kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রহস্যজট

ডাকটিকিট গায়েব

প্রিন্স আশরাফ

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ডাকটিকিট গায়েব

জোতির্ময় দাদুর ঘাসেভরা লনে মোটরবাইকটা পার্ক করেই হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির দিকে ছুটল রাশাদ রাহা। দাদুর কাছে তার দরকারটা খুব জরুরি।

সে যে ঝামেলায় পড়েছে, তার সমাধান একমাত্র জোতির্ময় দাদুর পক্ষেই করা সম্ভব। এত খুদে জিনিস নিয়েও যে ঝামেলা হয় আর গোয়েন্দাগিরি করতে হয়, তা রাশাদ রাহার হাতে এই কেস না এসে পড়লে জানতেই পারত না।

কেসটা বেশ ইন্টারেস্টিং। বিশেষত সাবজেক্টটা।

ডাকটিকিট গায়েব! রাশাদ রাহার স্কুল-লাইফে কয়েকজন বন্ধু অ্যালবামে ডাকটিকিট সেঁটে জমালেও ওকে তেমন একটা আর্কষণ করেনি। এর পরও ঝোঁকের মাথায় ওই সময় বন্ধুদের দেখাদেখি একবার কিছু ডাকটিকিট জমিয়েছিল। পোস্ট অফিসের ফেলে দেওয়া চিঠির খাম থেকে তুলে আনত সেগুলো। কিন্তু কালের বিবর্তনে কোথায় হারিয়ে গেছে তা। এখন আর কেউ ডাকটিকিট জমায় বলে রাশাদের মনেই হয় না। চিঠিপত্রের পাঠই চুকতে চলল, ডাকটিকিট জমবে কোথা থেকে! ইমেইল আর এসএমএস আছে না!

দুবার কলিংবেল চাপ দিতে বুয়া এসে দরজা খুলে দিল।

দাদু কোথায়?—কালক্ষেপণ না করে জানতে চাইল রাশাদ রাহা।

স্যারের জ্বর, তাই নিজের রুমে শুয়ে আছেন।

রাশাদ রাহা শঙ্কিত হয়ে পড়ল। জ্বর বেশি হলে দাদুর মাথাটা কাজ করবে তো ঠিকমতো?

কামরায় এসে রাশাদ রাহা বেশ অবাক। দাদু চমৎকার আছেন। মুখের সামনে শিবরাম চক্রবর্তীর একটা বই ধরা। হাসির বই পড়ে দাদু মনের আনন্দে হাসছেন। তারপর বললেন, মনে মনে বোধ হয় আমার জ্বর নিয়ে টেনশনে পড়ে গিয়েছিস। ভাবছিস দাদুর মাথা আবার ভোঁতা হয়ে গেল নাকি! যাক এখন তোর সমস্যার কথা বল। নতুন কী গাড্ডায় পড়েছিস?

রাশাদ স্বস্তির হাসি হেসে বলল, ছোটখাটো সমস্যা। ডাকটিকিটের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

দাদু মুখের ওপর থেকে শিবরাম সরিয়ে বললেন, ডাকটিকিটকে ছোটখাটো ব্যাপার বলছিস কেন? ডাকটিকিটকে সভ্যতার সাংকেতিক ইতিহাস বলে। নির্দিষ্ট সময়কালের দিনপঞ্জি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ডাকটিকিটের ছোট্ট বুকে অমর হয়ে থাকে। যা-ই হোক, ওসব তত্ত্বকথা বাদ দে, তোর সমস্যাটা কী তাই বল।

একটা বহু মূল্যমান দুষ্প্রাপ্য ডাকটিকিট চুরি হয়ে গেছে। চোর ও ডাকটিকিট দুটোর কোনোটারই খোঁজ মেলেনি। সেই সঙ্গে একটা রহস্যজনক মৃত্যুও জড়িয়ে আছে।

প্রথম থেকেই বল। দেখি, বেডে শুয়ে রহস্যের সমাধান করতে পারি কি না। তার আগে বল ডাকটিকিটটা এতটা রেয়ার কেন যে চুরি করতে হবে?

