kalerkantho


ফোকাস

আয় করো হাতখরচ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৩:০১



আয় করো হাতখরচ

পড়ার ফাঁকে কত কিছুই তো করতে মন চায়। শখের কাজটা থেকে যদি হাতখরচাটা উঠে আসে, তবে মন্দ কী! ঝটপট চোখ বুলিয়ে নাও জুবায়ের ইবনে কামালের এ প্রতিবেদনে

আলিফ আল সিয়াম পড়ছে তেজগাঁও কলেজে একাদশ শ্রেণিতে। বন্ধুরা তাকে মজা করে ডাকে ‘বড়লোক’। কারণ নিজের হাতখরচের টাকা নিজেই আয় করে সিয়াম। এ বয়সেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘুরে টুকটাক ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই আয় করছে ও। ‘আন্তর্জাতিক কিছু ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইট আছে, যেগুলো তাদের নানা ধরনের কাজ কাউকে করে দেওয়ার জন্য পোস্ট করে। তুমি যে যে কাজে দক্ষ, সেগুলো করে খুব সহজেই মোটামুটি ভালো অঙ্কের টাকা কামিয়ে নিতে পারো।’ জানাল সিয়াম।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে কী কী করা যায়?
ভিডিও এডিটিং ও ডিজাইনিং : কোনো সংস্থার কোনো ভিডিও ডকুমেন্টারি বা ব্যানার ডিজাইন প্রয়োজন। সিয়ামের আয়ের চাহিদাটা এখন কম। তাই পেশাদারদের তুলনায় অল্প পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজগুলো লুফে নিতে সমস্যা হয় না।

অনুবাদ : আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকা বা সংস্থার প্রতিবেদন ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিয়েও টুকটাক আয় করে সিয়াম। এ কাজ অনিয়মিত হলেও এতে এক কাজে দুই কাজ হচ্ছে। আয় তো হচ্ছেই, পাশাপাশি দখল বাড়ছে ভাষার ওপরও।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট : তোমাদের অনেকেই স্কুলে কোনো অনুষ্ঠান হলে সেটি আয়োজন করতে ঝাঁপিয়ে পড়ো। কেউ বা আবার বড় ভাই-বোনদের বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করায় সিদ্ধহস্ত। এটাই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট। নানা ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিজ্ঞতা বা জানাশোনা থাকলে বন্ধুরা মিলে মাসে এমন দু-একটা আয়োজন করেও পকেট খরচের টাকা ওঠানো সম্ভব। বিশেষ করে পরিচিত মহলে যদি তোমার অনুষ্ঠান আয়োজনের দক্ষতার সুনাম ছড়িয়ে যায়, তবে ক্লায়েন্ট পেতে মোটেও বেগ পেতে হবে না।

আরো যারা আয় করছে
সিয়ামের মতো সিলেট এমসি কলেজের ফারহানাও কম যায় না। সে তো শুধু ফেসবুক চালিয়েই চার অঙ্কের টাকা আয় করছে নিয়মিত। শুধু চ্যাট আর স্ক্রলিং করে সময় নষ্ট করে না ও। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের ক্রাফট তৈরির শখ ফারহানার। একদিন কী ভেবে একটা ক্রাফটের ছবি ফেসবুকে আপলোড দিতেই অনেকে তা কিনতে আগ্রহ দেখায়। বুদ্ধি করে ফেসবুকে একটা পেজ খুলে ফেলে ফারহানা। এর পর থেকে নিয়মিতই নিজের হাতে বানানো ফোনের কাভার, রংবেরঙের ফুলদানি, ওয়ালম্যাটসহ বিভিন্ন জিনিস বানিয়ে বিক্রি করছে ফারহানা। কুরিয়ারে সারা দেশেই যাচ্ছে তার তৈরি জিনিসপত্র। তার কাজগুলো দেখতে আগ্রহীরা ঢু মারতে পারো ‘ফাহাজ পেপার ফ্রগ’ নামের ফেসবুক পেজে।

