kalerkantho


‘চুরি বিদ্যা’ এবং কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স জগতের গোপনীয় কিছু কেলেংকারি

আহ্‌সান কবীর   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৪:৫৮



‘চুরি বিদ্যা’ এবং কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স জগতের গোপনীয় কিছু কেলেংকারি

আল মাবহোউ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইসরায়েলি চলচ্চিত্র কিদন-এর দৃশ্য। মোসাদ এজেন্টের চরিত্রে ইসরায়েলি মডেল রাফায়েলি ও অপর অভিনেতা তমের সিসলি

সন্দেহভাজন অপরাধী বা জনগণের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তিদের ফোনে আড়িপাতার ব্যাপারে আইনে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ যাই থাকুক না কেন, বিষয়টি মোটামুটি সবার কাছেই বিশেষ বিবেচনায় বৈধতার সিল পেয়ে যায়। কিন্তু নির্বিচারে প্রতিপক্ষ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় গোপনে শোনা বা রেকর্ড করার বিষয়টি আপনি যতই উদার হন না কেন, মেনে নিতে পারবেন না। 

কথায় বলে চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড়ে ধরা! অন্যের কথাবার্তা লুকিয়ে শোনা বা রেকর্ড করাও সেই চুরির আওতার বাইরে নয়। দুনিয়ার আর সবার মতো মার্কিনিরাও বিশেষ করে দোর্দ- প্রতাপশালী সেই দেশের কর্তারাও তা ভালোমতোই জানেন। 

আর তাই বুশের আমলে এনএসএ কর্তৃক নিজ দেশের নাগরিকদের ফোন ট্যাপিং সমালোচনার মুখেও বৈধতা পেয়ে যায়। একপর্যায়ে সেই ‘বৈধতা’ দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশি ব্রাজিল, এমনকি আটলান্টিক মহাসাগরের এপারে-ওপারে অন্যান্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর হর্তাকর্তাদের ফোন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। 

তবে মাঝেমধ্যে অন্যদের মতো মার্কিনীরাও সেই পুরনো বাংলা প্রবাদের ফাঁদে পড়ে যায়- অর্থাৎ চুরি করে ধরা পড়ে যায়। বছর পাঁচেক আগে জার্মানির পত্রিকায় খবর বের হল, দীর্ঘদিনের ‘বন্ধু’ জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর নজরদারি চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন খোদ বারাক ওবামা। জার্মান সংবাদপত্রটি আরও দাবি করেছিল, শুধু জার্মানি নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৮০টি ‘আড়িপাতাকেন্দ্র’ চালায় মার্কিন জাতীয় গুপ্তচর সংস্থা এনএসএ। এর সঙ্গে আধুনিকতম অনুষঙ্গ হিসেবে যোগ হয়েছে ডিজিটাল মিডিয়া আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আড়িপাতাও।

অবশ্য জেনেভা কনভেনশনে নিষিদ্ধ করা হলেও আড়িপাতার (অয়্যার ট্যাপিং) বা লুকানো মাইক্রোফোনের মাধ্যমে কারও কথা রেকর্ডের নিষিদ্ধ গন্ধম ভক্ষণ করে না- দুনিয়ায় এমন দেশ বা সরকারের খোঁজ পাওয়া দুষ্কর। 

তবে এসব কাজে রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্সকে ছাড়িয়ে সব সময়েই সামনের ধাপে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল- এক্ষেত্রে সবার-ই টার্গেট নিজ দেশের জনগণ থেকে অন্য দেশের জনগণ বা নেতা- কেউ বাদ যায় না। আপাত নির্বিরোধী দেশ নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধেও অনেকগুলো দেশে আড়িপাতার অভিযোগ উঠেছিল। চীন-রাশিয়া-ভারতও এই কাজে মানে পরের হাড়ির খবর চুরিতে পিছিয়ে নেই। প্রসঙ্গত, মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে ক্লিনটনের ফোনসেক্সে আড়ি পেতেছিল মার্কিনিদেরই ‘জিগরি দোস্ত রাষ্ট্র’ ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। 

পুরনো কিস্সা
গোপনে প্রতিপক্ষ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর কথাবার্তা রেকর্ড করানোর দায়ে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের ১৭ জুন রাজধানী ওয়াশিংটনে ওয়াটারগেট হোটেল কমপ্লেক্সে প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাট দলের মিটিংয়ের কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করে মহা গ্যাঁড়াকলে পড়ে গিয়েছিল রিপাবলিকানরা।

