kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আবিষ্কার

হায়ারোগ্লিফসের রহস্যভেদ

পৃথিবীর ইতিহাসে সাড়া জাগানো সব আবিষ্কার নিয়ে আমাদের এই ধারাবাহিক আয়োজন। -লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হায়ারোগ্লিফসের রহস্যভেদ

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রোজেটা পাথর ঘিরে মানুষের ভিড়

চীন মিসরের বিভিন্ন স্থাপনায়, স্মৃতিস্তম্ভে ও সমাধিতে এক ধরনের ছবি খোদাই করা আছে। এগুলো আসলে এক ধরনের লিখন পদ্ধতি।

ছবি দিয়ে লেখার পদ্ধতি। যা পরিচিত হায়ারোগ্লিফস নামে। সেই কবে থেকে মানুষ এই লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করছে; কিন্তু কয়েক শ বছরের চেষ্টায়ও এই লিখন পদ্ধতির রহস্য ভেদ করা যাচ্ছিল না। তারপর ১৭৯৯ সালে মিসরের এক মরুভূমিতে দৈবক্রমেই একটি পাথরের টুকরো পাওয়া যায়। এই পাথরের স্ল্যাবটিই হয়ে আছে প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার

 

রোজেটা পাথর

প্রাচীন মিসরীয় হায়ারোগ্লিফসের রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছিল এই রোজেটা পাথর। এই চিত্রভিত্তিক লিখন পদ্ধতির রহস্য উদ্ঘাটন করাটা ছিল জ্যঁ-ফসোয়া শম্পোলিয়নের আজীবনের স্বপ্ন। ১০ বছর বয়স থেকেই শম্পোলিয়নের ধ্যান-জ্ঞান এই হায়ারোগ্লিফস। আর তাঁর এই আবিষ্কার মিসরের সুবৃহৎ লিখিত ইতিহাসকেই আলোর সামনে নিয়ে আসে।

 

পাওয়া গেল পাথর

১৭৯০-এর দশকে বিখ্যাত ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (১৭৬৯-১৮২১) বিশাল বাহিনী নিয়ে মিসর দখল করেন। ১৭৯৯ সালে তাঁর সেনারা রশিদ নামের এক নগরে একটি দুর্গ তৈরির কাজে হাত দেয়। নীল নদের অববাহিকায় অবস্থিত শহরটি পশ্চিমাদের কাছে পরিচিত রোজেটা নামে। আর সেই দুর্গ বানানোর জন্য বালু খুঁড়তে খুঁড়তেই পাওয়া যায় কালো রঙের পাথরের স্ল্যাবটি।

 

পাথরের টুকরার লেখা ও লেখার ভাষা

পাথরের টুকরাটির নাম দেওয়া হয় রোজেটা পাথর। একপাশে প্রাচীন লিপিতে কতগুলো লেখা খোদাই করা ছিল। তাতে মূলত একটা ডিক্রি জারির কথা লেখা ছিল। ১৯৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিসে জন্ম নেওয়া পঞ্চম টলেমি মিসরের সিংহাসনে বসলে তাঁর প্রতি মিসরীয় ধর্মযাজকদের আনুগত্য প্রকাশের ডিক্রি এটি। মানে, পাথরে খোদাইকৃত কথাবার্তা মোটেই তেমন আকর্ষণীয় কিছু ছিল না। কিন্তু যা দেখে সবার চোখ চকচক করে ওঠল, তা হলো লেখার ভাষা বা লিপি। পাথরের স্ল্যাবটিতে একই কথা তিন লিপিতে লেখা ছিল—গ্রিক, হায়ারোগ্লিফিকস এবং ডেমোটিক। ডেমোটিক লিপি মূলত হায়ারোগ্লিফকসেরই কিছুটা পরের সহজতর লিপি। ১৮০১ সালে মিসর চলে আসে ব্রিটিশদের অধীনে। আরো অনেক কিছুর মতো এই রোজেটা পাথরটিও তারা বাক্সবন্দি করে নিয়ে চলে আসে লন্ডনে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ইতিহাসবিদদের ধারণা ছিল, এটা তাঁদের দেশের ক্রিপ্টোগ্রাফারদের বেশ সহায়তা করবে। তাঁরা এর সাহায্যে হায়ারোগ্লিফকসের রহস্য উন্মোচন করতে পারবেন। কিন্তু লাভ হলো না মোটেই।