‘কারণ এটা অন্তত দুই শ বছরের পুরনো, দক্ষিণ আমেরিকার একটা ডাকটিকিট। শুধু তা-ই নয়, ডাকটিকিটটা ব্যবহৃত। ডাকটিকিট সংগ্রাহকরা জানেন, ব্যবহৃত ডাকটিকিটের মূল্য কতখানি। সংগ্রাহকদের কাছে এর তাই অনেক মূল্য। আর সবচেয়ে বড় কথা, জানামতে এই ডাকটিকিট ওই একটাই আর অবশিষ্ট আছে এখন। আর ওটায় ছিল প্যারট গোত্রের ম্যাকাউয়ের ছবি।

হু। বুঝতে পেরেছি। এখন বল, ডাকটিকিট কোথায়, কার কাছে ছিল, কিভাবে হারাল?

ডাকটিকিটটা ছিল সোনারগাঁর এক সংগ্রাহক এম এ বাহারের কাছে। তিনি হরেক রকম জিনিস কালেকশন করেন। বহু বছর ধরেই তাঁর কালেকশনের ঝোঁক। গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে শুরু করে ডাকটিকিট—সবই তাঁর সংগ্রহের অংশ। সংগ্রহের কথা তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ছাড়াও অনেকে জানে, পত্রপত্রিকায়ও এসেছে বেশ কয়েকবার।

দাঁড়া, দাঁড়া। কয়েক দিন আগেই তো এম এ বাহার সাহেবের মৃত্যুর খবর পত্রিকায় বেরিয়েছিল। ময়নাতদন্তে ফুড পয়জনিংয়ে মৃত্যু হয়েছে বলেই জানা যায়।

হ্যাঁ, ফুড পয়জনিংয়ে মৃত্যু। কিন্তু ও খাবারটা গোলমেলে ছিল। যা-ই হোক, তদন্তের কথা বলি। বাহার সাহেবের অন্য সংগ্রহগুলোর কথা লোকে জানলেও এই দুষ্পাপ্য ডাকটিকিটটার কথা কিন্তু খুব বেশি কেউ জানত না। তিনি ইচ্ছা করেই এত দিন বলেননি। কিন্তু কিছুদিন আগে এক ঘনিষ্ঠ সংগ্রাহক বন্ধুর কাছেই ডাকটিকিটটার উল্লেখ করেন। এমনকি তাঁকে দেখান। ছেলেমেয়েদেরও বলেন একটা দুষ্প্রাপ্য ডাকটিকিটের কথা। ছেলেমেয়েরা তেমন আগ্রহ দেখায়নি। শুধু যখন জানতে পারল ওটার অর্থ-মূল্য দশ লাখ টাকা, তখনই ওদের চোখেমুখে আগ্রহ ফুটে উঠল।

ডাকটিকিটটা কি ছেলেমেয়েদেরও দেখিয়েছিলেন?

ওরা তো বলছে, দেখায়নি। শুধু ডাকটিকিটের কথা বলেছে। তবে সংগ্রাহককে দেখিয়েই তিনি ডাকটিকিটটা গোপন জায়গায় লুকিয়ে ফেলেন।

সেই গোপন জায়গাটা কী?

সেটা বলেননি। তবে কোনো একটা সংকেত নিশ্চয়ই দিয়ে গেছেন। এবার আসল ঘটনায় আসি, যেদিন বাহার সাহেবের মৃত্যু হয়, সেদিনই তিনি ডাকটিকিটটা সংগ্রাহককে দেখিয়েছিলেন। সংগ্রাহক আবদুল গাফ্ফার সাহেব ডাকটিকিট দেখে আবার বাহার সাহেবের হাতে দেন, তারপর তিনি অন্যান্য কালেকশন দেখতে থাকেন। বাহার সাহেব দেখাতে দেখাতে উঠে গিয়ে বারান্দায় রাখা পোষা টিয়াটির খাঁচায় খাবার দেন। এসে দেখেন, গাফ্ফার সাহেব চলে গেছেন। বড় ছেলে তাহের ব্যবসার কাজে বের হওয়ার আগে বাবার সঙ্গে দেখা করে কিছু টাকার বন্দোবস্তের কথা বলে। কিন্তু বাহার সাহেব জানান, তাঁর কাছে ক্যাশ টাকা নেই, দামি জিনিসের মধ্যে ওই ডাকটিকিট আর অন্য সংগ্রহগুলো আছে। এগুলো তিনি জীবন থাকতে হাতছাড়া করবেন না। তারপর বাহার সাহেব বাথরুমে যান। তাহের বাবার জগ থেকে পানি খেয়ে বেরিয়ে যায়। তারপর বাবার কামরায় ঢোকে একমাত্র মেয়ে নাহার। তখনই আয়া নাশতা নিয়ে আসে। বাবাকে দেখতে না পেয়ে নাহার আয়াকে বিদায় করে দিয়ে নাশতাটা টেবিলে ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে যায়। ছোট ছেলে মিহির এসে কামরাটা খালি দেখে বসে থাকে। বাবাকে একটা জরুরি বিষয় জানানো দরকার। বসে থেকে পিপাসা লেগেছিল বলে ও বাবার জগ থেকে পানি খায়। বাবা বাথরুম থেকে বের হলে মিহির বলে, বাবা, আমাদের পোষা টিয়া মিঠু আবোলতাবোল বকছে। বাবা স্মিত হেসে বললেন, কী আবোলতাবোল বকছে? নাহার বলল, মিঠু বলছে, টিয়া ডাকে। বাটি থাকে। দাদু ডাকে।

