kalerkantho

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন

ভবিষ্যতে পুষ্টির সহজ উৎস হতে পারে তেঁতুলপানা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ১৮:১৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভবিষ্যতে পুষ্টির সহজ উৎস হতে পারে তেঁতুলপানা

খাদ্য হিসেবে কচুরিপানার কথা ভাবা যেতে পারে কি? ক্ষুদিপানা বা তেঁতুলপানা কিন্তু অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য হয়ে উঠতে পারে। জার্মানির বিজ্ঞানীরা ডাকউইড চাষ ও খাদ্য হিসেবে তা প্রচলনের লক্ষ্যে কাজ করছেন।

আকারে ছোট, ছায়া পেলেই  জলাশয়ের উপর ছড়িয়ে পড়ে। পুকুর মালিক মাত্রই ঘৃণা করেন। কারণ এগুলির দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটে। ক্ষুদিপানা বা তেঁতুলপানা নামেই এই উদ্ভিদ বেশি পরিচিত। ইংরেজি ভাষায় তার পোশাকি নাম ডাকউইড।

এই ব্যক্তি কিন্তু খাদ্য হিসেবে এই উদ্ভিদের গুণাগুণ নিয়ে মুগ্ধ। তাঁর কাছে এই উদ্ভিদ যাকে বলে ‘মিব়্যাকল প্লান্ট' – অর্থাৎ অসাধারণ গুণসম্পন্ন এক গাছ। উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ক্লাউস আপেনরোট বলেন, ‘‘ডাকউইড গোত্রের সব উদ্ভিদই অবহেলিত। অথচ মানুষের পুষ্টির ক্ষেত্রে এগুলি অভাবনীয় অবদান রাখতে পারে।''

ক্লাউস আপেনরোট-এর কাছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ডাকউইড উদ্ভিদের সংগ্রহ রয়েছে। তাঁর গবেষণাগারে প্রায় ৫০০ পরিচিত প্রজাতির উদ্ভিদ বেড়ে উঠছে। সাধারণত সেগুলির মধ্যে এক ধরনের ফাঁপা পাতা থাকে। ফলে সেই উদ্ভিদ পানির উপর ভাসতে পারে।

মাত্র এক দিনের মধ্যেই এর আকার দ্বিগুণ হতে পারে।  ক্লাউস আপেনরোট এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছেন। তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘‘সব ডাকউইড প্রজাতির মধ্যে প্রোটিনের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি, শুকনো অবস্থায় যা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। কিন্তু তার মান আরও বিস্ময়ের কারণ। কারণ অ্যামিনো অ্যাসিডের মধ্যে উপাদানগুলির অনুপাত খুবই ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেমনটা পরামর্শ দিয়ে থাকে।''

 ডাকউইড-এর মাধ্যমে ভারতের খাদ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত সমস্যাগুলির সমাধানের লক্ষ্যে ক্লাউস আপেনরোট সে দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করছেন। গবেষকরা প্রোটিন-সমৃদ্ধ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রজাতির মধ্যে পরিকল্পিত প্রজননের মাধ্যমে ফ্যাটি অ্যাসিডের অনুপাতও বাড়াতে চান।

 থাইল্যান্ড ও লাওসে বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে খাদ্য হিসেবে ডাকউইড কাজে লাগানো হয়। জার্মানিতে না হলেও ভারতে সারা বছর ধরেই খোলা আকাশের নীচে ডাকউইড চাষ করা সম্ভব। ক্লাউস আপেনরোট বলেন, ‘‘এখানে একাধিক সমস্যা রয়েছে। প্রথমত এখানে একটাই মরসুম রয়েছে। অর্থাৎ মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আগস্টের শেষ, কখনো সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ডাকউইড চাষ করা যায়। শীতকালে খোলা আকাশের নীচে চাষ করা সম্ভব নয়।''

তাছাড়াপার্মাকালচার বা টেকসই কৃষি মুক্ত প্রকৃতির মাঝে ডাকউইড ক্ষতিকারক পদার্থ নিঃসরণ করে এবং অনেক জায়গা দখল করে। ডাকউইড যেখানে গজায়, সেখানে অন্য কোনো উদ্ভিদ টিকতে পারে না।

জার্মানির কালকার শহরের দুই বিশেষজ্ঞ এই সমস্যার সমাধান করতে চান। এক পদার্থবিজ্ঞানী ও এক উদ্ভিদ প্রজননকারী গ্রিনহাউসে ডাকউইড উৎপাদন করতে এক অসাধারণ প্রকল্পে অংশ নিচ্ছেন। পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে কার্ল মিশায়েল স্মিট বলেন, ‘‘তিনি বলেন, আমি গাদা করে ডাকউইড রাখতে পারি। পানিতে যত বেশি আয়রন চেলেট দেবো, বৃদ্ধি ততই ভালো হবে। সেটা অবশ্যই আয়রন, সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতি ও লো লাইট টলারেন্সের সমন্বয়ে এই প্রভাব দেখা যায়। এমন প্রভাবের কথা শুনে পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে আমি বিশাল উৎসাহ পেয়ে এই প্রকল্পে জড়িয়ে পড়ি।''

আয়রন বা লোহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক পদার্থ, যা সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতির জন্য প্রয়োজন হয়। আয়রন ডাকউইডকে এমনকি কম আলোর মধ্যেও সালোকসংশ্লেষ করতে সাহায্য করে। ডাকউইড ছায়ার মধ্যেও বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখে। কার্ল মারিয়া স্মিট ও হ্যারমান ইয়োসেফ ভিলহেল্ম এই আবিষ্কার কাজে লাগাচ্ছেন।

তাঁরা এমন প্লান্ট তৈরি করেন, যার মধ্যে ডাকউইড উপর-নীচে বেশ কয়েকটি তলায় রাখা সম্ভব। ফলে মাত্র এক বর্গ মিটার জায়গায় তাঁরা ৫ থেকে ১০ বর্গমিটার পরিমাণ উপযুক্ত প্রজাতির ডাকউইড উৎপাদন করতে পারেন। ক্লাউস আপেনরোট বলেন, ‘‘ডাকউইডের নিজস্ব কোনো স্বাদ নেই বলা চলে। ফলে সুবিধা হলো সব ক্ষেত্রেই তা কাজে লাগানো যায়।''

খাদ্য হিসেবে ডাকউইড অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। অমলেট বা স্মুদি হিসেবে তা খাওয়া চলে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে রেস্তোরাঁর খাদ্য তালিকায়ও এমন পদ যোগ হবে।

মন্তব্য