kalerkantho

26th march banner

রহস্যজট

লাল ফিতা

তাহমিনা সানি

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



লাল ফিতা

অঙ্কন : মানব

‘আপনে মানুষ ভালা না!’—দীর্ঘদিন রোগে ভুগে বিছানায় শয্যাশায়ী জাহেদার শরীর প্রায় অচল হলে কী হবে, মুখ চলে সমানে। ইদানীং যেন আরো বেড়ে গেছে। হবেই না কেন। যুদ্ধের বাজার। প্রায় দিনই ঘরে আনাজপাতি কিছু থাকে না। ওষুধ কেনার পয়সা নেই। মেয়ে রশিদাকে নিয়ে সব সময়ই চিন্তা। কোন দিন কোন শকুনের চোখে পড়ে। এদিকে তাঁর বদ্ধমূল ধারণা, স্বামী নিজেও পাকিদের দলে নাম লিখিয়েছে গত সপ্তাহে।

তার পর থেকেই তাঁর ভোল বদলে গেছে। সারা দিন-রাত কোথায় কোথায় ঘোরে। ঘরে বউ-মেয়ে কী খেয়ে আছে কোনো খোঁজ নেই। দিন কতেক পর হঠাৎ করে সে বাড়ি আসে। সঙ্গে রাজভোগ। এক হাঁড়ি বিরিয়ানি কিংবা বড় বড় মুরগির দুরুস। বাদশাহি চালে খেয়ে, বউ-মেয়েকে খাইয়ে আবার গায়েব। পরদিন যে তাদের পেটে সিদ্ধ আটার দলা ছাড়া আর কিছু পড়ে না, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই থাকবে না।

‘আমোনর মুখে কিড়া পড়ে না ক্যান? থু!’—মুরগিতে বড় একটা কামড় বসাতে গিয়েও বিরক্তিতে মুখ সরিয়ে নিল চুন্নু মিয়া—‘খবরদার জাহেদা! আর একটা কথাও না!’

যাকে বলা হলো তার স্বরে বিন্দুমাত্র বিচলতা পাওয়া গেল না। বালিশ থেকে মাথা উঁচিয়ে আবার খনখনে স্বরে বলল, জাহেদা—‘কী খান অ্যা? কী খান? গোস্ত খান? মুক্তিগো সর্বনাশ কইরা এই ভোজ সইব না!’

রাগে শরীর কাঁপছে চুন্নু মিয়ার। শক্ত করে খামচে ধরল এলএমজি। বোকাবুদ্ধির নাদান মহিলা! কিচ্ছু বোঝে না। তাকে আর তার মেয়েকে বাঁচাতেই তো এই যুক্তিবুদ্ধি। নইলে আলবদররা কখন...

না। এই নাদান মহিলার কথায় কান দেওয়া যাবে না। দ্রুত পায়ে পাক আর্মি ক্যাম্পে ফেরার জন্য পা বাড়াতেই আবার থমকাল। মেয়ে ডাকল পেছন থেকে—‘আব্বা?’

‘কিছু কবি?’

‘হ। তুমি আমার চুল বান্ধনের ফিতা পাকি পতাকার নিচে বানছ ক্যান? আমার মাথা আউলা—বান্ধনের ফিতা নাই। ’ —মুখ গোমড়া করে প্রশ্নটা করতে করতে সে বাড়ির এক চিলতে উঠোনে বাঁশের লাঠিতে পত পত করে উড়তে থাকা চাঁদ-তারা খচিত পতাকাটা দেখাল। লাঠির মধ্যখানে মেয়ের চুল বাঁধার লাল ফিতা বাঁধা। একটু ঢিলে হয়ে এলে পড়েছিল। এলএমজি কাঁধে সেঁটে চুন্নু মিয়া অতি ব্যস্ত হয়ে লাঠির গায়ে টাইট করে ফিতা বাঁধার তোড়জোড় আরম্ভ করে দেয়। আর বলে—‘এইডা নিশান গো মা। ’

‘কেমুন নিশান?’

‘এর মানে হইল, আমরা খাস পাকিস্তানি লোক। আমাগো দিল মে পাকিস্তান হ্যায়। মোগো জবান মে উর্দু হ্যায়। বুঝলি?’

মেয়ে আহত চোখে তাকায় বাপের দিকে। কিছু বলে না। চুন্নু মিয়া কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত বোলায়। তারপর রওনা দেয় ক্যাম্পের দিকে।

ক্যাম্পে আজ উৎসব উৎসব ভাব। উনুনে আগুন দিতে ব্যস্ত দুজন পাকি জওয়ান। পোড়া কয়লা কিছু একপাশে সরানো। বদরবাহিনীর একটা দল উল্লাস করতে করতে বেরিয়ে গেল—নতুন নতুন মুক্তি ধরে আনা হবে।

