kalerkantho


রহস্যজট

হারু মাঝির খটকা

ধ্রুব নীল   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হারু মাঝির খটকা

অঙ্কন : বিপ্লব

বিজুর দোকানে চা খাওয়ার সময় অনেকের মধ্যেই এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। চা খেতে খেতে আর কোনো হুঁশজ্ঞান থাকে না তাদের। এই ঘটনা গ্রামে চাউর আছে। কেউ বলে বিজুর চায়ে কিছু আছে। কিন্তু সেটি আর পরে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। হারু মাঝি চা খুব একটা খায় না। তবে গল্প শোনে। মানুষ দেখে। তার এই মানুষ দেখার বিষয়টিও গ্রামের সবাই মোটামুটি জানে। আর মানুষ দেখার জন্য হারু মাঝির কাছে কয়েক মাস ধরে বিজুর দোকানই ভরসা।

‘রেডুতে শুনলাম যুদ্ধ হইতাছে।

কিন্তু কই যুদ্ধ, কিসের যুদ্ধ?’

কথাটা বিজুর। যেন এই মুহূর্তে গ্রামে যুদ্ধ লাগলে সে-ই বেশি খুশি হবে। আজকের বিকেলের আসরে বাকি চারজন হলো মেদু মুন্সি, চালের ব্যবসা করে; লেবু সওদাগর, যখন যেটার সুবিধা হয় সেটির ব্যবসা করে; তরুণ মাস্টার, নামে তরুণ হলেও বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। হারু মাঝির সঙ্গে তরুণ মাস্টারের মিলমিশ ভালো। জনশ্রুতি আছে, তরুণ মাস্টারই নাকি হারু মাঝির কাছে পাঠ নেয়।

হারু মাঝি তার শান্তশিষ্ট চাহনি দিয়ে সবার দিকে তাকায়। গ্রামের সাদাসিধে লোকগুলো তাতে খুব একটা অস্বস্তিতে পড়ে না। তবে মেদু মুন্সি বিব্রত হয়। হারু মাঝি সেটি ধরতে পারে। সে মেদু মুন্সির দিকে না তাকানোর চেষ্টা করে।

চারজনই যে যার মতো করে কথা চালিয়ে যাচ্ছে। হারু মাঝিও টুকটাক বলছে।

মেদু মুন্সি : মিলিটারি তো আইসা পড়ছে। সোনামিয়ার হাটে নাকি জিপ দেখা গেছে।

দোকানদার বিজু : কই, গতকাইলই তো সোনামিয়ার হাটের থন ডিম আর চা পাতি আনছি। এমন কথা তো হুনি নাই। তুমি কী উল্টাসিধা কও?

মেদু : আরে দূর। শোনা কথা আর কি। মিলিটারি এই ফুলনবাড়ী গেরামে আইসা কী করব। কিছুই তো নাই। জমিজিরাত তো আর লইয়া যাইতে পারব না।

লেবু সওদাগর : আমি তো বাপু শুনি নাই। তয় যুদ্ধ একটা লাগব মনে লয়। হারু মাঝি, তুমি কী কও।

হারু মাঝি : যুদ্ধ চলতেয়াছে। কাইল রাতে রেডিওতে হুনছি।

তরুণ মাস্টার : তোমার তো আবার স্পেশাল রেডিও। তা জিনিসটা কই পাইলা, তা তো কইলা না।

হারু মাঝি হাসে। সে আসলে বলতে চায় না। বিশালাকৃতির রেডিওটার মতো তার নিজের ইতিহাসও সে বলে না।

মেদু মুন্সি : পাকিস্তান ভাইঙা গেলে কী হইব কও তো? এই যে এক পয়সায় ডিম খাইতেছ... সেইটাও বন্ধ হইয়া যাইব কইলাম।

হারু : কী আর হইব, আমি হারু মাঝি নৌকা চালামু স্বাধীন মতো।

বিজু : তা তো তুমি এখনো পারো। মানা করতেছে কে। হে হে। স্বাধীন হওনের কাম নাই। এমনেই বহুত ভালা আছি।

তরুণ : এটা আসলে পড়াশোনা না করলে বুঝবা না বিজু। চিনছ তো খালি সপ্তাহের এক দিন সোনামিয়ার হাটবার আর বেচাকেনা।

বিজু : আমি কইতেছি, যুদ্ধই লাগব না। আর লাগলে সেটা পরে দেখা যাইব।

হারু : না... নাহহ। পার্থক্য আছে, স্বাধীন আর পরাধীনের মাঝে।

মেদু : হে হে হে। বইয়ের ভাষায় কতা কইতেছ দেখি মাঝি। এত বিদ্যা পাও কই। ও বিজু, তুই কি সত্যিই কিছু শুনস নাই রে?

বিজু : গতকাল ডিমওয়ালা অবশ্য কইতেছিল গুজবটার কথা। আমি পাত্তা দেই নাই। মিলিটারি আইসাই করব কী। কারে মারব আর কারে ধরব?

তরুণ : হারু মাঝির পড়াশোনা অনেক। বইপত্তর পড়ে। সে যখন কইছে, ঝামেলা একটা আছে।

হারু : বইপত্তর না মাস্টর। পুঁথিপত্তর ছিল বাপ-দাদার কিছু।

মেদু : কিন্তু কইলা না তো, স্বাধীন দেশ লইয়া তুমি করবাটা কী।

বিজু : উল্টা আরো বিপদ। আমার দোকান লাটে উটবার পারে।

হারু : আমি কিছুই করুম না। তোমাগো পোলা-মাইয়ারা কিছু করলেও করবার পারে।

মেদু : হুম।

বিজু : আমার ডর করে মুক্তিগো লাইগাও। এদিকে কাউরে দেখছটেখছ নাকি।

হারু : হ।

বিজু : কও কী! কই ওরা!

