খুদে বাজিকর-335148 | মগজ ধোলাই+ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭

রহস্যজট

খুদে বাজিকর

শেখ আবদুল হাকিম   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



খুদে বাজিকর

অঙ্কন : মানব

সৈকতদের পাড়া আজ কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। নতুন একটা টেলিভিশন প্রোগ্রামের জন্য মেধাবী শিশু-কিশোর খোঁজা হচ্ছে, শো বা প্রোগ্রামের নাম : দেখো বাংলাদেশ।

দেখো বাংলাদেশের একটা টিম কক্সবাজারে আসছে, যারা নিজ নিজ প্রতিভার পরীক্ষা দিতে চায় তাদের মধ্য থেকে দশজনকে বাছাই করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।

সৈকতের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মহিম বারী ওই বাছাইপর্বে অংশ নেবে। খবরটা প্রচার হয়ে গেছে ঠিকই; কিন্তু বারী কি খেলা দেখাবে বা পারফর্ম করবে তা কেউ জানে না। জানবে কী করে, বারী সেটি ইচ্ছা করেই গোপন রেখেছে। ছেলেদের মুখে শোনা যাচ্ছে, রাত-দিন চুপিচুপি প্র্যাকটিস করছে বারী। এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, কিন্তু উত্তর দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে সে। খুব করে চেপে ধরলে একবার শুধু বলেছে, ‘এই খেলায় আমাকে চোয়াল ব্যবহার করতে হবে। এর বেশি আমি কিছু বলব না।’

তারপর দিনটা এসে পড়ল। সকাল ১০টায় নিষ্ঠা আর সৈকত এলাকার কমিউনিটি সেন্টারের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। মহিম বারীর খেলা দেখবে ওরা। কমিউনিটি সেন্টারে ঢোকার মুখে লম্বা এক মহিলা একটুর জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে ধাক্কা খেল না।

মহিলার পরনে লাল পেড়ে হলুদ শাড়ি, তাঁর হাতের স্যুটকেসটাও হলুদ। কিছু না বলে হনহন করে চলে গেলেন তিনি।

কমিউনিটি সেন্টারের পাকা উঠানে ঢুকে মহিম বারীর খোঁজে চারদিকে তাকাচ্ছে খুদে দুই গোয়েন্দা। তাকে ওরা উঠানের মাঝখানে দেখতে পেল, একটা ফোয়ারার দিকে ঝুঁকে রয়েছে।

‘আসার জন্য ধন্যবাদ’, ওদের দেখে বলল বারী। ‘সমর্থক থাকলে সাহস পাওয়া যায়।’

‘সিল মাছ যেমন গায়ে গায়ে লেগে থাকে, আমরাও তা-ই থাকব’, কৌতুক করে বলল সৈকত, তবে হাসিটা চেপে রাখল।

বাছাইপর্বে আর যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তাদের ওপর চোখ বোলাচ্ছে নিষ্ঠা। ‘আচ্ছা, বারী, তোমার বয়স খুব কম হয়ে যাচ্ছে না?’ জিজ্ঞেস করল সে। ‘এখানে দেখছি সবাই টিনএজার।’

‘শোনো তাহলে, আজ আমি জিতব বলে আশা করি না’, বুঝিয়ে বলার সুরে উত্তর দিল বারী। ‘আমার মূল লক্ষ্য হলো অভিজ্ঞতা অর্জন। আমি কলেজে ঢুকতে চাই বিনা খরচায়।’

নিষ্ঠা আর সৈকত পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ‘আমরা বুঝিনি, কথাটা তুমি আরেকবার বলো।’

‘নিজের জাগলিংয়ে আজ যদি আমি সন্তুষ্ট হই।’ বলল বারী। ‘এটা নিয়ে আগামী সাত বছর কাজ করব আমি, যাতে একটা স্কলারশিপ পাই।’

‘কিন্তু জাগলিংয়ের জন্য কোনো কলেজ স্কলারশিপ দেয় না।’ প্রতিবাদের সুরে বলল নিষ্ঠা।

‘মুশকিল কী জানো, তোমরা না সেই মান্ধাতা আমলের চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে না।’ বলল বারী। এভাবে কথা বলাটা সে বাড়ির বড়দের কাছ থেকে শিখেছে। ‘আজকাল কলেজগুলো যেকোনো বিষয়ে স্কলারশিপ দেয়।’

ওরা কেউ কিছু বলার আগে আবার মুখ খুলল বারী, এবার গলা নামিয়ে। ‘আমার গোপন খেলাটা আগে দেখো, তারপর বলো। তিনটা আপেল নিয়ে জাগল করি আমি, শূন্যে থাকতে কামড় দিই ওগুলোয়। শেষের দিকে আমাকে শুধু আপেলের শাঁসের সঙ্গে জাগল করতে দেখা যাবে। খেতে খেতে প্রতিটি আপেলকে ছোট করে আনব, একসময় থাকবে শুধু মাঝখানটা—ইংরেজিতে যাকে বলে কোর।’

‘ওয়াও!’ বলল সৈকত। ‘দারুণ!’

