kalerkantho


একাই থাকেন জুজেপ্পে

ইতালির একটি গ্রামে লোকসংখ্যা মোটে এক। সবে ধন নিলমণি লোকটির নাম জুজেপ্পে স্প্যানুয়োলো। লিখেছেন জুবায়ের হোসেন

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একাই থাকেন জুজেপ্পে

একা জীবন যাপন করা অধিকাংশ মানুষের জন্য এক দুর্বিষহ ব্যাপার। কিন্তু জুজেপ্পের জন্য সেটাই পরম শান্তির। কোলাহল নেই, যন্ত্রণা নেই, অন্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বালাই নেই! তাই বলে তিনি আজীবন এ রকম সংসারবিমুখ লোক ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী ছিল, ছিল চারজন ছেলেপুলে। কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। গোলটা বাঁধল শ্বশুরমশাই তাঁর বাসায় থাকতে শুরু করার পর। বছর ছাব্বিশ আগে এক ক্রিসমাস কাটাতে তাঁদের বাড়িতে এসে উঠেছিলেন। নববর্ষের আগে বেচারা এক গাড়ির ধাক্কা খেয়ে বসলেন। বুড়ো মানুষটা আর কখনো ফিরে যাননি নিজের গ্রামে। প্রথম দিকে জুজেপ্পে ভালোই কাটাচ্ছিলেন। এক বছরের মাথায় হাঁপিয়ে উঠলেন। ছোট বাসার মধ্যে এত মানুষ আর সহ্য হচ্ছিল না। কোলাহলমুক্ত পরিবেশ আর শান্তির খোঁজে নিজের গ্রাম ছেড়ে পাশের প্রায় জনমানবহীন গ্রামে পাড়ি জমালেন। বারো শ ফুট পাহাড়ের ওপর অবস্থিত গ্রামটির নাম রসিনো ভেচ্চো।

শখানেক বছর আগে গ্রামটিতে লোকবসতি ছিল। ১৯০২ সালে সরকার ঘোষণা করল, এখানে বসবাস করা খুবই বিপজ্জনক। কেননা মাটি সরে গিয়ে খাড়া পাহাড়ি ঢালে হারিয়ে যেতে পারে গ্রামটি। রাতারাতি গ্রামের জনসংখ্যা অর্ধেক কমে দাঁড়াল ছয় শতে। ১৯৬৪ সালে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দেখা দিলে বাকি লোকজনও গ্রাম ছাড়ল। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রইল পূর্বপুরুষের ভিটেবাড়ি। জুজেপ্পে যখন এই গ্রামে এসে পৌঁছান, তখন ডোরিনা নামের এক সন্ন্যাসিনী বসবাস করতেন এখানে। সাধু-সন্ন্যাসীরা এমনিতেই নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে পছন্দ করেন। তিনি খাবারের বন্দোবস্ত করতেন চাষাবাদ করে। তিনি ২০০০ সালে মারা যান। সেই থেকে গ্রামের একমাত্র অধিবাসী জুজেপ্পে। বলেন, ‘আমিই এ গ্রামের মেয়র, চৌকিদার বা প্রেসিডেন্ট!’

পরিবারের লোকদের কথা যে মনে পড়ে না তা নয়। স্ত্রীকে দেখতে প্রায়ই পাশের গ্রামে যান। আর ছেলেমেয়েরা বন্ধুদের নিয়ে দেখা করে যায় তাঁর সঙ্গে। জুজেপ্পের পুরনো প্রতিবেশী আর বন্ধুবান্ধবও মাঝেমধ্যে দেখা দিয়ে যান। সঙ্গে খাবার আনেন। দোকানগুলো মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া খাবার ফেলে না দিয়ে রেখে দেয় তাঁর জন্য। তিনি শাকসবজি যেমন—টমেটো আর মাশরুম চাষ করেন। সেগুলো খেয়ে দিন ভালোই কেটে যাচ্ছে তাঁর। ঠোঁটের কোণের পাইপটা সব সময়ের সঙ্গী।

পরিত্যক্ত এই গ্রামটি এখন ইতালির একটি পর্যটনকেন্দ্র। শত বছরের পুরনো অবিকৃত একটি গ্রাম দেখতে এখানে আসে লোকজন। আর তাদের একমাত্র গাইড জুজেপ্পে। গ্রামের ইতিহাস তাঁর থেকে আর ভালো কে জানে! আর তাঁর নিজের জীবনটাই তো এক রূপকথার কাহিনী। তাই পর্যটকদের কাছ থেকে ভালোই বকশিশ জোটে। অনেক সময় চলচ্চিত্রের শুটিং হয় এখানে। জুজেপ্পে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে যান। এভাবে চলে যাচ্ছে জীবন। এখন তাঁর বয়স ৬৭। ভবঘুরে জীবনে বেশ আছেন। বাকি জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা। মাটি সরে গিয়ে পাহাড়ের ঢালে হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন। জানালেন, গত ১১৩ বছরে দুই ফুটের বেশি একচুলও নড়েনি জমি।


মন্তব্য