kalerkantho


ওই মালতিলতা দোলে

বিপ্রদাশ বড়ুয়া   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১১:০৯



ওই মালতিলতা দোলে

মালতির সঙ্গে প্রথম পরিচয় প্রকৃতি-প্রেমিক ও শৌখিন জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় রচিত বলধা গার্ডেনে। ১৯০৯ সালে তিনি বলধা গার্ডেনের সূচনা করেন। তাঁর বাসভবন ঘিরে এমন অমর পরিকল্পনা আমাদের বিস্মিত-বিপর্যস্ত ও তৃষিত করে। সচরাচর জমিদারদের সৃষ্টিছাড়া আবাস তো এ নয়। সেই ফুল্ল মালতির ঝাড়ের কাছে গিয়ে আমার অজ্ঞতা দুর্দান্ত দীনতা নিয়ে প্রকট হয়ে পড়ল। ছেলেবেলায় তিন নদীর ভাঙনে নিয়ে গেল আমাদের শতবর্ষীপ্রায় অশোক, নাগকেশর, পাখি, ফুল (ব্রাউনিয়া কক্কোনিয়া), শিমুল, জারুল। মালতি ছিল না, চিনতামও না। ছিল মধুমালতি, কামিনী, স্থলপদ্ম। কুর্চি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের ও টিলার স্বাভাবিক বৃক্ষ হলেও তখন চিনতাম না, কেউ চেনায়ওনি। পরে নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে বই দেখে চিনেছি।

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে মালতির একটি বড় ঝাড় রেখে গেছেন। আর এখন আপনি একটি চারা সংগ্রহ করতে চান মালতি বা কুর্চির, অথবা নীলমণিলতার বা পিয়াল ফুলের! ‘ওই মালতিলতা দোলে,/পিয়াল তরুর কোলে’ রবীন্দ্রসংগীত শুনেছেন? নজরুল মালতি ফুলে ভ্রমর গুঞ্জরন শুনে নূপুরের শব্দকে তুচ্ছ করে দিয়ে গেয়েছেন, ‘মধুপ গুঞ্জরে মালতি-বিতানে,/নূপুরের গুঞ্জরন নাহি শুনি কানে।’ আপনি যদি একটি মালতি বা স্বর্ণ অশোকের চারা সংগ্রহ করতে চান তো যোগ্য মালির কাছে খোঁজ করে নিজের উঠোন বা বাগানকে গরবিণী ও রূপসী করে নিন। মালতি, মাধবী, নীল ও কালো গোলাপের দোলায় আপনিও দুলতে পারবেন। তুষার-লাল গোলাপ দেখেছি কুমিল্লার বার্ডে রক্তাক্ত পঁচাত্তরের পরের বছর। তুষার শুভ্র পাপড়িতে এক-দুই ফোঁটা লাল রক্তের কী তীব্র আর্তি! তার সঙ্গে গোলাপের অক্ষত সুরভি। এই হচ্ছে তুষার-লাল গোলাপ।

মানব বা মহামানব হত্যা নয়, ১৯৯৮ সালে ফেব্রুয়ারি-মার্চে রমনা পার্ককে সুন্দরের নামে জঘন্য করে তোলার চেষ্টায় পার্কের বিখ্যাত মালতি, প্রায় শতাব্দীর কেয়া ও শতাব্দীর অন্য একটি লতা সাফা হয়ে গেছে। এই নিয়ে লেখালেখি হতে রমনা পার্ক কর্তৃপক্ষ বিখ্যাত অশ্বত্থমূলের সামনের বটগাছে তড়িঘড়ি অনেক কটি মালতিলতা রুয়ে দিয়ে পাশে বাঁশ পুঁতে দিয়েছিল লতা বেয়ে ওঠার জন্য, যেন রোয়ার সঙ্গে সঙ্গে মালতি-মাধবী তরতর করে বেড়ে ওঠে। ধিক, ধিক।

মালতি খুব সুশ্রী, কোমলতা তার সারা অঙ্গে, হাওয়ার দোলায় লাবণ্য ঝরে ঝরে ওড়ে। পুষ্পদণ্ডের আগায় ফুল আসে। ফুল বিস্তৃত, গোলাকার, দুগ্ধ-ফেননিভ শুভ্র। পাপড়ি পাঁচটি। স্ত্রী পুষ্পদণ্ড নত, গর্ভকেশর রোমে আবৃত। লতা থেকে প্রচুর শাখা-প্রশাখা বের হয়। কোমল ও রোমযুক্ত সেই শাখা। পাতা তিন-চার ইঞ্চি লম্বা, দু-আড়াই ইঞ্চি চওড়া। ডালের দুই দিকে সমান বিপরীত সজ্জায় থাকে। পাতার কোল থেকে নতুন ডগা হয়। ডিম্বাকৃতি পাতা, তেজপাতার মতো অনেকখানি। বৃন্ত গোলাকার। সৌন্দর্যে সারা অঙ্গ ভরপুর।

ফুল ফোটে চৈত্র-বোশেখ থেকে শরৎকাল পর্যন্ত। মিষ্টি সুগন্ধে ভরপুর। ভ্রমর ও মধুলোভী কীটপতঙ্গ এ সময় পর্যবেক্ষণ করা সহজ। বীজ লম্বায় আধা ইঞ্চি। শীতের শেষে পাকে। ভাদ্র-আশ্বিনের আদরণীয় বৃষ্টিতে মালতির পাতার ঘন লাল শিরা প্রকট হয়ে ওঠে।

শৌখিন মালিকের বাগানে মালতি, মাধবী, মধুমালতি, নীলমণিলতা, জুঁই, বেলির কুঞ্জ থাকে। রবীন্দ্রনাথের ঋতুবিষয়ক গানে পাই, ‘ওই মালতিলতা দোলে/পিয়াল তরুর কোলে’ বাণী। আরো উতলা করে দিয়েছেন গেয়ে, ‘না বলা বাণী রয়েছে যেন অধর ভরে/না হয় যেয়ো গুঞ্জরিয়া বীণার তারে/মনের কথা শয়নদ্বারে।/না হয় রেখো মালতীকলি শিথিল কেশে/নীরবে এসে,/না হয় রেখে যেও ফুলের ডোরে’

আর আমার রোয়া মালতি, জুঁই, করমচা হু হু বেড়ে দোতলা গ্রাস করে নিচ্ছে। সেখানে বুলবুলি ও টুনটুনির গান শুনে আমি অমরাবতীর কল্পনায় অবগাহন করছি। বলধার লতাটিতে প্রচুর ফুল ফুটবেই। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির লতা দুটির সঙ্গে কত বছর একান্তে কথা বলা হয় না! তরুপল্লব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কত জায়গায় মালতি-মাধবী রুয়ে চলেছি! প্রথম বসন্তে ফোটা মালতি আর ভাদ্র-আশ্বিনের আদুরে বৃষ্টিতে সিক্ত মালতির রূপ-লাবণ্য লেখার নয়, বলার নয়, তার আদরণীয় শরীরেই আসল পরিচয় ফুটে ওঠে। 



মন্তব্য