kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


নির্জনবাস

ডজনখানেক মানুষের গ্রাম

নাবীল আল জাহান

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ডজনখানেক মানুষের গ্রাম

রাশিয়ার উরাল অঞ্চলের সিগারদোলস্ক প্রদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষই বাস করে এর শহরগুলোতে। তার মানে কিন্তু এটা নয় যে ওই প্রদেশে শহরই বেশি, গ্রাম কম। ওখানে অনেক গ্রাম আছে, কিন্তু সেগুলোতে খুব কম মানুষেরই বাস। উরালের সবচেয় জনবিরলত গ্রামটি গোটা রাশিয়ারই সবচেয়ে কম জনসংখ্যার গ্রাম। অবস্থানও অনেক গহিনে। রেলপথের একদম শেষ মাথা গিয়ে ঠেকেছে সেই গ্রামে। কালাক নামের গ্রামটির জনসংখ্যা মেরেকেটে মাত্র ১২-১৩ জন। এরা সবাই আবার পূর্ণবয়স্ক মানুষ। সবার চেয়ে কম বয়সী মানুষটির বয়সও ৩৪ বছর। মানে ওই গ্রামে কোনো বাচ্চাই নেই।

অবশ্য তিন দশক আগেও কালাকের এমন দশা ছিল না। তখন গ্রামটি রীতিমতো গমগম করত। থাকত প্রায় ৬০০ মানুষ। তখন কালাচ ছিল কাঠ ব্যবসার বড়সড় এক কেন্দ্র। গাছের গুঁড়ি আনা-নেওয়ার জন্যই কালাচ পর্যন্ত বসানো হয়েছিল ন্যারোগেজ রেলপথ। সে পথে করে গুঁড়িগুলো নিয়ে যাওয়া হতো ওলাপাইরইস্ক নামের এক জায়গায়। পরে ইয়েকাতেরিনবুর্গ শহরে ইস্পাতশিল্প গড়ে উঠলে, এ অঞ্চলের কাঠ ব্যবসায় ধস নামতে আরম্ভ করে। লোকজন কষ্টকর গাছ কাটার কাজ ছেড়ে কল-কারখানার কাজের দিকে ঝুঁকে পড়ে। গ্রামগুলোতে জনবসতি কমতে থাকে। সবাই গিয়ে আস্তানা গাড়তে থাকে শহরে।

সে কারণেই ৬০০ মানুষের কালাক গ্রামে এখন মোটে ১২-১৩ জন থাকে। তারা যে খুব খারাপ আছে, তেমনটা অবশ্য বলা যাবে না। নিজেদের মতো করে আছে ভালোই। দুনিয়া থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে, প্রকৃতির কোলে থাকছে। কালাচেই তারা আলু, টমেটো, শসার চাষ করে। তা দিয়েই তাদের খাওয়াদাওয়ার কাজ চলে যায়। সঙ্গে পশুপালন তো আছেই। আগে কালাকের লোকেরা গরু পাললেও এখন ভেড়াই পালে বেশি।

তাই বলে তারা দুনিয়ার সঙ্গে একদমই যোগ রাখে না, তেমনটাও নয়। ওই যে উরাল অঞ্চলের শ মাইল দীর্ঘ রেলপথটা তো কালাকে গিয়েই শেষ হয়েছে। সে পথে সপ্তাহে কয়েকবার একটা ৫০ বছরের পুরনো ডিজেল ইঞ্জিনের রেলগাড়ি কালাক যাওয়া-আসা করে। অবশ্য এখানকার লোকজন যাতায়াতের জন্য আরেকটা বিশেষ বন্দোবস্তও করে নিয়েছে। সে জন্যও তাদের ওই রেলপথই ব্যবহার করতে হয়। কালাকবাসী রেলপথে চলার উপযোগী একধরনের খুদে মোটরচালিত গাড়ি বানিয়ে ফেলেছে। গ্রামের অনেকেরই এমন গাড়ি আছে। সব দিন ওই পথে রেলগাড়ি আসে না, প্রয়োজন হলে তারা ওই খুদে রেলগাড়িতে চেপে কাছের শহরে চলে যায়। এই গাড়িগুলো যে ব্যবহার করার জন্য খুব ভালো, তা অবশ্য নয়। প্রায়ই এগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটে। হয়তো লাইন থেকে ছিটকে পড়ে যায়, নয় তো লাইনের মধ্যেই ভেঙে যায়। এ জন্য এগুলোর ডাকনামই হয়ে গেছে ‘ঝামেলা’।

কালাকে যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকলেও যোগাযোগের আর সব মাধ্যম ওখানে মাথা কুটে মরে। না আছে টেলিফোন লাইন, না আছে মোবাইলের নেটওয়ার্ক। ইন্টারনেটের তো প্রশ্নই ওঠে না। এমনকি বিদ্যুৎ সরবরাহও সীমিত। সন্ধ্যার দিকেই কেবল কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুতের ব্যবস্থা হয়। এখানে নেই পোস্ট অফিসও। লোকজনকে চিঠিপত্র সংগ্রহ করতে হয় সানকিন থেকে। কালাকের সবাইকে তাই মাসে অন্তত একবার সানকিনে আসতেই হয় সরকারি চিঠি, কাগজপত্র আর ভাতা নিতে।


মন্তব্য