‘যদি জিজ্ঞেস করো, আমার খেলার কঠিন অংশ কোনটা, আমি বলব অসম ওজন।’ বলল বারী। ‘তোমাকে আলাদা আলাদা ফোর্স ব্যবহার করতে হবে। তবে যার আছে আমার সামনের দুটি দাঁতের মতো দাঁত, সে বিশেষ সুবিধা পাবে।’

‘বাজারে বিদেশি এক কম্পানির চকোলেট পাওয়া যাচ্ছে, নাম ক্যান্ডি অ্যাপেল।’ বলল নিষ্ঠা। ‘তুমি গাছপাকা আপেল বাদ দিয়ে ওটা দিয়ে চেষ্টা করলে পারতে, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে কোনো একটা ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ পেতে।’

‘আমি প্রথমে একটা ভালো কলেজে পড়তে চাই।’ বলল বারী।

সাদা স্পোর্টস জ্যাকেট পরা এক ব্যক্তি হাজির হলেন মঞ্চে। বাছাইপর্ব শুরু হওয়ার ঘোষণা দিলেন তিনি।

‘প্রথমে অ্যাক্রোব্যাটরা, তারপর ড্যান্সাররা, সব শেষে জাগলাররা।’ বলল বারী। ‘আমি বরং একটু প্র্যাকটিস করে পেশিগুলো ঢিলে করে নিই।’

‘গুড আইডিয়া।’ বলল সৈকত।

‘আমি আসছি’ বলে কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে ঢুকল বারী। দুজন অ্যাক্রোব্যাট তাদের পালা শেষ করেছে। এই সময় ফিরে এলো বারী। তাকে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।

‘আ-মার আপেল গা-য়েব হয়ে গে-ছে!’ অবিশ্বাসে তোতলাচ্ছে বারী। ‘সিঁড়ির তলার প্রতিটি ইঞ্চি তন্নতন্ন ক-করে খুঁজলাম। কোথাও নেই। ও-ওগুলো কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে!’

আরো তথ্য পাওয়ার জন্য তার ওপর চাপ দিতে লাগল খুদে গোয়েন্দারা। বারী শুধু বলতে পারল, সে তার আপেলগুলো একটা হলুদ স্যুটকেসে ভরে কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে এসেছিল। স্যুটকেসটা পুরনো, এখানে-সেখানে তুবড়ে গেছে, পরিত্যক্ত অবস্থায় চিলেকোঠায় পড়ে ছিল অনেক দিন। সিঁড়ির তলায় জুতা রাখার সারি সারি র‌্যাক আছে, তারই একটার ওপর স্যুটকেসটা রেখেছিল সে। কিন্তু এখন সেটি ওখানে নেই।

‘গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় হলুদ একটা স্যুটকেস হাতে এক মহিলাকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি আমরা।’ বলল নিষ্ঠা।

‘ওই স্যুটকেসে কি জিপার আছে?’ জিজ্ঞেস করল বারী।

এক মুহূর্ত চিন্তা করল নিষ্ঠা। ‘না।’

‘তাহলে সেটি আমার নয়।’ বলল বারী।

‘তুমি এখন অন্য কোথাও থেকে আপেল জোগাড় করতে পারো না?’ জানতে চাইল সৈকত।

‘সময় নেই।’ জবাব দিল বারী। তার চেহারা কঠিন হয়ে ওঠল। ‘তা ছাড়া আগে নোংরা চোরটাকে ধরতে হবে আমার। আর একবার যদি ধরতে পারি রে...’ শক্তিশালী সামনের দুটি দাঁতের ওপর তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে গেল।

‘মাথা ঠাণ্ডা রাখো।’ সাবধান করল সৈকত। ‘বাছাই পর্বে আর কজন জাগলার অংশ নিচ্ছে?’