মূল ঘটনা গুপ্তচরবৃত্তি
তবে হালের আড়িপাতা ঘটনার মূল সূত্র হচ্ছে আন্তঃদেশীয় বা আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তি। গুপ্তচরবৃত্তি বা মাসুদরানাগিরির ইতিহাস মানুষের ইতিহাসের মতোই পুরনো। বিষয়টি সবাই জানেন, সবাই বোঝেন। এক সময়ে মার্কিন-রুশ কেন্দ্রিক ¯œায়ুযুদ্ধের সময়ে পরষ্পরের গোপন তথ্য সংগ্রহে সিআইএ-কেজিবি ঈঁদুর দৌর আর এ নিয়ে নানান কা--কীর্তি কারও অজানা নয়। চরম সাবধানতার পরেও ইন্টেলিজেন্স আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স জগতের এসব অতি গোপনীয় ঘটনা অনেক সময়েই প্রকাশ্যে চলে আসে- ঘটে যায় কেলেঙ্কারি। কালের কণ্ঠের প্রিয় পাঠক, আসুন- এ ধরনের দুটি গোয়েন্দা-কেলেঙ্কারির ঘটনা নতুন করে জেনে নেই যা দুনিয়াজুড়ে তোলপাড় ঘটিয়েছিল-

গ্রিক ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি
২০০৪-০৫ সালে আলোড়ন তোলা গ্রিক অয়্যারট্যাপিং কেস ‘গ্রিক ওয়াটারগেট’ নামেও পরিচিত। ওই ঘটনায় মোবাইল কোম্পানি ভোডাফোন নেটওয়ার্কের শতাধিক নাম্বারে আড়ি পাতা হয়। ওই নাম্বারগুলির ব্যবহারকারীরা ছিলেন গ্রিসের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কোস্টাস কারমানলিস ও তার পরিবারবর্গ, এথেন্সের মেয়র ডোরা বাকোয়ানিস, শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তা। 

এছাড়াও আড়ি পাতা হয় দেশটির প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং এথেন্সভিত্তিক আরব ব্যবসায়ীদের ফোনে। জানা গেছে ২০০৪ সালের আগস্ট থেকে শুরু হয় এই আড়িপাতা, চলে পরের বছরের মার্চ পর্যন্ত। তবে রহস্যজনক কারণে অপরাধী পক্ষকে সনাক্তকরণের চেষ্টা ছিল না। 

এ বিষয়ে জনগণকে শুধু জানানো হয় ২০০৫ সালের মার্চে ওই আড়িপাতা বন্ধ করা হয়েছে। তবে গ্রিক ও বিদেশি মিডিয়া এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে সিআইএ-কেই চিহ্নিত করেছে। এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৪ সালের এথেন্স অলিম্পিকের সময়ে এর সূত্রপাত হয়। 

এ বিষয়ে গ্রিসের তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা জর্জ পাপান্দ্রুর মতে, টেলিফোনে আড়িপাতা কা-ের জন্য গ্রিক সরকার যুক্তরাষ্ট্রকেই ইঙ্গিত করেছে। তবে ওই সময়ে ভোডাফোন ও গ্রিক কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক দায়সারা তদন্তের কারণে আসল ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ হয়নি।

ইসরায়েলি গুপ্তচর বেন জায়গিয়েরের মৃত্যু 
ইসরায়েলি কারাগারেই বন্দি মোসাদ এজেন্ট ও অস্ট্রেলিয়া-ইসরাইলের  দ্বৈত নাগরিক বেন জায়গিয়েরের রহস্যজনক মৃত্যু ভিন্ন রাষ্ট্রে গুপ্তচরগিরি সংশ্লিষ্ট এক আলোচিত ঘটনা। তার অস্ট্রেলীয় পাসপোর্টে নাম ছিল বেন আলেন আর ইসরায়েলি কারাগারে তার পরিচয় ছিল মিস্টার এক্স (অজ্ঞাত পরিচয়) হিসেবে।

নিহত সন্তানের ছবি হাতে আল মাবহোউয়ের  শোকার্ত পিতা            ফাইল ফটো

সিডনি মর্নিং হেরাল্ড জানায়, ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে মেলবোর্নে জন্ম নেওয়া বেন জায়গিয়ের মোসাদ স্পাই হিসেবে অস্ট্রেলিয় পাসপোর্টে আসা যাওয়া করেছেন ইরান, সিরিয়া ও লেবানন। এ কারণে তাকে অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও পড়তে হয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করে থাকে নির্জন কারাবাসে বন্দি জায়গিয়ের আত্মহত্যা করেছেন। তবে বিশ্ব মিডিয়া বিশেষ করে অস্ট্রেলিান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (এবিসি) সহ কয়েকটি সংবাদ সংস্থার বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনেকটাই পরিষ্কার করে দিয়েছে- কোনও গোপন রহস্যজনক কারণে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ হত্যা করেছে তাকে। 

বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত ইঙ্গিতে বোঝা যায়, এই কারণটা জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট গুরুতর কোনও অপরাধ (বিশ্বাসঘাতকতা) যা ইসরাইল কখনো প্রকাশ করেনি। ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর রামাল্লার আয়ালান জেলখানায় তার মৃত্যু হয়। পরে জন্মস্থান অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে তাকে দাফন করা হয়। 

