২২ মিটার গভীর সেসব গর্তে দণ্ডপ্রাপ্তদের চামড়ার ফিতা দিয়ে বেঁধে ফেলে দেওয়া হতো। এমনকি ওখানকার বিশালাকৃতির খেলার মাঠে যে পবিত্র ক্রীড়ার আয়োজন হতো, তার নিয়মকানুনও বেশ কঠোর ছিল। মাঠের চারপাশের দেয়ালে সে খেলার নিয়মকানুন, বিধিবিধান আঁকাও আছে। একটি ছবিতে আছে, হেরে যাওয়া দলের দলপতির গর্দান নেওয়া হচ্ছে।

পরে স্প্যানিয়ার্ডরা এসে শহরটি ধ্বংস করে দেয়। তার পরও যা টিকে আছে, পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সেগুলোই যথেষ্ট।

 

 

সাগর নয়, লেক

নামের সঙ্গে সাগর থাকলেও, ওটা আসলে একটা লেক। কিন্তু সেই লেকের পানি আবার সাগরের চেয়েও নোনা। হিসাব করলে সাগরের চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বেশি নোনা। আর এই বিপুল লবণের কারণেই লেকটা পৃথিবীর অন্যতম স্বাস্থ্যকর স্থান। এখন তো বটেই, জায়গাটা যে বহু প্রাচীনকাল থেকেই হাওয়া বদলের জন্য ভালো ছিল, তার উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থেও। তবে স্বাস্থ্যকর হলে কী হবে, লবণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ওই লেকের পানিতে কোনো মাছই বাঁচতে পারে না। নেই কোনো জলজ উদ্ভিদও। তবে লেকটা একেবারে প্রাণীশূন্যও নয়। ওতে অল্প কিছু জাতের ব্যাকটেরিয়া আর ছত্রাক আছে।

এখানকার জলে লবণের পরিমাণ ৩৩.৭ শতাংশ। পুরো পৃথিবীতেই এর চেয়ে নোনা পানির জলাশয় আছে হাতেগোনা কয়েকটি। পানিতে লবণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় একটা মজাও আছে—কোনো চেষ্টা না করে এমনি এমনিই ভেসে থাকা যায়। আর এমনটা হয় শুধু আমেরিকার গ্রেট সল্ট লেকে।

লেকটা জর্দান, ইসরায়েল আর পশ্চিম তীরের মধ্যে অবস্থিত। চারপাশের তীর ও সংলগ্ন অঞ্চলের আরেকটি মজা আছে। অঞ্চলটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪২৩ মিটার বা এক হাজার ৩৮৮ ফুট নিচে অবস্থিত। এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু ভূখণ্ড। যাওয়া-আসার জন্য একটা মহাসড়কও আছে। ‘হাইওয়ে ৯০’ নামের মহাসড়কটি ইসরায়েল থেকে চলে গেছে পশ্চিম তীর অবধি। আর স্বাভাবিকভাবে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু মহাসড়ক।


মন্তব্য