kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

দরজার ওপাশে

ফসিল শিকারি

ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক জায়গায় রয়েছে নিজের মতো করে ফসিল খুঁজে বের করার সুযোগ। চাইলে খুব সহজেই ফসিল শিকারি হয়ে যেতে পারবেন ওখানে গিয়ে। লিখেছেন ফাহমিদা হক

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ফসিল শিকারি

লাখ লাখ কোটি কোটি বছর আগে মরে যাওয়া গাছপালা কিংবা প্রাণীর শরীরের পুরো অংশ বা অংশবিশেষ আবহাওয়া আর প্রকৃতিগত বিভিন্ন কারণে প্রায় অক্ষত অবস্থায় থেকে গেলে, একে বলা হয় ফসিল বা জীবাশ্ম। ফসিলের কথা বহু আগে থেকেই মানুষ জানলেও ১৮ শতকের শেষ আর ১৯ শতকের গোড়ার দিকে আস্তে আস্তে মানুষ এর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে ভূতাত্ত্বিক আর বৈজ্ঞানিক কারণে ফসিল খোঁজা নিয়ে দুনিয়ার অনেক জায়গায়ই তোড়জোড় আরম্ভ হয়ে যায়। কেউ কেউ গবেষণার খাতিরে, আবার কেউ নিছক শখের বশে ফসিল খুঁজে বেড়ায় এখানে সেখানে। ফসিল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, এমন জায়গারও কিন্তু অভাব নেই। শত শত বা বলা ভালো হাজার হাজার এমন জায়গা আছে, যেখানে পোড় খাওয়া পেশাদার ফসিল সন্ধানী থেকে শুরু করে শখের অপেশাদার লোকজন খুঁজে খুঁজে ঠিকই বের করে এনেছে অমূল্য ফসিল।

কিছু কিছু জায়গায় ফসিলের দেখা মিললেও সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক জায়গায় উল্টো নিজের মতো করে ফসিল খুঁজে বের করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অনেকটা ব্যবসায়িক মনোভাব থেকেই এসব এলাকার মালিকরা পয়সার বিনিময়ে সবাইকে ঢুকতে দেন ফসিল পাওয়া যাওয়া এসব জায়গায়। প্রবেশকারীরা সঙ্গে নিয়ে যান মাটি আর পাথর খোঁড়ার সরঞ্জাম, সেই সঙ্গে চাইলে গাইডেরও সাহায্য নিতে পারেন।

সাধারণ মানুষের কাছে এসব জায়গা যেন রীতিমতো ফসিলের এক খনি। আর তাই মহা উৎসাহে সবাই মিলে এদিক-সেদিক খোঁজা শুরু করে, যদি একটুখানি ফসিলের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় সে আশায়। ফসিলের ভাগাড় হিসেবে যেসব জায়গা জনপ্রিয়, তার মধ্যে অনেকগুলোই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। বিশেষ করে উতাহ, ওয়াইওমিং, মিনেসোটা ও টেক্সাসের বেশকিছু এলাকায় দেখা মিলবে হরেক রকম ফসিলের।

উতাহ প্রদেশের ডেলটার ‘ইউ-ডিগ ফসিল’ জায়গাটি তো ট্রিলোবাইটস নামের সামুদ্রিক জীবের ফসিলের এক রমরমা ভাণ্ডার। ৫২ কোটি বছরেরও আগে ক্যামব্রিয়ান সময়কার এ প্রাণী প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে পার্মিয়ান যুগের শেষে বিলীন হয়ে যায়। ইউ-ডিগ ফসিলে পাওয়া জীবাশ্মগুলো লম্বায় এক ইঞ্চির মতো হয়। কপাল ভালো থাকলে কারো দেখা মিলতে পারে বিরল প্রজাতির কোনো ট্রিলোবাইটসের, যার দাম হয়তোবা কয়েক হাজার ডলার।

ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ফসিলের অনেক খনি। এমনই দুটো জায়গা হলো ওয়ারফিল্ড ফসিল কোয়ারি এবং ব্লু মুন কোয়ারি। ওয়ারফিল্ড ফসিল কোয়ারি যেখানে, সে জায়গার নামই হয়ে গেছে ফসিল লেক। কেননা পুরো এলাকায় চমৎকারভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় অসংখ্য মাছের জীবাশ্মের দেখা পাওয়া যায়, যেগুলো চার থেকে ছয় কোটি বছর পুরনো। ব্লু মুন কোয়ারির অবস্থান আবার ফসিল লেকের পাড় ঘেঁষে, যার কারণে এখানে মাছের সঙ্গে গাছপালা আর পোকামাকড়েরও ফসিল পাওয়া যায়। ধারেই রয়েছে আরেক ফসিল কোয়ারি, যার নাম টাইনস্কি’স ফসিল ফিশ। এখানে পাবেন ডিপলোমিসটাস, প্রিসকাকারা, স্টিংরে মাছ এবং কুমির ও কচ্ছপের জীবাশ্ম।

আমেরিকার আরেক অঙ্গরাজ্য মিনেসোটার দক্ষিণপূর্ব অংশে রচেস্টারে রয়েছে কোয়ারি হিল পার্ক। ৪৫ কোটি বছর আগে পুরো জায়গাটি ছিল সাগরতলে। এখন এখানে পাওয়া যায় ট্রিলোবাইটসসহ হরেক সামুদ্রিক প্রাণীর ফসিল।

টেক্সাসের মিনারেল ওয়েলসের বাইরেই রয়েছে মিনারেল ওয়েলস ফসিল পার্ক। পার্কটিতে আসা দর্শনার্থীরা এখানে দেখতে পাবেন ৩৩ কোটি বছর আগেকার পেনসিলভানিয়া যুগের সামুদ্রিক জীবনের ছবি, যেগুলোর মধ্যে সি লিলি থেকে শুরু করে আর্চিন, ব্রাকিওপড, অয়স্টার, কোরাল, আর্থ্রোপডসহ নানা গাছপালা আর আদিযুগের হাঙর পর্যন্ত রয়েছে।

গরমের সময়টাই সাধারণত ফসিল খুঁজে বের করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। শুনে ভীষণ রোমাঞ্চকর মনে হলেও মাটি খুঁড়ে, পাথর ভেঙে ফসিল খুঁজে বের করার কাজ কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। কারো কপাল ভালো হলে হয়তো পাঁচ মিনিটেই ফসিলের দেখা পেতে পারে, আবার কারো হয়তো পাঁচ দিনে দেখা নাও মিলতে পারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতুড়ির বাড়ি মারতে মারতে হাতে ফোসকা পড়ে যায়, কিন্তু ফসিলের দেখা মেলে না। তার ওপর গরমের সময় আমেরিকার এসব ফসিলপ্রবণ জায়গায় সূর্যের তাপের কথা না হয় বাদই দিলাম। এত কষ্ট করার পরও যদি কেউ ফসিল খুঁজে পায়, তখন সেটা যেন ঠিকমতো আনা যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। অধিকাংশ মানুষই প্রথমবার ফসিল পাওয়ার পর সেটা ঠিকমতো সংরক্ষিত অবস্থায় রেখে বের করতে পারে না। দেখা যায়, জোরে হাতুড়ির বাড়ি মারতে গিয়ে সাধের ফসিলের একটা অংশই ভেঙে গেছে। আর তাই পাথর ভাঙার সময় কিংবা মাটি খোঁড়ার সময় খুব সাবধানে ধীরে-সুস্থে কাজ সারাই ভালো। তা না হলে ফসিল খোঁজার পুরো অভিযানই ভেস্তে যায়।

 


মন্তব্য