প্রসঙ্গত, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্বলিত ওই জেলখানাটি কয়েদিদের আত্মহত্যা প্রতিরোধী বিশেষ ব্যবস্থা সম্বলিত। ২০১৩ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে এ সংক্রান্ত এবিসি প্রতিবেদনের আগ পর্যন্ত মোসাদ ও ইসরায়েল বিষয়টি রীতিমতো ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল। অবশ্য ২০১০ সালেই এ সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল ইসরায়েলি ওয়েবসাইট ওয়াইনেট। যদিও সরকারি তৎপরতায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংবাদটি অপসারণ করা হয়। 

ইসরায়েলের আয়ালান কারাগারের অতি সুরক্ষিত ইউনিট-১৫ ব্লক। এখানেই বন্দি ছিলেন জায়গিয়ের   -ফাইল ফটো

জার্মান সাময়িকী ডের স্পাইগেল ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ এক প্রতিবেদনে জানায়, জায়গিয়ের ফিলিস্তিনি গেরিলা গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর একজন কর্মকর্তার কাছে লেবাননে ইসরায়েলের পক্ষে দায়িত্বরত দুজন অতি গুরুত্বপূর্ণ গুপ্তচরের পরিচয় ফাঁস করে দেন। অতি গোপন এই তথ্য  বৈরুতে হিজবুল্লাহ সদর দপ্তরে পৌঁছানো মাত্র সিয়াদ আল হোমসি এবং মুস্তাফা আলী আওয়াদেহ নামের ওই দুই লেবানিজ গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ মেয়াদের কারাভোগ করেন। 

এরই সূত্র ধরে ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে লেবাননের অনেক নাগরিক গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। এ ঘটনা তখন আরব অঞ্চলসহ বিশ্বজুড়ে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। বিষয়টি ইসরায়েলের জন্য বেশ ক্ষতি ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।  ডের স্পাইগেলের মতে, হেজবুল্লাহ এজেন্টকে গোপন তথ্য দেওয়ার বিনিময়ে জায়গিয়ের চেয়েছিলেন তাকে ডাবল এজেন্ট বানাতে। যাতে করে সেও জায়গিয়েরকে ফিলিস্তিনি গেরিলাদের অতিগুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য জানিয়ে দেবে। এর ফলে মোসাদে নিজের হারানো পদ ও মর্যাদা ফিরে পেতে পারেন তিনি। 

ডের স্পাইগেলের সঙ্গে যৌথভাবে জারগিয়েরের রহস্যজনক মৃত্যু বিষয়ে অনুসন্ধানকারী অস্ট্রেলীয় সংবাদ সংস্থা ফেয়ার ফ্যাক্স এর মতে- চমক লাগানো কাজ দেখিয়ে মোসাদকে খুশী করে স্বমর্যাদা ফিরে পেতে জায়গিয়ের হেজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক করেছিলেন যা ছিল চরম নির্বুদ্ধিতার কাজ।

একই প্রসঙ্গে কুয়েতি সংবাদপত্র আল জারিদা পশ্চিমা সূত্রের বরাতে জানায়, জায়গিয়ের অভিযুক্ত হন ফিলিস্তিনি গেরিলা গ্রুপ হামাসের সামরিক শাখার শীর্ষ নেতা মাহমুদ আল মাবহোউ-এর হত্যাকারী মোসাদ এজেন্টদের নাম অর্থের বিনিময়ে দুবাইর শাসকদের কাছে প্রকাশ চেষ্টার কারণে। এর বিনিময়ে দুবাই সরকার তার নিরাপত্তা বিধানেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ঘটনা আগেই জেনে যায় মোসাদ এবং তারা তাকে অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে যায় বিচারের জন্য। 

দুবাই পুলিশ প্রকাশিত মোসাদ এজেন্টদের ছবি যারা মাবহোউ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়   -ফাইল ফটো

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি দুবাইর একটি হোটেল কক্ষে আল মাবহোউকে হত্যা করে মোসাদ এজেন্টরা। একাজে অংশ নেয় ৩৩ জনের একটি দল যাদের প্রায় সবারই পরিচয় লুকোতে অস্ট্রেলীয়, জার্মান, আইরিশ, ফরাসি ও বৃটিশ পাসপোর্ট জাল করা হয়। এটা ছিল গুপ্তচরবাজির  এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উল্লেখিত দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। আর ইসরায়েলে নির্মিত কিদন নামের মুভিতে মাবহোউর চরিত্রকে কলঙ্কিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। তারা কিদন নিষিদ্ধের দাবি করে।

(উইকিপিডিয়া, হোয়াটরিয়েলিহ্যাপেন্ড, মাদারঅবঅলস্ক্যান্ডাল অবলম্বনে)



মন্তব্য