kalerkantho

আবিষ্কার

বাদুড়রাজ্য

পৃথিবীর ইতিহাসে সাড়া জাগানো সব আবিষ্কার নিয়ে আমাদের এই ধারাবাহিক আয়োজন। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



বাদুড়রাজ্য

৯০১ সাল। আমেরিকার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের কার্লসবাড পর্বতমালা। ১৯ বছরের তরুণ রাখাল জিম হোয়াইটের বাস এখানেই। এক সন্ধ্যায় সে গেছে পাহাড়ের দিকে গরু চড়াতে। হঠাৎ দেখে কী, একটা গর্ত থেকে কালো ধোঁয়ার মতো ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুড় বেরিয়ে আসছে। লাখ লাখ বাদুড়। এত বাদুড় কোত্থেকে এলো?

 

বাদুড়ের বাসা

রহস্য উদ্ঘাটন করতে আবার ফিরে এলো জিম। সঙ্গে নিয়ে এলো ল্যাম্প, দড়ি আর তার। দড়ি-তার দিয়ে সে ওই গর্তের মুখে একটা মইয়ের মতো বানাল। তারপর সেটি বেয়ে নামতে লাগল নিচে। প্রায় ৪৫ মিটার নামার পর পায়ের নিচে মাটি ঠেকল। আসলে মাটি ঠেকেনি, ঠেকেছে বাদুড়ের বিষ্ঠা। বাদুড়ের বিষ্ঠা জমে স্তূপ হয়ে আছে। একপাশে একটা পাথুরে পথ চলে গেছে। তা ধরে এগোতেই—ইউরেকা! হোয়াইট মাটির নিচের এক বিশাল গুহায় প্রবেশ করল। সে গুহাজুড়ে ক্যালসিয়াম জমা পাথর, মেঝেতে স্ট্যালাগমাইট, ছাদে স্ট্যালেকটাইট। একেবারে শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য যাকে বলে।

 

সারের খনি

জিম তো সেই গুহার কথা সবাইকে বলে বেড়াতে লাগল। কিন্তু কেউই ওর কথা বিশ্বাস করল না। সবাই ভাবল, ও বুঝি গুল মারছে। জিম কিন্তু এর মধ্যে ঘুরে ঘুরে গুহার আনাচে-কানাচে দেখতে লাগল। সব পথ আর গুহার কামরা খুঁজে খুঁজে বের করতে লাগল। কিছু কামরা এত বড় যে তাতে মসজিদ-গির্জার কাজও চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। সবাই ওর কথা উড়িয়ে দিলেও এক বণিক কিন্তু এর মূল্য ঠিকই দিল। সে গুহাটির খনিস্বত্ব কিনে নিল। তারপর বাদুড়ের বিষ্ঠা তুলতে লাগল। এই বিষ্ঠা সার হিসেবে খুবই ভালো। ইংরেজিতে এই সারকে বলে ‘গুয়ানো’, বাংলায় পক্ষীমল সার।

 

জাতীয় স্থাপত্য

আবিষ্কার করার পর থেকেই জিম নিয়মিত গুহায় ঘুরে বেড়ায়। একসময় এটাই তার নেশা হয়ে গেল। জিম পক্ষীমল সারের খনিতে কাজ করে টানা ২০ বছর। কাজের বাইরে সে যত সময় পেত, গুহার ভেতর ঘুরে বেড়ানোতেই কাটিয়ে দিত। তারপর খনিটা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু থেকে গেল জিম। একদিন শহর থেকে কিছু মানুষ এলো পরিত্যক্ত খনি, মানে কার্লসবাড গুহা দেখতে। জিম তাঁদের সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল। সে দলে একজন চিত্রগ্রাহকও ছিলেন। মনোমুগ্ধকর গুহাগুলোর বেশ কয়েকটি ছবিও তুললেন তিনি। সেসব ছবি দেখে লোকজন রীতিমতো অবাক হয়ে গেল। গুহার কথা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল। খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেল সরকারের কানেও। ১৯২৩ সালে মার্কিন সরকার গুহা পর্যবেক্ষণের জন্য একজন ইন্সপেক্টর পাঠাল। ফিরে গিয়ে ইন্সপেক্টর যে রিপোর্ট জমা দিলেন, তাতে কাজও হলো তাড়াতাড়ি। শিগগিরই গুহাগুলোকে জাতীয় স্থাপত্যের স্বীকৃতি দেওয়া হলো।

গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় গুহার মুখে অসংখ্য পর্যটক ভিড় করে বাদুড়ের ঝাঁক বের হওয়ার দৃশ্য দেখতে।

গুহা রহস্য

কার্লসবাড গুহায় গ্রীষ্মকালে সাত ধরনের বাদুড় বাসা বাঁধে। এদের অন্যতম ছবির মেক্সিকান ফ্রিটেইল বাদুড়। গ্রীষ্মে দিনে গুহাটিতে প্রায় ৫০ লাখ বাদুড় ঘুমিয়ে থাকে। সন্ধ্যা হলেই গুহা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে পড়ে।

কার্লসবাড ক্যাভের্ন ন্যাশনাল পার্কে আছে অন্তত শখানেক গুহা। গুহাগুলোর প্রতিটিই ভীষণ উঁচু, তাতে খিলানও আছে। আর আছে অদ্ভুত গড়নের চোখ জুড়ানো সব পাথর। ভূবিজ্ঞানীদের ধারণা, চুনাপাথরে তৈরি এই গুহাগুলো গঠিত হয় প্রায় ২০ কোটি বছর আগে। অতীতে জায়গাটা ছিল সাগরের নিচে। তখন এখানে প্রবালের স্তূপ ছিল। পরে এটি সাগর সমতলের চেয়ে উঁচু হয়ে গেলে ভূগর্ভস্থ পানি জমা হয় ভেতরে। পরে সেই পানির স্তরও নেমে গেলে ওখানে বাতাস জমা হয়। আর হাজার বছর ধরে বৃষ্টির পানির সঙ্গে খনিজ পদার্থ চুইয়ে এসে জমা হতে থাকে। এই খনিজ পদার্থগুলোই জমে জমে অদ্ভুতুড়ে সব পাথরের জন্ম দিয়েছে।

 

কার্লসবাড গুহা

কার্লসবাড গুহা আবিষ্কারের ঘটনা জিম হোয়াইটের জীবনই পাল্টে দেয়। এর পর থেকে জিমের সময় কাটতে থাকে গুহাগুলোর গলি-ঘুপচি খুঁজে বের করে আর এর কথা মানুষকে জানিয়ে। সরকার যখন কার্লসবাড ক্যাভের্নস ন্যাশনাল পার্ক চালু করে, জিমকে পার্কের প্রথম চিফ রেঞ্জার করা হয়। এখন এই পার্ক আমেরিকার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর এখানে ঘুরতে আসে প্রায় আট লাখ মানুষ।


মন্তব্য