নির্যাতন ক্যাম্পের ভেতর থেকে হঠাৎ ভেসে আসা জান্তব চিত্কারে সংবিৎ ফিরে পেল চুন্নু মিয়া। ধরে আনা মুক্তিযোদ্ধাদের ওখানে অত্যাচার চলে। রফিক মাস্টারের কী হাল দেখে এলে মন্দ হয় না।

বদরবাহিনীর সেবকদের সাচ্চা দিল হতে হয়—হতে হয় নির্ভীক। চুন্নু মিয়া তার ভীত দিল নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না। রফিক মাস্টারের হাল দেখে সত্যি তার পরাণ কেঁপে যায়। ইদানীং গুলি আর জবাই করে পাকিদের পোষাচ্ছে না। বিনোদনের নতুন নতুন ব্যবস্থা তারা নিজেরাই বানাচ্ছে। গতকাল বিকেলে হাত বাঁধা এক মুক্তিযোদ্ধার শরীরের সঙ্গে গ্রেনেড বেঁধে সেটির পিন খুলে দিয়ে বলল দৌড়া! বেচারা প্রাণ বাঁচাতে কিছু দূর দৌড়ে যেতেই গ্রেনেড ফেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে মারা পড়ল। অট্টহাসিতে মেতে ওঠল পুরো ক্যাম্প!

রফিক মাস্টারকে যেখানে আটকে রাখা হয়েছে ওই মুহূর্তে চুন্নু মিয়া ছাড়া আর কেউ নেই সেখানে। সবাই নতুন ধরে আনা আরো কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ব্যস্ত। সে দেখল, হাত-পায়ের সব কয়টা আঙুল ব্যাঙের গলার মতো ফোলা। নিশ্চয়ই পিন ফোটানো হয়েছে। হ্যাঁ। তাই তো। দুটি পিন তো এখনো ফুটে আছে বাঁ হাতের মাঝের দুই আঙুলের নখের নিচে! ও মাগো! মাথার পাশ দিয়ে বয়ে আসা রক্তের ধারা থেঁতলানো ঠোঁটের কাছে এসে শুকিয়ে থেমেছে। চুন্নুকে দেখেই বলল সে—পানি!

চুন্নু কী করবে ভেবে পেল না। তবে বেশ বুঝতে পারছিল, তার এ মুহূর্তেই সরে যাওয়া উচিত। কিন্তু সরতেও পারছিল না। পুরোপুরি আটকে গেছে রফিক মাস্টারের রক্ত জমে নীলচে চোখের দিকে। কী যেন আছে ওই চোখে!

‘মৃত্যুকালে আমার একটা ইচ্ছা পূরণ করবা চুন্নু মিয়া?’ —রফিক মাস্টার কথায় ভীষণ শরম পেল চুন্নু। তার মেয়ে বিনা বেতনে ক্লাস ফোরে পড়ত এই মাস্টারের স্কুলে। এমনকি রফিক মাস্টার নিজেও বিনা বেতনে কত পড়িয়েছে মেয়েকে। একান্ত বাধ্যগত শরমিন্দা দিলটা কোনোভাবে শক্ত করতে পারল না চুন্নু মিয়া। গোপনে এক গ্লাস পানি এনে দিয়ে বলল—‘বলেন। ’

‘একটা সাদা কাগজ দিতে পারবা? আর কিছু না। ’

দেবে না ভেবেও একটা সাদা কাগজ ঠিক জোগাড় করে এনে দিল। বাইরের হালচাল দেখে খানিক পর আবার এলো রফিক মাস্টারের কাছে। ১০ মিনিট পর আবার আসতে বলেছিল মাস্টার।

চুন্নুকে দেখে সাদা কাগজটা বাড়িয়ে দিল। যদিও সাদা কাগজ পুরোপুরি সাদা ছিল না। এখানে-সেখানে হালকা কালচে রক্তের ছাপ লেগে গেছে। আঁড় চোখে মাস্টারের বাঁ হাতটা দেখে নিল আরেকবার। এবার আবারও কেঁপে ওঠল তার কলজে! আঙুলের পিন বের করেছে মাস্টার!

 —কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা নিল চুন্নু। কিনারায় এলোমেলো রক্তের ছোপ বাদ দিলে একদম সাদা কাগজ। কিছু লেখা নেই। এ আবার কেমন কথা। মৃত্যুকালে রফিক মাস্টার শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গেল! ঘোর লাগা কণ্ঠ শোনা গেল মাস্টারের—‘মসজিদের বড় ইমামের কাছে দিবা। এক্ষণ যেতে পারলে ভালো হয়। একটা কয়লার টুকরা বা মাটির দলা দিয়া মুড়াইয়া নিয়ো, তাইলে আরো ভালো হয়। হারাইব না। ’ একদমে এত কথা বলে একেবারে চুপ হয়ে গেল।

একটা সাদা কাগজের পাতা! কিছুই তো লেখা নেই। গন্ধ শুঁকে দেখল। না, গন্ধও নেই। কী আজব! হোক গে আজব। এ আর এমন কী। মসজিদও বেশি দূরে নয়। সহজেই দিয়ে এলো। কিন্তু ক্যাম্পে ফিরে সে যা দেখল তার জন্য চুন্নু প্রস্তুত ছিল না। বিজয়ের বেশে বদরের দল ফিরে এসেছে। আজ তার ডিউটি ছিল ক্যাম্পে—তাই বোধ হয় কলজে কাঁপানো এই দৃশ্যটা তার জন্য অপেক্ষা করছিল। মুক্তি সন্দেহে বেশ কিছু যুবক আর ভোগের জন্য বেশ কিছু মেয়েকে ধরে আনা হয়েছে। তার মধ্যে একজনকে দেখতে পেল সে—তার চুলের বেণিতে লাল ফিতা!