‘আরো দুজন।’ জানাল বারী। ‘নবীন নওয়াজ আর শর্মি শারমিন।’

‘নবীন আর শর্মি ভয় পেয়েছে, বারী হয়তো ওদের চেয়ে ভালো খেলা দেখাবে।’ বলল নিষ্ঠা। ‘বারী যদি বাছাইপর্বে অংশ নিতে না পারে, তাহলে শুধু ওরা দুজন লাভবান হয়। চলো, ওদের জেরা করা যাক।’

এটা একটা কেস, সেটি ঠিক আছে; কিন্তু নিষ্ঠার মতো খপ করে সেটি ধরে ফেলার ব্যাকুলতা সৈকতের মধ্যে দেখা গেল না। নবীন নওয়াজ ক্লাস টেনে পড়ে, হাসিখুশি অমায়িক ছেলে, সে প্লেট নিয়ে জাগল করে। শর্মি শারমিনের বয়স মাত্র ১৩, তবে দেখতে বেশ শক্তপোক্ত, সে-ও বেশ হাসিখুশি ও আন্তরিক। সে বল নিয়ে জাগল করে।

হলরুমের এক কোণে ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল বারী। তাদের দিকে সোজা হেঁটে গেল নিষ্ঠা।

‘একটা স্যুটকেসে জাগলিং ইকুইপমেন্ট নিয়ে এখানে এসেছে বারী।’ বলল সে। ‘কিন্তু দেখা যাচ্ছে, স্যুটকেসটা গায়েব হয়ে গেছে।’

‘ছি ছি, কী লজ্জার কথা।’ নবীন নওয়াজ বলল। ‘এখন কি সে পারফর্ম করতে পারবে?’

‘তুমি জানো পারব না।’ রাগে চেঁচিয়ে ওঠল বারী।

‘আমি দুঃখিত।’ বলল নওয়াজ। ‘কিন্তু ওকে আমি  কখনো স্যুটকেস হাতে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।’

‘না, আমিও দেখিনি।’ বলল শারমিন। সৈকতের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল সে, তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কাউকে দায়ী করছ নাকি?’

‘না, না, না!’ যত দ্রুত সম্ভব বলল সৈকত। ‘আমরা ভাবলাম, তোমরা চোরকে ধরতে সাহায্য করতে পারো। তোমরা এমন কাউকে চলে যেতে দেখেছ নাকি যার হাতে স্যুটকেস ছিল?’

‘ছেলেমেয়ে কার হাতে স্যুটকেস কিংবা শপিং ব্যাগ নেই বলো!’ মাথা নাড়তে নাড়তে বলল নওয়াজ। ‘সবাই সারাক্ষণ আসা-যাওয়া করছে...’

‘সে ক্ষেত্রে গোটা বিল্ডিংয়ে তল্লাশি চালাতে হবে আমাদের।’ বলল সৈকত। ‘বারীর স্যুটকেসটা পুরনো আর ধুলোমাখা, চোরের আঙুলের ছাপ অবশ্যই তাতে পাওয়া যাবে।’

‘এক সেকেন্ড!’ হঠাৎ প্রায় চেঁচিয়ে ওঠল শারমিন। ‘এখন যখন বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করছি, সন্দেহজনক একজনকে দেখেছি বলে মনে পড়ছে। উজ্জ্বল হলুদ শাড়ি পরা এক মহিলা সেন্টার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তোমরা যখন ভেতরে ঢুকছিলে। তাঁর হাতে একটা স্যুটকেস ছিল!’

‘আমিও ওই মহিলাকে দেখেছি।’ বলল নওয়াজ। ‘খুব তাড়াহুড়ার মধ্যে ছিলেন মহিলা। একটুর জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে ধাক্কা খাননি। তাঁর হাতে বারীর মতোই হলুদ একটা সু্যুটকেস ছিল!’

‘ওটা আমার স্যুটকেস নয়।’ বলল বারী। ‘আমারটায় জিপার আছে।’

সৈকতের দিকে ফিরল নিষ্ঠা। ‘বিল্ডিংয়ের সব কটা কামরায় তল্লাশি চালাতে আট-দশ দিন লেগে যাবে।’ বলল সে। ‘আমরা এমনকি এ-ও জানি না, চোর সেটি এই দালানের কোথাও লুকিয়ে রেখেছে, নাকি সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।’

‘তুমি সরাসরি চোরকে জিজ্ঞেস করলেই পারো।’ সহকারীকে পরামর্শ দিল সৈকত।

চোর তাহলে কে?

মন্তব্য