kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


আবিষ্কার

প্রাচীন নগরী

পৃথিবীর ইতিহাসে সাড়া জাগানো সব আবিষ্কার নিয়ে আমাদের এই ধারাবাহিক আয়োজন। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রাচীন নগরী


‘(পেত্রা ছিল) এক গোলাপি-লাল নগর, যেটি প্রায় ‘সময়’-এর মতোই পুরনো!’

জন উইলিয়াম বার্গন, প্রাচীন গ্রন্থবিদ (১৮১৯-১৮৮৮)

 

 

পেত্রা

 

পেত্রা আবিষ্কার করার পর বারখাট বিশ্ববাসীকে জানান মরুভূমির গহিন বুকে পাথরে তৈরি এই ভীষণ সুন্দর নগরের কথা। তখন থেকেই পর্যটক আর ঐতিহাসিকদের অন্যতম আকর্ষণের জায়গা হয়ে আছে এটি। পেত্রা ও এর অধিবাসী নেবাতাইয়েনদের নিয়ে বিশ্বব্যাপী শুরু হয় গবেষণাও। এখন পেত্রা একটি সংরক্ষিত এলাকা এবং অবশ্যই জর্ডানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র।

 

 

১৮১২ সালের কথা। তরুণ সুইস পর্যটক ইয়োহান বারখাট (১৭৮৪-১৮১৭) ভ্রমণে এসেছিলেন জর্ডানের দক্ষিণে। লোকমুখে শুনলেন, কাছেই নাকি মরুভূমির বুকে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। সব দেখেশুনে তাঁর মনে হলো, এটা বিখ্যাত প্রাচীন নগরী পেত্রা না হয়েই যায় না

 

 

 

পেত্রা নামের নগরী

পেত্রা নামের এই পাথুরে নগরী প্রায় দুই হাজার বছর আগের। আরবের নেবাতাইয়েন জাতির রাজধানী ছিল এই শহর। এখান দিয়ে তখন বেশ গুরত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যের পথ গিয়েছিল। শহরটি মূলত সেই বাণিজ্যপথকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। পথের যাত্রীদের ওপর নির্ভর করেই শহরটি হয়ে উঠেছিল রমরমা। কয়েক শ বছর পর বাণিজ্যপথ পরিবর্তিত হলে ধীরে ধীরে পাথুরে নগরীটিও পরিত্যক্ত হয়।

 

বারখাটের চতুরতা

১৮১২ সালে যখন বারখাট পেত্রা আবিষ্কারের কথা ভাবতে শুরু করলেন, তারও অন্তত হাজারখানেক বছর আগে পেত্রা নগর ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। হাজারখানেক বছর ধরে কোনো মানচিত্রে পেত্রা নগরের কোনো অস্তিত্ব নেই। সুতরাং নগরীটি খুঁজে বের করতে হলে বারখাটকে স্থানীয় গাইডের সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু তাতে ঝুঁকিও আছে। একে তো ওই অঞ্চলটা বিদেশিদের জন্য তখন মোটেই নিরাপদ নয়, তার ওপর তাঁকে বিদেশি গুপ্তচর ঠাওরানো মোটেই অসম্ভব নয়। তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হতে পারে। তখন তিনি এক চতুর পরিকল্পনার আশ্রয় নিলেন। দাড়ি কাটা ছেড়ে দিলেন। বড় বড় দাড়ি নিয়ে আরবের স্থানীয় পোশাক পরে আউলিয়া সাজলেন। লোকমুখে প্রচলিত, একজন নবীর সমাধি নাকি পেত্রার আশপাশেই অবস্থিত। বারখাট সবাইকে বলতে লাগলেন, তিনি যাচ্ছেন সেই সমাধি দর্শনে। পরিকল্পনা কাজেও লাগল। খুব তাড়াতাড়িই বারখাট গাইড পেলেন। যাত্রা শুরু করলেন পেত্রার পথে।

 

নয়নাভিরাম নগরী

গাইডের পিছু পিছু বারখাট মরুর বুকে হাঁটতে লাগলেন দিনের পর দিন। তারপর একদিন বারখাটের গাইড মরুভূমির বুক চিড়ে যাওয়া সেই পথ ছেড়ে নেমে গেল এক গিরিখাতে। সে গিরিখাতের দুই পাশে উঁচু উঁচু পাথুরে পাহাড়। মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় হঠাৎই বারখাটের চোখে পড়ল একটা পাথুরে ভবন। ভীষণ সুন্দর। হ্যাঁ, তাঁরা পৌঁছে গেছেন পেত্রা নগরে। বারখাট ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন নয়নাভিরাম পেত্রা নগর। নগরজুড়ে পাথুরে পাহাড় খুদে বানানো ভীষণ সুন্দর সব বাসাবাড়ি আর অট্টালিকা-প্রাসাদ। ফিরে এসে তিনি বিশ্ববাসীকে বললেনও তাঁর সেই আবিষ্কারের কথা। অবশ্য মানচিত্রের ঠিক কোন জায়গায় এই পাথুরে নগরীর অবস্থান—মানে পেত্রা নগরের সঠিক অবস্থান কোথায়, সেটি তিনিও সঠিকভাবে নির্দেশ করতে পারেননি। সেই কৃতিত্ব আবার দুই ফরাসির। লিনো বেলফুঁ (১৭৯৯-১৮৮৩) এবং লিউন দ্য ল্যাবঘদের (১৮০৭-১৮৬৯)। ১৮২৮ সালে তাঁরা সপ্তাহখানেক সময় নিয়ে শহরটির অনেক স্কেচ তৈরি করেন। পরে সেগুলো একত্র করে প্রকাশও করা হয়। আর সেসব দেখে তো মানুষের যাকে বলে চক্ষু চড়কগাছ। তার পর থেকেই পৃথিবীর অসংখ্য পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই পাথুরে নগরী পেত্রা।

 

পেত্রার ধ্বংসাবশেষ

 

ধুধু মরুর বুকে পেত্রার ধ্বংসাবশেষে ঘুরে বেড়ানো সত্যিই এক দারুণ অভিজ্ঞতা। নেবাতাইয়েনরা পাহাড় কেটে কেটে বানিয়েছিল অসাধারণ স্থাপত্যের সব ভবন। সেগুলোতে ছিল ভোজের জন্য ভবন, বাথরুম, সমাধি—সব। অনেক ভবন আবার পাহাড় কেটে কেটে বানানোর পর পাথরের গায়ে প্লাস্টারের প্রলেপও দেওয়া হয়েছিল। তারপর তাতে চড়ানো হয়েছিল উজ্জ্বল রং। এই নেবাতাইয়েনরা কেবল দক্ষ কারিগরই ছিল না, তাদের প্রকৌশল চাতুর্যও ছিল প্রশংসা করার মতো। আশপাশের তিনটি ঝরনা থেকে তারা পেত্রা নগরে পানির বন্দোবস্তও করেছিল। বুদ্ধি খাটিয়ে রীতিমতো পানির পাইপলাইনের ব্যবস্থা করে তারা। ট্যাংকের মতো বানিয়ে তাতে করা হয়েছিল পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা। সেখান থেকেই পুরো শহরে পানি সরবরাহ করা হতো। সেই পানি শুধু নগরীর মানুষের ব্যবহারের জন্যই নয়, শস্য উত্পাদন আর পশু পালনের জন্যও ব্যবহার করা হতো। পানির সরবরাহ ছিল প্রতিটি বাসায় তো বটেই, এমনকি মরুভূমির এই পাথুরে নগরীর বাগান আর ফোয়ারাগুলোয়ও।

 


মন্তব্য