kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পত্রিকার পাতা থেকে

লাশ নিয়ে যত কাণ্ড

পত্রিকার পাতায় কত বিচিত্র কাহিনী ছাপা হয়। এর অনেকগুলোরই নায়ক মানুষ, কোনোটির আবার বানর কিংবা মোরগের মতো কোনো পশুপাখি। বিদেশি বিখ্যাত-অখ্যাত বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত আশ্চর্য সব বিষয় নিয়ে আমাদের এই ধারাবাহিক আয়োজন। - জানাচ্ছেন ফাহমিদা হক

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



লাশ নিয়ে যত কাণ্ড

রবার্ট নেলসন (২০১৪ সালে তোলা ছবি)

১৯৬০-এর দশকের শেষ ভাগ। মিশিগানের এক অধ্যাপক রবার্ট এটিনজারের লেখা এক বই কল্পনাপ্রবণ মানুষের কল্পনার ডানায় যেন আরেকটু হাওয়া লাগিয়ে যায়।

এ বইতে তিনি হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় মানুষের মৃতদেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিজের মত প্রকাশ করেন। সঙ্গে এ-ও বলেন যে যত দিন চিকিত্সাবিজ্ঞান কোনো নতুন উপায়ে তাদের মৃত থেকে জীবিত না বানাতে পারে, তত দিন এভাবেই মৃতদেহগুলো সংরক্ষণ করা যেতে পারে! আর এভাবে মৃতদেহের রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়াটির নাম দেওয়া হয় ‘ক্রায়োনিকস’।

স্বাভাবিকভাবেই এটিনজারের এ লেখা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীষণ আলোড়ন তুলল, বিশেষ করে রবার্ট নেলসন নামের এক লোক তো পুরো মাঠেই নেমে পড়ল। উদ্দেশ্য, এটিনজারের প্রস্তাবিত উপায়ে আপনজনের মৃতদেহ সংরক্ষণ করা। সে সময়ে তার উদ্যোগে আমেরিকায় ক্রায়োনিক মুভমেন্ট নামে সংস্থাও গড়ে ওঠে।

তবে সবাই যে বিষয়টিকে সাদরে গ্রহণ করে, তা কিন্তু নয়। অধিকাংশ বিজ্ঞানীই একে গাঁজাখোরি বলে উড়িয়ে দিলেও ব্যাপারটি নিয়ে দিন দিন কানাকানি বাড়তেই থাকে। একবার তো এ গুজবও শোনা যায় যে বিশ্বখ্যাত এনিমেটর ওয়াল্ট ডিজনির মৃতদেহও নাকি কোনো এক ক্রায়োনিক চেম্বারের হিমাগারে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

এত সব গল্পের মধ্যে কোনটা যে গুজব আর কোনটা সত্য, তা ঠিকমতো জানা না গেলেও ১৯৮১ সালের মে মাসে এমন কিছু খবর জানা যায়, যা শুনে এ ব্যাপারে মানুষের মোহ কাটতেও দেরি হয়নি। মিলড্রেড এ হ্যারিসের কথাই ধরা যাক। ১৯৭০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আত্মীয়রা তাঁর মৃতদেহ রবার্ট নেলসনের ‘ক্রায়োনিকস সোসাইটি অব ক্যালিফোর্নিয়া’র এক হিমাগারে রেখে আসে। সোসাইটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁর মৃতদেহ সব সময় হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় রাখতে অনবরত তরল নাইট্রোজেন সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হবে। এর কয়েক বছর পর সেখানে রাখা হয় মিসেস হ্যারিসের মৃতদেহ।

এরও কয়েক বছর পর তাঁদের ছেলে মায়ের মৃতদেহ দেখার জন্য মাটির নিচের সেই ভল্টে ঢুকে এক ভয়ানক দৃশ্য দেখে কেঁপে ওঠে। তার মা-বাবা দুজনের মৃতদেহই ক্রায়োনিক সোসাইটির হাতে দেওয়া হয়েছিল সংরক্ষণের জন্য, আর দুজনের শরীরই খুব বাজেভাবে পচে গেছে। একই ধরনের ঘটনা ঘটে আরো দুটি পরিবারের বেলায়। আর এর পেছনে কারণ ছিল তরল নাইট্রোজেনের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া।

ভয়ংকর এ সত্য জানার পর ভুক্তভোগী পরিবার সব একজোট হয়ে ‘ক্রায়োনিকস সোসাইটি অব ক্যালিফোর্নিয়া’র বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮১ সালে এ প্রতিষ্ঠান এবং এর প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে এক কোটি পাঁচ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ মামলা করা হয়, যার অর্ধেকই ছিল মানসিক যন্ত্রণার ক্ষতিপূরণ চেয়ে। এমন ধরনের মামলা পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম।

এত সব ঘটনা যার জন্য, সেই রবার্ট নেলসন মহাশয় নিজের সাফাইয়ে কী বলল? তার ভাষ্য ছিল, ক্রায়োনিকস সোসাইটি কেবল এ ক্ষেত্রে গবেষণা করার উদ্দেশ্যেই বিজ্ঞাপন করেছিল। আর এ জন্য তারা যে অর্থ নিয়েছিল, তা ছিল নিছক দানস্বরূপ। তার প্রতিষ্ঠান কথা দিয়েছিল যে মৃতদেহ (মোট ১৫টি) সংরক্ষণের যথাসাধ্য চেষ্টা তারা করবে। কিন্তু একসময় প্রতিষ্ঠান অর্থ সংকটে পড়ে যায়, আর তাই বিল না দিতে পারার জন্য নাইট্রোজেনের লাইন কেটে দেওয়া হয়!

কেসের শুনানি হয় ১৯৮১ সালের জুন মাসে। রবার্ট নেলসন আর সঙ্গে দায়ী আরেক লোককে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণস্বরূপ ১০ লাখ ডলার প্রদান করার নির্দেশ দেন আদালত। সেই সঙ্গে ক্রায়োনিকস নিয়ে আর কোনো ধরনের পরীক্ষা কিংবা বাড়াবাড়ি করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।


মন্তব্য