kalerkantho


জারবেরা চেনেন?

সাভারে সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে

তায়েফুর রহমান, সাভার   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৯:৩৩



জারবেরা চেনেন?

শৌখিন উৎপাদনকারীদের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপ বা নেদারল্যান্ডসের জনপ্রিয় জারবেরা ফুল এখন রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারে সম্ভাবনাময় একটি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে। ব্যাবসায়িক ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে উপজেলার কয়েকটি এলাকায়।

জারবেরা অ্যাসটারেসি পরিবারভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফুল। জার্মান উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ও চিকিৎসক ট্রগোট জার্বারের নামানুসারে এ ফুলের নামকরণ করা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ফুল বাণিজ্যে কাট ফ্লাওয়ার হিসেবে উল্লেখযোগ্য ১০টি ফুলের মধ্যে অন্যতম। বেশিদিন ফুলদানিতে সতেজ রাখতে জারবেরার জুড়ি নেই।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। সাভারের বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তার কাছে জারবেরা এখন লাভজনক পণ্য হিসেবে সমাদৃত হয়ে উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, জারবেরাচাষিদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে এখন গোলাপ ও গ্লাডিউলাস চাষের পাশাপাশি জারবেরা চাষের দিকে ঝুঁকছেন। সাভারের এসব জারবেরাচাষির উৎপাদিত ফুল বিদেশে রপ্তানি না হলেও রাজধানী ঢাকাসহ স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে উৎপাদিত জারবেরা বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অনেক জারবেরা উদ্যোক্তা।

সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং জারবেরাচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শহর, উপশহর বা গ্রাম-গঞ্জে জারবেরা ফুলের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অভিজাত পরিবার থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জারবেরা ফুল না হলে চলেই না। বিভিন্ন উৎসবে ঘর সাজাতে জারবেরার জুড়ি মেলা ভার। এ ছাড়া বাঙালি নারীর খোঁপায় গুঁজতে, তোড়া তৈরিতে, অফিসের টেবিল সাজাতে জারবেরার ব্যবহার এখন লক্ষণীয়। নববর্ষ বা ভ্যালেনটাইনস ডে উদ্‌যাপনে জারবেরার কদর বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এ ছাড়া শীত মৌসুমে এই ফুলের চাহিদা এবং উৎপাদন দুটিই বৃদ্ধি পায়। গুণে-মানে ভালো হলে ক্রেতারা এ ফুলের ভালো দাম দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। আর সে কারণে যশোর জেলার পর রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার ও গাজীপুর এলাকায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জারবেরা ফুলের বাণিজ্যিক চাষ। কাট ফ্লাওয়ার হিসেবে এর স্থায়িত্ব, দীর্ঘায়িত লম্বা স্টিক বা ডাঁটা ও হরেক রঙের বর্ণময় জারবেরা এখন সবার পছন্দ। তাই বাণিজ্যিক জারবেরার মান উন্নয়নের জন্য অবিরত চলছে গবেষণা। তবে সরকারিভাবে এ গবেষণা যতটা না সাফল্য পাচ্ছে, তার চেয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে সাফল্য পাচ্ছে বেশি।

এই জারবেরা ফুল কেনাবেচার সবচেয়ে বড় বাজারটি হচ্ছে রাজধানীর শাহবাগে। আগারগাঁওয়েও অনেক ফুলের বেচাকেনা হতে দেখা যায়। এখানে প্রতিদিন যে পরিমাণ জারবেরা ফুল কেনাবেচা হয়, তার বেশির ভাগই আসে রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভার ও গাজীপুর এলাকা থেকে।

সাভারের বিভিন্ন এলাকায় এখন ৩৫০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে নানা ধরনের ফুলের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু জারবেরা ফুলেরই চাষ হচ্ছে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে

 

সাভার কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, সাভারের বিভিন্ন এলাকায় এখন ৩৫০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে নানা ধরনের ফুলের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু জারবেরা ফুলেরই চাষ হচ্ছে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে। রাজধানীর খুব কাছেই তুরাগ নদের ওপর নির্মিত বিরুলিয়া সেতু পার হলেই চোখে পড়বে সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জারবেরা চাষ হচ্ছে ব্যাপক আকারে। এই ইউনিয়নের আকরান এলাকার আইঠর গ্রামে একটি জারবেরার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বাগানে কাজ করছেন চারজন কর্মী। এঁদের মধ্যে যশোরের অধিবাসী রিপন হোসেন নিজ এলাকা থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এখানে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন। তবে ম্যানেজার হলেও সব ধরনের কাজই করছেন তিনি। রিপন হোসেন জানান, টিস্যু কালচারের মাধ্যমে জারবেরা ফুল চাষ হয়। এটা বেশ লাভজনক ব্যবসা। এক বিঘা জমিতে সারা বছর ধান, পাট, সবজিসহ অন্যান্য ফসলের চাষ করলে ৫০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া যায় না। এ থেকে উৎপাদন খরচ বেরিয়ে গেলে কৃষকের হাতে লাভের পরিমাণ খুবই কম থাকে। কিন্তু জারবেরা চাষে সমপরিমাণ জমি থেকে খরচ বাদে পাওয়া যায় প্রায় পৌনে ছয় লাখ টাকা। ফুল চাষের তিন-চার মাস পরই বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করা যায়।

সাভার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার নাজিয়াত আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানান, জারবেরা ফুলের বীজ থেকে চারা হয় না। মূল গাছ থেকে যে চারা হয়, তার ফুলের উৎপাদন কম। মানও বেশি ভালো হয় না। এ কারণে বংশবৃদ্ধির জন্য টিস্যু কালচার প্রয়োজন। এ পদ্ধতিতে একসঙ্গে অল্প সময়ে জীবাণুমুক্ত অধিক চারা পাওয়া যায়। এই ফুল বহু বর্ষজীবী হওয়ায় একবার চারা রোপণ করলে বহু বছর ফুল পাওয়া যায়। তবে প্রতিবছর নতুন চারা লাগালে উৎপাদন বেশি ভালো হয়। জারবেরা সূর্যমুখী প্রজাতির। ফুল দেখতে সূর্যমুখীর মতোই। এর নান্দনিক সৌন্দর্য ফুলের জগতে এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশে সাধারণত ৯টি রঙের জারবেরার জাত আছে। উন্নত মানের ফুল উৎপাদনের জন্য সাধারণত গ্রিনহাউসে জারবেরার চাষ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কেউই গ্রিনহাউস তৈরি না করে অনেকটা ওই আদলে একটি বাগান তৈরি করে। উজ্জ্বল সূর্যালোক জারবেরাগাছের বৃদ্ধি ও বেশি সময় ধরে ফুল উৎপাদনে সাহায্য করে। গ্রীষ্মকাল ছাড়া অন্যান্য সময় পূর্ণ সূর্যালোক জারবেরা চাষের জন্য উত্তম। গ্রীষ্মকালে উন্নত মানের ফুল উৎপাদনের জন্য ৩০ শতাংশ ছায়া প্রদান ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে জারবেরার চাষ করা হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছায়া প্রদান করলে পাতা হালকা সবুজ বর্ণ ধারণ করে এবং ফুলের দণ্ড খাটো ও শক্ত হয়। সাধারণত শীতকালে গাছে খুব তাড়াতাড়ি ফুল আসে। রাতের বেলার তাপমাত্রা জারবেরা চাষে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তাপমাত্রা কখনো ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর উঠতে দেওয়া উচিত নয়। চারা লাগানোর কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে পচা জৈব সার, ইউরিয়াসহ কিছু রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে ভালোভাবে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হয়।



মন্তব্য