kalerkantho


মুখোমুখি ১২৫টি দেশ ভ্রমণকারী নাজমুন নাহার

'সুতোর টানে বেরিয়ে পড়ি, মাটির টানে ফিরে আসি'

সাকিব সিকান্দার   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৯:১৮



'সুতোর টানে বেরিয়ে পড়ি, মাটির টানে ফিরে আসি'

নাজমুন নাহার

'আমার টার্গেটটা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ গ্রহের দুশোটা দেশ ভ্রমণ করে ফেলা'। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি নিয়ে কোমল স্বরে কথাটা বললেও কণ্ঠের কঠোরতায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞার আভাস। যে মেয়েটা ১২৫টি দেশ চষে বেড়াতে গিয়ে লাল-সবুজের পতাকা কিংবা টি-শার্ট গায়ে জড়াতে ভোলেননি, এমন কথা তাঁর মুখেই সাজে। কেবল ১৯৩টি স্বাধীন দেশই নয়, পরাধীন আরো ৭টি দেশ পাড়ি দিয়ে বিশ্বের প্রথম মানবী হিসেবে গিনেস বুকে নাম লেখাবেন আমাদের নাজমুন নাহার। এলোমেলো আলাপচারিতায় তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন অভিজ্ঞতার বয়ানে। 

নাজমুন নাহারের সব ভ্রমণে যে বিষয়টা চোখে পড়ে তা হলো, বেশিরভাগ সময় তার গায়ে বা হাতে কিংবা মাথার কোথাও না কোথাও বাংলাদেশটা থাকেই। পতাকা হোক, কিংবা লাল-সবুজের চিহ্ন। আপ্লুত কণ্ঠে বললেন, 'আমি আমার মাটি থেকে কত দূরে চলে যাই। কিন্তু যেখানেই যাই না কেন, নিজের দেশের জন্যে খুব খারাপ লাগে। মনে হয়, দেশ-মাটি-পরিবার ফেলে সেই কবে এখানে চলে এসেছি! তাই দেশটাকে আমি সবসময় নিজের মধ্যে ধারণ করি। আবারো ছুটে যাই ভ্রমণের নেশায়। এটা কেমন যেন একটা সুতোর টানের মতো। বেরিয়ে পড়তে মন আনচান করে'।  

আপনি কি ভ্রমণপিয়াসী? বা ভ্রমণবিলাসী? 
'নাহ্‌, আমি অভিযাত্রী'।

এ কথার মর্মার্থ খোলাসা হবে যখন তার কিছু গল্প শুনবেন। যদিও এ বৈঠকে বিস্তারিত শোনার সুযোগ ও সময় ছিল না। তবুও কিছুটা তো বোঝাই যায়।


 
'অভিযাত্রী বলার কারণ আছে', আরেকটু বোঝানোর চেষ্টা করলেন নাজমুন। 'দেশে দেশে আমার ঘুরে বেড়ানো কেবল ঘটনা নয়, এর মধ্যে অনেক দুর্ঘটনাও রয়েছে। এটা কেবল জীবন উপভোগ নয়, যেন মৃত্যুর দর্শনও। যেমন চিলির আতাকামা মুনভ্যালি অদ্ভুত এক স্থান। সেখানে গত ১০০ বছরে একদিনও বৃষ্টি হয়নি। ভাবা যায় কি একটা আজব জায়গা ওটা! কিন্তু চাইলেই সবার পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সেখানকার আবহাওয়া অনেকেরই সহ্যের বাইরে। সেখানে গেলে ত্বক ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসে। আমারও তাই হয়েছিল। খুবই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। পেরুর রেইনবো মাউন্টেন তো রূপকথার কোনো জায়গা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪২ হাজার ফিটেরও ওপরে ওটা। ওখানে গিয়ে মনে হচ্ছিল আমি বুঝি এবার মারা যাবো। পাহাড় থেকে নামতে নামতে এক গাইড আমার অবস্থা বুঝতে পারছিলেন। তিনি আমাকে সাফ জানিয়ে দিলেন যে আমি যদি ওখানে মারা যাই তো আমার লাশ নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার মনের কথাও জানিয়ে দিলাম। বললাম, যদি তেমনটা ঘটেই যায় তো এই পতাকা দিয়ে ঢেকে আমাকে এখানে কবর দিও। বুঝতে পারছিলাম, মারা গেলেও আমার কোনো আক্ষেপ নেই। রেইনবো মাউন্টেন দর্শনের পর মনে হচ্ছিল, জীবনটা বুঝি সার্থক হলো'। 

