kalerkantho

রহস্যজট

রতন অপহরণ

প্রিন্স আশরাফ

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



রতন অপহরণ

অঙ্কন : মানব

মুনশী দাদু একতলার ছাদে মাদুর পেতে গা এলিয়ে বসেছেন। চৈত্রের আগুনে দিন শেষ হলেও রাতেও যেন তার আমেজ আছে।

একপশলা বৃষ্টির জন্য সবাই হাহাকার করছে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে লোডশেডিং। ভ্যাপসা গরমে ঘরের মধ্যে টেকা দায়। ইজি চেয়ারটা ছাদে ওঠানো সহজ হলে ওটাই নিয়ে আসতেন। কিন্তু মাদুরেও বেশ কাজ হয়ে যাচ্ছে।

লোডশেডিংয়ের কারণে কারোর তেমন পড়াশোনার চাপ নেই। রাতের খাওয়া শেষ করে একে একে ওরা ছাদে চলে এলো। সঙ্গে আরেকটা মাদুর নিয়ে এসেছে। মুনশী দাদুর উপস্থিতি প্রবলভাবে থাকলেও ওরা নিজেদের মধ্যে আলাপেই মত্ত।

জলু বলল, ‘জানিস ডিটু, নতুন যে বাদশাহি আংটি মুভিটা হয়েছে না, অসাধারণ! ছোট চাচার ল্যাপটপে দেখেছি আমি। ’

‘আমি ওই গোয়েন্দা কাহিনীর বইটা পড়েছি। ’ বলল ফজু।

‘বই আর সিনেমার মধ্যে পার্থক্য আছে। বইতে নিজের মতো কল্পনা করে নেওয়া যায়। আর সিনেমায় কল্পনাটাকেই জোর করে দেখিয়ে দেয়। ’ বলল বিশিষ্ট আঁতেল মাকু।

দাদু তালপাতার হাতপাখাটা ফজুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘একটু বাতাস কর তো। একদম বাতাস নেই। গাছের পাতাও নড়ছে না। কেমন ঝিম মেরে আছে। বৃষ্টি হবে বোধ হয়। ’

ফজু বাতাস করতে করতে বলল, ‘বাদশাহি আংটি বইটা তোর কাছে আছে মাকু?’

মাকু উত্তর দেওয়ার আগেই দাদু বললেন, ‘কিসের গোয়েন্দা কাহিনী নিয়ে আলাপ করছিস তোরা? বইয়ের? বাস্তবের গোয়েন্দা দেখেছিস কখনো?’

অন্ধকারের মধ্যেও চারজনই একসঙ্গে দুদিকে মাথা নাড়ল।

‘তাহলে এই আমাকে দেখে নে? তবে সেটা শখের গোয়েন্দাই বলতে পারিস। প্রয়োজনের খাতিরেই গোয়েন্দা সাজতে হয়েছে আমাকে। ’

ওরা সবাই চিরকুমার পরিব্রাজক মুনশী দাদুর ব্যাপারটা জানে। দাদু সারা জীবন এ দেশ-ও দেশ, এ জায়গা-ও জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছেন। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—হেন কাজ নেই যা করেননি, কাজেই গোয়েন্দা সাজা দাদুর পক্ষেই সম্ভব!

জলু বলল, ‘তোমার সেই গোয়েন্দাগিরির গল্পটা আমাদের বলো না দাদু!’

‘গল্প নয় রে, সত্যি ঘটনা। সে বেশ আগের কথা। তখন তোদের কারোরই জন্ম হয়নি। আমারই তখন কতই বা বয়স, ২২-২৩ হবে। পরিপূর্ণ যুবক। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তই বলা চলে। কিন্তু যারা জমিদার ছিল তাদের জমিদারি চালচলন তখনো বহাল। সেই সময়ে আমি পলাশপুরের একটা মেসে আরো কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে থাকি। তো একদিন এক বন্ধু এসে খবর দিল, পলাশপুরের জমিদারের একমাত্র পুত্র রতনের জন্য ওরা একজন লজিং টিউটর খুঁজছে। টিউটর মানে খেলার সাথিই বলতে পারিস। পড়াশোনার পাশাপাশি ছেলেটাকে সঙ্গ দিতে হবে। গিয়ে একটা ছোটখাটো ইন্টারভিউ দিলাম। দেখলাম, ব্যবস্থা ভালোই। থাকা-খাওয়া ফ্রি, সেই সঙ্গে মাসে মাসে মাইনে পাওয়া যাবে। রাজি হয়ে গেলাম।