এবার একটু চুপ করে থেকে বাবা বলেন, ও তো কত কিছুই বলে রে খোকা!

ভদ্রলোক মারা গেলেন কখন?—জ্যোতির্ময় দাদু ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।

দুপুরের দিকে। ফুড পয়জনিংয়ে। অথচ ওই একই রুটি-ভাজি সকালের নাশতায় সবাই খেয়েছে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আয়াকে ধরে নিয়ে গেছে। সংগ্রাহক গাফ্ফার সাহেবকেও আটক করেছে।

তুই কি সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিস?

হু।

তা থেকে কি বেরিয়ে এসেছে?

সংগ্রাহক জানায়, তিনি ওই ডাকটিকিটটা দেখেছেন সত্যি। কিন্তু তারপর ওটা বাহার সাহেবের হাতেই দিয়েছেন। বাহার সাহেব ডাকটিকিট হাতে নিয়েই পাখির খাবার দিতে যান। সেই সময় তাঁর একটা জরুরি ফোন আসায় তিনি বাহার সাহেবকে কিছু না বলেই বেরিয়ে যান। বন্ধুর জিনিস চুরি করার মতো রুচি তাঁর নেই। আমরা তাঁর কললিস্ট চেক করে দেখেছি। সত্যিই ওই সময় তাঁর ছেলের ফোন এসেছিল।

ছেলেমেয়েরা?

বড় ছেলে তাহের বলে বাবার কাছে কিছু টাকার জন্য গিয়েছিল। কিন্তু বাবা শুধু বহু মূল্য ডাকটিকিটের কথা বলেছিল, কিন্তু কী ডাকটিকিট, কী রকম—তার কিছুই বলেনি। তাকে না বললে অন্য ভাইবোনদের বলার প্রশ্নই ওঠে না। ও শুধু বাবার জগ থেকে পানি খেয়েছিল। মেয়ে নাহার জানায়, আয়া সকালের নাশতা নিয়ে আসছিল দেখে সেও বাবার কামরায় ঢোকে। বাবা রুমে ছিলেন না। খাবারটা রেখে ডাকটিকিটটা দেখার জন্য বসে ছিল। দুই শ বছরের পুরনো দক্ষিণ আমেরিকান ডাকটিকিট বলে কথা! তারপর আবার এই টিকিটের আর কোনো কপিই নেই পৃথিবীতে। কিন্তু দেরি দেখে বেরিয়ে যায়। ছোট ছেলেও মোটামুটি একই কথা বলল। শুধু বলল, ডাকটিকিটের কথা ও শুনেছে, কিন্তু ওটার সম্বন্ধে তেমন কিছুই জানে না। ও মিঠুর কথা জানাতেই বাবার কাছে এসেছিল, তারপর জগ থেকে পানি খেয়ে বেরিয়ে আসে। রাশাদ রাহা থামে, তারপর একটু বিরতি দিয়ে বলে, কি দাদু, কিছু বুঝতে পারলেন? ডাকটিকিট কিভাবে চুরি হয়েছে? কে নিয়েছে? কোথায় আছে? বাহার সাহেবকে কে খুন করেছে?

জোতির্ময় দাদুর মুখ জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বললেন, হু, বুঝতে পেরেছি।

পাঠক, আপনি বুঝতে পেরেছেন?


মন্তব্য