মাথা ঘুরে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলালো চুন্নু। কিছু একটা করতে হবে! কিছু একটা করতেই হবে! পারল না। দৌড়ে কিছু দূর গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়ল। বিরিয়ানি হওয়ার অপেক্ষায় কয়টা ছাগল ম্যাঁ ম্যাঁ করে ওঠল। চুন্নু মিয়ার পুরা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল।

যখন জ্ঞান ফিরে এলো, চুন্নু মিয়া দেখল রশি দিয়ে বাঁধা কিছু মুক্তিকে ঘিরে একটা জটলা। ধরে আনা যুবকদের সে চেনে। ওর গ্রামেরই ছেলে। সুমন, বশির, গেদু, বিল্লাল, সঞ্জু, রানা, সুভাষ। সবাই চেনা। জানতে পারল, ওদের জবাই করে মারা হবে, নাকি গুলি করে—এই নিয়ে দুই বদর সেবকের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। টেবিলে পা তুলে তা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান বলল—‘খামোশ! বহুত হুয়া!’

চুন্নু মিয়া তখন সামনে গিয়ে বিনীতভাবে বলল—‘হুজুর! ম্যায় সাচ্চা দিলের পাকিস্তানি। আমারে একটা সুযোগ দ্যান। দিল বহুত বড় করতে চাই। একাই গুলি আর জবাই কইরা এই জাহান্নামি মুক্তিদের মওতের দরজায় পাঠাইতে চাই। দয়া করুন। ’

প্রসন্ন হেসে মাথা দোলালেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান—‘ইয়ে তো হামারি লিয়ে বহুত খুশি কী বাত হোগা! অ্যাক সাচ্চা পাকিস্তানি যো তুম বাননা চাহাতা হো! ঠিক হ্যায়। লে যাও ইস জাহান্নামি আদমিকো!

কাঁধে এলএমজি, এক হাতে ছুরি আর আরেক হাতে রশির এক প্রান্ত ধরে টানতে টানতে সে মুক্তিদের নিয়ে এলো ঝিলের পাড়ে। একটু আগে যেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল সে। কিছু সময় না যেতেই শোনা গেল এলএমজির গুলির শব্দ। এত দিনে এই প্রথম ব্যবহার করল সে! বাতাসে গুলির শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বদরবাহিনীর অন্য সদস্যরা পরীক্ষা করতে এলো। দেখল ঝিলের পাড় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পাড়ের কাছে লুটিয়ে আছে ১২টা মৃতদেহ। তাদের বুকে রক্তের স্রোত!

বদরবাহিনী উল্লাসে ফেটে পড়ল—‘চুন্নু আব সাচ্চা পাকিস্তানি! পাকিস্তান জিন্দাবাদ! পাকিস্তান জিন্দাবাদ!’ স্লোগান দিতে দিতে তারা ফিরে চলল। তখনই আক্রমণ হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল একটা দল চতুর্দিক থেকে হামলা করল।

শুরু হলো যুদ্ধ! মুক্তির যুদ্ধ! স্বাধীনতার যুদ্ধ! ঝিলের পাড়ে পড়ে থাকা রক্তাক্ত দেহগুলোও উঠে এসে যোগ দিল যুদ্ধে। চুন্নুর এলএমজি গর্জে ওঠল। প্রলয়ঙ্করী একটা রক্তের বন্যা বয়ে গেল পাকিস্তানি ক্যাম্পে।

এর পরেরটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। এক চুন্নু মিয়ার কৃতিত্বেই বেঁচে গেল গোপালডাঙ্গার অনেক মানুষের প্রাণ। বেঁচে গেল রফিক মাস্টার, সুমন, বশির, গেদু, বিল্লাল, সঞ্জু, রানা, সুভাষসহ আরো অনেকে। বেঁচে গেল লাল ফিতা মাথায় বাঁধা তাঁর মেয়ে রশিদা। ও তো চুলের ফিতা নয়, স্বাধীনতার লাল সূর্য!

পাঠক বলুন, চুন্নু মিয়া কী করে ক্যাম্পের বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর পৌঁছাতে পেরেছিল আর কী করেই বা ঝিলের পাড়ে গ্রামের যুবকদের বাঁচিয়েছিল?


মন্তব্য