এভাবে কিন্তু অনেকেই নিজের হাতখরচ ও পড়ার খরচ আয় করছে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোনোর আগেই। সফল ব্যক্তিত্বরাও কিন্তু একেবারে পড়াশোনা করা অবস্থায়ই টুকটাক কাজ করে আয় করতেন। শিক্ষাবিদ ও তোমাদের প্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালও ছাত্র থাকা অবস্থায় বিভিন্ন পত্রিকায় কার্টুন আঁকতেন। এ সময়ের বিখ্যাত কার্টুনিস্ট মেহেদী হক ক্লাস নাইনে থাকতেই ‘উন্মাদ’ পত্রিকায় আঁকাআঁকি শুরু করেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে একা একা চা খাওয়ার সময় তিনি ধরা খান দলছুটের কাছে। বলেন, ‘শুধু আয় না, যেকোনো কাজে সফলতা পাওয়ার জন্যই দলছুট হওয়ার বিকল্প নেই। তুমি যদি ভাবো সবাই ঘুরতে যাচ্ছে, আমারও ঘুরতে যেতে হবে, তাহলে ভুল হবে। কাজে সফল হওয়ার জন্য দলের বাইরে যেতে হবে। তুমি আঁকতে চাও, সুতরাং তোমার আশপাশের মানুষ কী বলছে বা কী করছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।’ কিভাবে কার্টুন এঁকে আয় করা সম্ভব, তা নিয়ে মেহেদী হক বলেন, ‘বিভিন্ন পত্রিকায়ই প্রদায়ক হিসেবে আঁকা যায়। আমি নিজেই এখন একটি বেসরকারি পত্রিকায় কাজ করি। তা ছাড়া দেশের বাইরের বিভিন্ন ওয়েবসাইটেও কার্টুন আঁকার কাজ পাওয়া যায়। এর জন্য ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওয়েবসাইটগুলোতে রেজিস্ট্রেশন করা থাকলেই হলো।’

তার কথার সত্যতা মিলল ঢাকা সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আনিসুল ইসলাম সামিরকে দেখে। সামিরের একটা গ্রাফিকস ট্যাবের শখ থাকলেও কখনোই কেনা হয়ে ওঠেনি। বাসায় জানাতে উত্তর পেল, ‘নিজে টাকা কামিয়ে কিনে নাও।’ বড়দের কথা কি আর ফেলতে পারে সামির! গত বইমেলায় বেশ কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ ও ভেতরের ইলাস্ট্রেশনের কাজ করে টাকা জমিয়েছে ঠিকই। আর তা দিয়ে কিনেই ফেলল একটা গ্রাফিকস ট্যাব। এখন ওই ট্যাবলেটেই কার্টুন এঁকে নিয়মিত অনলাইন পত্রিকায় পাঠাচ্ছে সামির। সেগুলোর জন্য আবার ৩০০-৫০০ টাকা করে বিলও পাচ্ছে। যেহেতু এটা চাকরি নয়, তাই পড়াশোনার কোনো সমস্যাই হচ্ছে না। যখন ফ্রি থাকে, তখনই আঁকে ও।

মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের রাফাও নকশা করে। তবে সে একেবারে অ্যানালগ। তার নকশায় রং নয়, লাগে মেহেদী। বিশেষ করে পরিচিত ও আত্মীয়রা কোনো উপলক্ষ থাকলেই রাফার দরবারে লাইন দেয়। মেহেদী দেওয়া শেষে রাফার হাতে গুঁজে দেয় ‘সেলামি’। তবে রাফা ভাবছে এটা আরেকটু পেশাদারির সঙ্গে করা যায় কি না। এর জন্য একটা নামও ভেবে রেখেছে-‘রাফার মেহেদী কর্নার’।

বীজগণিতের জটিল সব সমস্যার সমাধান করতে করতে খাতার কোনায় আজগুবি সব আঁকিবুঁকি করে থাকো। এসব আঁকিবুঁকিকে বলা হয় ‘ডুডল’। ওই ডুডলও কিন্তু বিক্রি হয়! আর তাতেই দেদার পকেট মানি কামিয়ে যাচ্ছে দলছুট-এর বন্ধু মুসাররাত আবির জাহিন। সে পড়ছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণিতে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কারো জন্ম দিনের উপহারের জন্য ডুডল আর্ট করে জাহিন। মাঝেমধ্যে নকশাগুলো ফ্রেমে বাঁধাই করেও পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্রাহকের কাছে। বন্ধুদের জন্ম দিনে গিফট দেওয়ার জন্যও জাহিনের কাছে ডুডল নিতে আসে অনেকে। ডুডলপ্রতি তার আয় ২০০-৫০০ টাকা। জাহিনের ডুডলগুলো দেখতে ইংরেজিতে ‘জাহিংক’ লিখে সার্চ করো ফেসবুকে।

গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী মাঝে মাঝে ডুডলগুলো ফ্রেমেও বাঁধাই করে দেয় জাহিন। তেমনি মোবাইলের কাভারে এমন মজার একেকটি নকশার জন্য ৩০০-৫০০ টাকা করে আয় করছে ফারহানা। 



মন্তব্য