kalerkantho


যে জীবন কবিতার

খসরু নোমান

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ১০:৫৭



যে জীবন কবিতার

'স্বপন সুরার ঘোরে

আখের ভুলিয়া আপনারে আমি

রেখেছি দিওয়ানা করে’

যে কবি নিজের বিষয়ে এভাবে বলতে পারেন, তিনি জীবনানন্দ দাশ, বাংলা কবিতার বিস্ময়। যাকে বলা যায় আপাদমস্তক কবি, যাপিত জীবনে, মননে, চিন্তা-চেতনায় এবং অবশ্যই কবিতায়। এ কবি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন

‘ভালোবাসি বেদনারে, ঐশ্বর্যের যশ
চাহি নাকো-মাগি নাকো প্রসাদ সম্মান
আমি কবি-পথে পথে গেয়ে যাবো গান’

ঐশ্বর্যের যশ তিনি চাননি। প্রসাদ সম্মানও কখনো প্রত্যাশা করেননি। তিনি কবিতা না লিখে অন্য কোনো কাজে মন দিলে হয়তো কলকাতা শহরে ৫তলা বাড়ি বানাতে পারতেন। সে ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা তার ছিল। তিনি সেই ব্রিটিশ শাসনামলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বিভাগ পান। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ডিগ্রি অর্জনের পর আইন বিষয়ে স্নাতক হন। এ রকম যোগ্যতা নিয়ে সে সময় নির্দ্বিধায় চাকরি-বাকরি করে অর্থবিত্তের মালিক হতে পারতেন তিনি। কিন্তু পারেননি, কারণ তার জীবন ছিল কবিতার।

যা কিছুকে প্রকৃতপক্ষে কবিতা বলা যায়, তা হৃদয়কে স্পর্শ করবেই। আর সময়কে অবগাহন করে কবি ও কবিতার পথচলা। জীবনানন্দ সময়ের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যা কিছু লিখেছিলেন, তা বাংলা কবিতায় শুধু নতুন যুগের যাত্রাপথই তৈরি করেনি, তা হৃদয়কে দারুণভাবে দোলা দেয়।

‘কেউ যাহা জানে নাই-কোন এক বাণী-
আমি বহে আনি;
একদিন শুনেছো যে সুর-
ফুরায়েছে-পুরনো তা-কোন এক নতুন কিছুর
আছে প্রয়োজন,
তাই আমি আসিয়াছি, আমার মতন
আর নাই কেউ!’

জীবনানন্দের কাব্য ভাষাও অন্যরকম। সনাতন কবিতার ধারাকে ভেঙে তিনি এক নতুন দ্যোতনাময় কাব্যশরীর সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘আমার পায়ের শব্দ শোনো, নতুন এ/আর সব হারানো-পুরানো’

আবার তিনি যখন বলেন, ‘গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত/আমাকে কেন জাগাতে চাও?’ আমরা পাঠকরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই।

‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে’ জীবনানন্দ সহজ-সরল জীবনযাপন করলেও তিনি সহজ কবি ছিলেন না। তিনি তাই তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র কাব্যভাষা।

আবার তিনি যখন বলেন, ‘সন্তানের মতো হয়ে-/সন্তানের জন্ম দিতে দিতে/যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়/... কিংবা যারা পৃথিবীর বীজক্ষেতে আসিতেছে চলে/জন্ম দেবে-জন্ম দেবে বলে/তাদের হৃদয় আর মাথার মতন/আমার হৃদয় না কি?/’ তখন আমরা বুঝতে পারি স্বতন্ত্র কবিহৃদয় ও ব্যতিক্রমী অনুভবের কবি আমাদের জীবনানন্দ দাশ।

তিনি তার কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিত্রকল্পের পর চিত্রকল্প সাজিয়ে গেছেন। তার কবিতার জগৎ এককথায় চিত্রকল্পময়।

কথাবার্তায় খুব একটা চৌকস ছিলেন না তিনি। খুবই লাজুক স্বভাবের ছিলেন এ ধীমান কবি। তিরিশের দশকে তিনি যখন বাংলা কবিতায় অন্যরকম শব্দ, ছন্দ ও প্রকরণে তার কবিতাকে তুলে ধরতে শুরু করলেন, তখন এক অর্থে পাত্তাই পেলেন না। যে দু-একজন তার কবিতার স্বাতন্ত্র্য বুঝতে পেরেছিলেন, তাদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু অন্যতম। ‘কবিতা’ পত্রিকায় যখন তার একের পর এক লেখা ছাপা শুরু হলো, চারিদিকে সমালোচনার ঝড় উঠল। প্রতিক্রিয়ার পর প্রতিক্রিয়া এবং গালাগাল। সে সময়ের জনপ্রিয় ‘শনিবারের চিঠি’ তার ওপর নগ্ন হামলা চালাল, তাকে অকবি এমনকি ছাগল বলেও সম্বোধন করা হলো।

জীবনানন্দ ও তার কবিতাকে জানতে সুদূর মার্কিন মুল্লুক থেকে বরিশালে ছুটে আসেন অধ্যাপক ক্লিনটন বুথ সিলি। তিনি এ দার্শনিক কবিকে নিয়ে লিখেছেন, ‘এ পোয়েট অ্যাপার্ট’ বইটি।

তিনি কলকাতায় চলে যাওয়ার পরও বরিশালকে ভুলতে পারেননি। তার মনে পড়ে থাকত বরিশালে। তিনি সময় পেলেই বরিশালে ছুটে আসতেন। কবিতায়ও বলেছেন