 

পাথর-পাঠ

এরও প্রায় ২০ বছর পর ফরাসি ভাষাবিদ জ্যঁ ফসোয়া শম্পোলিয়নের (১৭৯০-১৮৩২) সুযোগ হয় রোজেটা পাথর নিয়ে কাজ করার। প্রাচীন ভাষার ওপর তাঁর দখল ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে প্রাচীন গ্রিক ও কপ্টিক লিপির ওপর। এই কপ্টিক লিপি ছিল প্রাচীন মিসরীয় লিপিগুলোরই নুতনতর রূপ। শম্পোলিয়ন গ্রিক ও ডেমোটিক লিপির সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে স্ল্যাবটিতে হায়ারোগ্লিফসে লেখা টলেমির নাম প্রথমে খুঁজে বের করলেন। তাঁর নামটি একটা উপবৃত্তের ভেতর লেখা। এই উপবৃত্তটি শাসকদের নামের চিহ্ন বহন করে। এর নাম দিলেন কার্তুস। তারপর টলেমির নামের বানান থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করলেন ‘প’, ‘ল’ এবং ‘ও’ চিহ্ন বা চিত্র। তারপর অর্থ ভেদ করলেন আরেকটি কার্তুসের। তাতে লেখা ক্লিওপাদ্রা (ক্লিওপেট্রা)। এভাবেই শুরু হলো হায়ারোগ্লিফসের শতবর্ষী রহস্য উন্মোচনের কর্মযজ্ঞ।

 

‘(হায়ারোগ্লিফসের রহস্য উন্মোচন) দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ’

গ্রাহাম গ্রিন, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, ব্রিটিশ মিউজিয়াম (১৯৯৬-২০০২)

 

রোজেটা পাথরের খোদিত লেখাগুলোর প্রথম অংশ হায়ারোগ্লিফস, মাঝের অংশ মিসরীয় ডেমোটিক আর শেষ অংশ গ্রিক লিপিতে লেখা। পাথরের কোনার ভাঙা অংশগুলো অনেক খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি।

 

একটি ভুলে যাওয়া লিপি

প্রাচীন মিসরীয়রা পাঁচ হাজার বছর আগে লেখার জন্য হায়ারোগ্লিফিকস চিত্রলিপি ব্যবহার করত। রাষ্ট্রের ও উত্সবের বিভিন্ন নথি এবং স্থাপত্য, স্মৃতিস্তম্ভ ও সমাধির দেয়ালে লিখতে তারা এই লিপি ব্যবহার করত। কিন্তু ৭০০ ছবির এই চিত্রলিপি দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ছিল অত্যন্ত জটিল। সে জন্য তৈরি করা হয় আরো সহজ ও দ্রুতগতির ডেমোটিক লিপি। চতুর্থ শতকের শেষ দিকে চার্চগুলো হায়ারোগ্লিফসকে প্যাগান বিবেচনায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর এক প্রজন্ম পরেই আর এমন কেউ রইল না, যে হায়ারোগ্লিফস পড়তে পারে। চৌদ্দ শ বছর পর শ্যাম্পোলিয়ন পাঠোদ্ধার করার আগ পর্যন্ত তাই এটি ছিল ভুলে যাওয়া এক লিপি।

এই হায়ারোগ্লিফস পাওয়া গেছে মিসরের রাজা হোরেমহেবের (১৩৪৮-১৩২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সমাধির। দুটি উপবৃত্তাকার কার্তুসের মধ্যে যে লেখাগুলো আছে, তাতে দুই রাজার নাম লেখা। এ ধরনের কার্তুসের লেখা থেকেই শ্যাম্পোলিয়ন হায়ারোগ্লিফসের রহস্য উদ্ঘাটন করেছিলেন


মন্তব্য