এ গল্প শেষ হবার নয়...বলতে থাকলেন তিনি, 'এমন অসংখ্য বিপজ্জনক অবস্থায় পড়েছি। উগান্ডা থেকে রুয়ান্ড যাওয়ার পথে বাস অ্যাক্সিডেন্ট হলো। বাসের সবাই কোনভাবে বেঁচে গেলাম। তুমুল বৃষ্টি। আমি একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কাঁপছি। কি হবে জানি না। ভ্রমণ করে আমার আরেক দারুণ অভিজ্ঞতা হলো, সবাই খুবই বন্ধুসুলভ। সবাই সবাইকে সহায়তায় এগিয়ে আসেন। এই যে আমি একটা মেয়ে, একাকী কোথাও যাওয়ার কথা আমরা চিন্তাই করতে পারি না। কিন্তু ঘুরে ঘুরে আমি বুঝেছি, পৃথিবীর মানুষগুলো এতটা মন্দ নয়। আমি কখনোই এমন বাজে পরিস্থিতির শিকার হইনি। ওই ঘটনায় সবাই আমাকে এসে স্বান্তনা দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, ডোন্ট ওরি। ওই আর উইথ ইউ। সবাই সবাইকে তাই বলছিলেন। এসব কথা চাইলেই ভুলতে পারবেন না'। 

সবখানে একাই ঘুরেছেন? 'হ্যাঁ, তবে মোট ১৪টি দেশে আমার মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। আর সব জায়গায় একাই। আপনি যত ঘুরবেন সাহস ও থেমে না যাওয়ার মনোবল ততই বাড়তে থাকবে। কারণ অভিযাত্রীরা যত বিপদেই পড়েন না কেন, তার এগিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প মেলে না'। 

১২৫টা দেশ ঘুরে ফেলেছেন? বিজয়ীর হাসি দিয়ে বললেন, 'শেষ করেছি। আর আমি কিন্তু কোনো দেশে আরামে গিয়ে কেবল এদিক সেদিক ঘুরি না। ওখানকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঢুঁ মারি। একেকটা দেশে অনেক ঘোরাফেরা করি। আমার শততম দেশটা ছিল জিম্বাবুয়ে। গত বছরের জুনের ১ তারিখে সেখানে গিয়েছি। আর সর্বসাম্প্রতিকটা অর্থাৎ ১২৫তম দেশটি হলো নাইজেরিয়া'।  

 

দুশোটা দেশ তো ঘুরলেন? তো নয়া অভিযান আবার কবে শুরু করবেন? কোথায় যাবেন আগে? 'আশা করি সব ঠিক থাকলে এ বছরের মার্চে বেরিয়ে পড়বো। সুইডেনে যাবো আগে। এরপর বেশ কয়েকটি দেশে পথে পথে ঘুরে বেড়াবো'। 

ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে কী কী করেন? কী করতে ভালো লাগে? 'আমি বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে চাই। দেশে আসার পর আমি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন আয়োজনে গিয়ে কিশোর-কিশোরী বা তরুণদের মোটিভেশনাল স্পিচ দেই। এ কাজটা আমার খুব ভালো লাগে। ওরা সবাই মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনে। কেবল এসব অভিযানই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও আমি যতটা কঠিন সময় শক্ত হয়ে পার করেছি তা ওদের সাথে শেয়ার করি। আমার কথা শুনে ওরা বেশ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। কেউ কেউ আমাকে এসে জড়িয়ে ধরে, কান্না করে দেয়। এদের জন্যে কিছু করতে চাই'। 

এমন অভিযানের নেশা তো হঠাৎ করে এমনি এমনি আসেনি...মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, 'এখন বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না। আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, এক শবে বরাতের রাতে আমি নামাজ পড়ে দোয়া করছিলাম যে, আমি বড় হয়ে যেন অনেক দেশ ঘুরতে পারি। এখনো আমার সেই কথা স্পষ্ট মনে পড়ে। আমার মনে হয় কি জানেন, সেই কচি মনের দোয়া খোদা কবুল করে নিয়েছেন। আমি তো এখন বিশ্ব ঘুরছি। গোটা দুনিয়া ঘুরে ফেলবো শিগগিরই'।

আজ অনেক কথা হলো। এত কথা লেখা সম্ভব নয়। তাহলে আরেকবার দেখা হবে আশা করি। আমরা আরো ইতিহাস জানতে চাই...'অবশ্যই, আমি জানাবো'।

 

পায়ের কাছে রাখা ব্যাগটা তুলে নিলেন নাজমুন। হাঁটা ধরলেন অভিযাত্রী। তাঁকে ধরে রাখা কঠিন বিষয়। সুতোর টানে তিনি ছুটে যাবেন গ্রহের আনাচে-কানাচে। কিন্তু নাড়ীর টানে ঠিকই ফিরবেন নিজের মাটিতে। কাজেই তাঁর দেখা আবারো পাবো।

শেষবারের মতো বিদায় জানালাম, খোদাহাফেজ সোহাগী। স্মিত হেসে বিদায় নিলেন তিনি। আলাপের আগেই জেনেছিলাম...সোহাগী তার সেই ছোট্টবেলার নাম।  



মন্তব্য