‘প্রথমে ভেবেছিলাম, ছোকরা খুব বিচ্ছু টাইপের হবে, তাই শায়েস্তা করার জন্য আমার মতো জাঁদরেল মাস্টার মশাইয়ের আমদানির দরকার পড়েছে। কিন্তু গিয়ে সে ভুল ভাঙল। রতন বেশ শান্ত ছেলে, ঠিক পড়ুয়া বলা যাবে না, তবে সব বিষয়েই আগ্রহ। জমিদারি প্রথা না থাকলেও চালচলন বজায় থাকার কারণে ওইটুকু বয়সে রতনকে যেমন ঘোড়ায় চড়া শিখতে হয়েছে, তেমনি শিখেছে কুংফু-কারাতে জু-জুত্সুর প্যাঁচ। আমি ওর মাস্টার মশাইয়ের চেয়ে সঙ্গী হলাম বেশি।

‘জমিদার মশাই নানা রকম নেশায় ডুবে থাকতেন। তার মধ্যে তাস-পাশা, দাবা খেলা, সুরা পান, গানবাজনা—এসব চলত। আর এ কারণেই বাড়িতে লোকজনের চলাচল অবাধ ছিল। গেটে একজন বয়সী প্রহরী থাকলেও সে সব সময় আফিম খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকত। ’

‘এভাবে দিনকাল ভালোই চলছিল। নায়েব, গোমস্তা, মালি, রাঁধুনি—সবার সঙ্গেই আমার মোটামুটি একটা ভাব হয়ে গেছে। তা ছাড়া রতনের সঙ্গে সময়টা বেশ ভালোই কাটে। কিন্তু একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জানা গেল—রতনকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না মানে কাল রাতে খেয়েদেয়ে বই পড়তে পড়তে নিজ বিছানায় ঘুমিয়েছিল। ভোরবেলা চাকর মধু ওকে ঘুম থেকে ওঠাতে গিয়ে দেখল বিছানায় নেই। আগে বলে নিই, রতনের মা দুরারোগ্য যক্ষ্মা রোগে গত হয়েছেন। তারপর সবাই সারা জমিদারবাড়ি, বাগান—সব জায়গায় খুঁজে দেখেছে। কোথাও নেই। ঘরের দরজা খোলা পাওয়া গেছে। আমার ঘরটা রতনের ঘরের পাশেই। কাজেই সবাই আমার কাছেই বারবার জানতে চাইল, আমি রতনের অন্তর্ধানের ব্যাপারে কিছু জানি কি না। শুনেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। তখনই ঠিক করলাম, গোয়েন্দাগিরি করে রতনের হারানো রহস্য এবং ও কোথায় আছে খুঁজে বের করব। ’

জলু জিজ্ঞেস করল, ‘অপহরণকারীরা নিয়ে যায়নি তো?’

‘সেটাই তো আমাকে বের করতে হবে। তার আগে গোটা ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে লাগলাম। জমিদারবাড়িতে লোকজনের আনাগোনা বেশি হওয়ায় কেউ রাতে ঘাপটি মেরে রতনের ঘরে লুকিয়ে থাকতেই পারে। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য পরে হয়তো তুলে নিয়ে গেছে। আর সেটাই আগে তদন্ত করে দেখতে হবে। তার আগে অবশ্য রতনের ঘরটা ভালো করে দেখে নিলাম। মানে গোয়েন্দারা যে রকমভাবে দেখে সে রকম আর কি। বই-খাতা, জামা-কাপড়, ওর নিত্যব্যবহার্য জিনিস ছাড়া অদ্ভুত কয়েকটা জিনিসও চোখে পড়েছে। মেঝেতে পড়ে ছিল কালো কাপড়ের বেল্ট, আধা জ্বলা মোমবাতি, দাবার ঘোড়া। ধস্তাধস্তির চিহ্নও মিলল। ’