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে/এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়/হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে’

ডাক নাম ছিল তার মিলু। এই মিলু ছিলেন নিতান্তই চুপচাপ বা সাত চড়েও রা নেই ধরনের। বারবার তিনি চাকরি ছাড়তেন বা হারাতেন। একবার এলাকার এক মুরব্বি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বসে আছো? তিনি উত্তরে কিছু বললেন না; ডায়েরিতে লিখলেন, ‘বেকার কখনো বসে থাকে না।’
যাপিত জীবনে সত্যি সত্যি স্বপ্ন সুরার ঘোরে তিনি আখেরকে ভুলে থেকে নিজেকে দিওয়ানা করে রেখেছিলেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি, সর্বাধিক পঠিত কাব্যের কবি, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি তিনি। তিনি অনেক প্রতিষ্ঠিত কবিরও প্রিয় কবি। আমাদের কবি শামসুর রাহমানও অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে, তার প্রথম দিকের লেখায় জীবনানন্দের প্রভাব ছিল। একটা সময় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কেও জীবনানন্দের কুহকে ধরেছিল। অনেক সাহিত্যবোদ্ধা তাকে দেড় হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বলেও অভিহিত করেছেন। আর এসব অভিধা পেয়েছেন মৃত্যুর অনেক পরে। জীবদ্দশায় অনেক অবহেলা, অস্বীকৃতি ও অবজ্ঞা মাথা পেতে নিতে হয়েছে তাকে।

জীবনানন্দের মা ছিলেন কবি কুসুমকুমারী যিনি লিখেছিলেন সেই অমর কিশোর কবিতাটি ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ জীবনানন্দ কথা বলতেন খুবই কম। তিনি যে কাজে কতটা বড় ছিলেন তার প্রমাণ, মৃত্যুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত অপ্রকাশিত রচনার বিপুল ভাণ্ডার। মাত্র ৫৫ বছরের যাপিত জীবনে তার কবিতাগুচ্ছ প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র সাতটি। ঝরা পালক (১৯২৭) থেকে বনলতা সেন (১৯৫২) পর্যন্ত। এই সাতটি কবিতা গ্রন্থে কবির মোট ১৬২টি কবিতা সংকলিত হয়েছিল। কবির মৃত্যুর পর তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ হয়। রূপসী বাংলা ও বেলা অবেলা কালবেলা। মৃত্যুর পর তার অসংখ্য লেখা পাওয়া গেছে এবং যাচ্ছে। কবিতা তো অবশ্যই প্রবন্ধ, ছোট গল্প, উপন্যাস, বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা ডায়েরি, ইংরেজিতে লেখা প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, আরো কত রকমের লেখাজোখা! মৃত্যুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রবন্ধ সংখ্যা অর্ধশতাধিক, ১০টিরও বেশি উপন্যাস, শতাধিক ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাওয়া গেছে ৪০টি কবিতাসংবলিত অপ্রকাশিত কবিতার একটি খাতা, প্রচুর ইংরেজি কবিতাসংবলিত আরো একটি খাতা এবং অপ্রকাশিত গল্প ও উপন্যাস।

জীবনানন্দের কবিতা হৃদয়কে শুধু ছুঁয়েই যায় না, স্পর্শও করে। জীবিতাবস্থায় তাকে বহুবার অকবি বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। তিনি তার এক প্রবন্ধে (মৃত্যুর পর প্রকাশিত) এর উত্তর দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’

‘পৃথিবীকে মায়াবী নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়’ কী অদ্ভুত চিত্রকল্পময় পংক্তিমালার নির্মাতা তিনি। আবার তিনি যখন বলেন-

‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল’

শিশিরের কী শব্দ আছে? নিস্তবদ্ধতার উপমা ‘শিশিরের শব্দ’। চিল তার ডানা থেকে রোদের গন্ধ মুছে ফেলছে। গোধূলিলগ্নে ম্রিয়মাণ হতে থাকা আলোতে উড়ে যাচ্ছে চিল। ক্লান্তিকর দিনান্তে তার ঘরে ফেরা, যেখানে আছে মায়া।
তিনি জীবিতাবস্থায় স্বীকৃতি তো দূরের কথা, বরং বিদ্ধ হয়েছিলেন নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে। তাকে গণ্ডার কবি বলেও অভিহিত করা হয়েছিল। তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে সে সময় লেখালেখি হয়েছে বিস্তর। একটি লেখায় তাকে ছাগল বলেও অভিহিত করা হয়। শুধু তা-ই নয়, তাকে প্রগতিবিরোধী, পলায়নবাদী বলেও অভিহিত করা হয়েছিল। সেসব তথাকথিত সাহিত্য সমালোচকদের নাম ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে পতিত হয়েছে। কিন্তু জীবননান্দ আজো বেঁচে আছেন তার লেখনীতে।

‘আলো অন্ধকারে যাই
মাথার ভেতর স্বপ্ন নয় সাধ নয়
আরও এক বোধ কাজ করে’

ভিন্ন বোধ ও মননের কবি ছিলেন জীবনানন্দ। ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্র“য়ারি বাংলা ভাষার এ মহোত্তম কবির জন্ম। মৃত্যু ১৯৫৪ সালে, ২২ অক্টোবর, কলকাতায়, ট্রাম দুর্ঘটনায়।



মন্তব্য