মেদু : আমার বাসায় একবার আইতে চাইছিল। আমি কইছি আব্বারা আমারে মাফ করো। ঘরে জোয়ান মাইয়া। পরে আবার কী বিপদে পড়ি।

তরুণ : কী কও। গেদি আবার জোয়ান হইল কবে? হ্যার তো এখনো নাক টানে।

হারু মাঝি কেমন যেন অস্বস্তিতে পড়ে গেছে।

বিজু : ও মাঝি। কও না কেন। মুক্তিরা কই?

লেবু : হারু মাঝি যে নিজে কোন গেরামের মানুষ, তাও তো কয় না। তা মাঝি সোনামিয়ার হাটবারে তোমার রেডিওটা আমি বেচবার চাই। দিবা নাকি?

হারু : বেইচা কী করবা।

লেবু : ওইটা বেইচা আরেকটা রেডু কিনবানে।

হারু : এত খবর লইয়া কী করবা।

তরুণ : খবরই সব।

বিজু : মাঝি মনে লয় অন্য দেশের থন আইছ। তা যুদ্ধ যে হইতেছে তুমি দেখছ?

হারু : হুম। অনেক যুদ্ধ দেখছি জীবনে। আমার কুনু দেশ-গ্রাম নাই গো। আমি মানুষ দেহি। যুদ্ধ দেহি। এসব দেহাই আমার কাম।

তরুণ : আহা! আহা! কী শুনাইলা। মারফতি কথা শুনলে আমার চায়ের তৃষ্ণা জাগে। বিজু আরেক কাপ লাগাও।

লেবু : মিলিটারির জিপ সোনামিয়ার হাট হইয়া গেরামে ঢুকতে পারব না মনে লয়।

বিজু : হ, আমিও তা-ই কই। গতকাইল তো দেখলাম না। হাটবারে যদি না আসে, তয় কোনবারে আসব।

মেদু মুন্সি জরুরি কাজের নাম করে উঠে গেল। আছরের আজান দিল এ সময়। তরুণ মাস্টারও গেল নামাজে।

আজকের আড্ডা হারু মাঝির আর ভালো লাগল না। মনে মনে তাগিদ বোধ করে কিসের যেন। নৌকা চালিয়ে সোনামিয়ার হাটে যেতে হবে। আরো খোঁজ নিতে হবে। মিলিটারি যেকোনো দিন হানা দিতে পারে।

তরতরিয়ে পানি কেটে নৌকা চলে। হারু মাঝির মনে হয়, পানিও বুঝে গেছে দেশের অবস্থা ভালো না। কেমন যেন চুপচাপ। বৈঠার সঙ্গে কথা বলছে না।

সোনামিয়ার হাটেও লোকজন তেমন নাই। পরিচিত এক-দুইজনের দেখা পেলে খবর জিজ্ঞেস করত।

‘হারু না? ও হারু, কথা কও না কেন। বিন্তিরে বুঝি চিনো নাই। ’

হাটের এদিক-ওদিক দেখছিল হারু মাঝি। পেছন থেকে এক বৃদ্ধার কথা শুনে ফিরে তাকায়। খানিকটা চমকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আবার স্বাভাবিক। বিন্তি বুড়িকে চিনতে কষ্ট হয় না। সবাই বিন্তি বুড়ি ডাকলেও হারু মাঝি ডাকে বিন্তি।

হারু : তোমার মাথায় দেখি ডিমের ঝুড়ি। এত ডিম দিয়া কী করবা। মুরগির বাচ্চা ফুটাইবা?

বিন্তি : আরে হাটে বেচতে আসছি।

হারু : হুম। তোমার কাছ থেকে যদি কেউ ডিম না কিনে।

বিন্তি : আমার কাছ থেকেই কিনতে হইব। আমি ছাড়া আর কেউ বেচে না রে। কিন্তু তুমি দেহি আগের লাহানই আছ। তুমি বুড়া হইবা কবে হারু মাঝি।

হারু : হে হে হে। কী কও না কও। বয়স তো ম্যালা হইছে।

বিন্তি : কিসসু বুজি না। সোনামিয়ার হাটে নাকি মেলেটারি জিপ আসছে। এখন মানুষজন নাই। হাটবারে মানুষ না থাকলে চলে? এখন আমার ডিম বেচব কার কাছে?

চিন্তায় পড়ে গেল হারু মাঝি। তবে চিন্তাটা হলো খটকাজনিত। চায়ের আড্ডার কথা মনে পড়ে গেল। তিনজনের একজন উল্টাসিধা করছে। মনে মনে তার কুমতলব থাকতে পারে। এমনও হতে পারে আজ রাতেই মিলিটারি হয়তো গ্রামে গানবোট নিয়ে হাজির হবে। হারু মাঝি দ্রুত আবার তার নৌকায় ফিরে যায়। বিন্তির বিস্ময়কে পাশ কাটিয়ে সজোরে বৈঠা চালায়। আগের স্মৃতি মনে পড়ে। আরো অনেক যুদ্ধ দেখেছে সে। সব যুদ্ধের কথা একে একে মনে পড়ে। শেষ পর্যন্ত শয়তানগুলা কেউ টিকতে পারে নাই। এমনটা ভাবতে ভাবতে জোরছে বৈঠা চালায়। হারু মাঝি। গ্রামে গিয়েই আগে সমাজের গণ্যমান্যদের সঙ্গে বসতে হবে। ধরিয়ে দিতে হবে নিজেদের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ওই বিশ্বাসঘাতককে।  

বলুন তো বিশ্বাসঘাতক কে?


মন্তব্য