‘গোয়েন্দারা ঠিক যেভাবে অফিশিয়ালি জেরা করে, আমি ওভাবে এগোলাম না। তোদের আগেই বলেছি, এ কয় মাসে বাড়ির মালি, দারোয়ান, রাঁধুনি—সবার সঙ্গেই বেশ ভাব হয়ে গেছে। তাই এমনি কথাবার্তা বলার ভঙ্গিতে জেরা শুরু করলাম। তোদের সংক্ষেপেই বলছি, আফিমখোর দারোয়ানের কাছ থেকে যে তথ্য পেলাম তা হলো—সারা দিনে অনেক লোকই এ বাড়িতে যাতায়াত করেছে, তার মধ্যে ওর চোখে পড়েছে জমিদারের দাবা খেলার সাথি সুধাংশু শেখর দত্ত, দুপুরের পরপরই এসেছিলেন। সন্ধে ঘোর হলেই অন্যান্য দিনের মতো চলে যান। কারণ জমিদার তখন অন্য সঙ্গী নিয়ে ব্যস্ত। অর্থাৎ তখন তাঁর প্রিয় সঙ্গী আরেক সাবেক জমিদার বন্ধু নন্দদুলাল রায়ের সঙ্গে নিজ ঘরে পান করছেন। সুধাংশু শেখরের আবার ওসব চলে না। গোটা দুপুরজুড়ে বাগানে রতন ঘোড়দৌড়বিদ জালাল খাঁর কাছে ঘোড়া দাবড়ানো শিখেছে। তারপর আস্তাবলে ঘোড়া বেঁধে রেখে নিজের কাজে চলে গেছে। বিকেলে রতনের কুংফু-কারাতে জু-জুত্সু শেখার টাইম। সেই সময়ে ওর নিয়মিত জু-জুত্সুর মাস্টার মিস্টার ওয়াংচু এসেছিলেন। সন্ধেবাতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত ওয়াংচু তাকে জু-জুত্সুর নানা প্যাঁচ শিখিয়েছে। ওয়াংচু এখানে রাতে খানাপিনা করে, তারপর যায়। হালকা বৃষ্টি হওয়ার কারণে তাকে বৃষ্টি থামার জন্য রাত পর্যন্ত দেখা গেছে। জমিদারের গোমস্তা নায়েব—ওরা বাড়িতেই ছিল, বাড়িতেই আছে। ওদের কাছ থেকে তেমন কোনো তথ্য বের করা গেল না। তবে নায়েব বলল, জমিদারের সঙ্গে নাকি পাশের গাঁয়ের জমিদার গজানন বাবুর বেশ কিছুদিন যাবত জমাজমি নিয়ে একটা ঝামেলা চলছিল। সেটারই মীমাংসা করতে গজানন কাল রাতে জমিদার মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। জমিদার তখন পানে ব্যস্ত। তাই গজাননের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতে পারেননি। তবে সাধারণ সৌজন্য দেখিয়ে গজাননকে পানের আহ্বান জানান। গজাননও অনেক রাত পর্যন্ত জমিদারের সঙ্গে পান করেন। তারপর টলতে টলতে বেরিয়ে যান। কিন্তু এদের কারো সঙ্গে রতনকে যেতে দেখা যায়নি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তখন রতন আমার কাছে ওর রুমে পড়াশোনা করছিল। ’

‘তাহলে তো ওরা শেষমেশ আপনাকেই সন্দেহ করবে। সর্বশেষ তো আপনিই রতনের সঙ্গে ছিলেন। ’ ফজু বলল।

‘ঠিকই বলেছিস। সন্দেহটা আমার ওপর পড়ে। কারণ রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত রতন আর আমি দাবা খেলি। শেষ দানটা জিতেছিল রতনই। দাবার বোর্ড আর গুঁটি রতনের পড়ার টেবিলের ওপর রেখেই আমি ওর ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। আর সে কারণেই আমি মরিয়া হয়ে রতনের অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে উঠে-পড়ে লাগলাম। ’

‘এখনো কোনো ক্লু পাননি?’ ম্যাকু জিজ্ঞেস করল।

‘হুঁ। ক্লু পেয়েছি। রতনের কামরা থেকেই। কারণ ওর রুম আমার চেয়ে আর ভালো কেউ চেনে না। সে অনুযায়ী তদন্ত শুরু করলাম। সূত্র ধরে এগিয়ে গেলাম নির্দিষ্ট জায়গায়। সেখানে যা থাকার কথা ছিল নেই। তারপর রতনের দেওয়া ক্লু থেকেই বের করে ফেলল, কে বা কারা ওই দিন মাঝরাতে এসে নিঃশব্দে রতনকে তুলে নিয়ে গেছে। জমিদার মশাইকে জানাতেই থানায় খবর দিলেন। পুলিশসহ গিয়ে জঙ্গলের এক পরিত্যক্ত কুঠিরে পেলাম রতনকে। বলা যায়, রতনের দেওয়া সূত্র আর আমার তাত্ক্ষণিক গোয়েন্দাগিরির কারণেই উদ্ধার করা সম্ভব হলো ওকে। মুক্তিপণের টাকা দাবি করার আগেই অপরাধীরা ধরা পড়ে গেল। ’

‘এখন তোরা বলত দেখি, রতন কী সূত্র দিয়েছিল? আর সেই সূত্র ধরে আমি কিভাবে রতনকে খুঁজে পেলাম। অপরাধী কে বা কারা?’


মন্তব্য