kalerkantho


কর্মজীবী শিশুদের আলোকিত করছে ‘আমাদের পাঠাগার’

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৪:০৬



কর্মজীবী শিশুদের আলোকিত করছে ‘আমাদের পাঠাগার’

২০১৩ সালের ৩ মে কয়েকজন তরুণ মিলে টঙ্গীতে গড়ে তোলেন পাঠাগারটি। নাম ‘আমাদের পাঠাগার’। মাত্র ৬৯টি বই নিয়ে শুরু। এখন বইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজরেরও বেশি, সদস্য সংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক। গেল বছর ‘আমাদের পাঠাগার’ এর উদ্যোগে টঙ্গীর ৯টি স্কুলের ১৭৫ জন শিক্ষর্থীর মধ্যে শুরু হয়েছে আমাদের পাঠচক্র কার্যক্রম।

পাঠাগারের শুরুর দিককার গল্প বলতে গিয়ে এর উদ্যোক্তা তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা যুবরাজ শামীম বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১২’এর অক্টোবর পর্যন্ত আমি নিজ এলাকা অর্থাৎ টঙ্গীর বাইরে ছিলাম। সাড়ে তিন বছর পর যখন ফিরি আসি, তখন আমি ভীষণভাবে আহত হই বন্ধুদের দেখে। সবাই কেমন বদলে গেছে! কেউ ছিনতাই করছে, কেউবা চুরি করছে আর নেশা করা খুব সাধারণ বিষয়।

কেন এমন হলো ভাবতে ভাবতেই যুবরাজের মনে হলো বইয়ের কথা, বই পড়াটাই ওদের সাথে আমার পার্থক্য তৈরি করেছে। এই ভাবনাটাই আমার ভেতরে দারুণ প্রভাববিস্তার করে। পাঠাগারের প্রয়োজন অনুভব করি। স্পষ্ট মনে আছে আমার পকেটে তখন পাঁচ টাকা ছিল। আর ঘরে ছিল নিজের ৬৯টি বই। কিন্তু ভেতরে ছিল অদম্য ইচ্ছে শক্তি। তাই সেদিন ৬৯টি বই দিয়ে রাস্তার পাশেই আমাদের পাঠাগার করা সম্ভব হয়েছিল।
 
পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পরে যুবরাজ এবং তার বন্ধুরা ২০১৪ সালের ১ জুন প্রতিষ্ঠা করেন আমাদের নৈশ বিদ্যালয় নামে কর্মজীবী শিশু কিশোদের জন্য রাত্রিকালীন একটি স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আসল যুদ্ধটা শুরু হয় তখনই। স্থানীয় অনেকেই রাতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেনে নিতে পারেনি। কেননা রাতে ছেলে মেয়েদের একত্রিত হওয়া কিংবা শিক্ষার বাহিরে বিভিন্নরকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। যুবরাজ বলছিলেন, তাদের ধারণা মেয়েরেকে দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার বৈদেশিক ফান্ড আত্মসাৎ করছি আমরা। তারা বিভিন্নরকম সমালোচনা শুরু করেন, আবার কেউ স্বশরীরে বাধা দেন। বহু মানুষ আমাদের পাশেও দাঁড়ায়। 

বিস্তারিত উদাহরণ দিয়ে তিনি আরো বলেন, স্থানীয় একটি স্কুলের অনুমতি নিয়ে সেখানে আমরা নৈশ বিদ্যালয় চালচ্ছিলাম। তখন অনেক কর্মজীবী মেয়েরাও স্কুলে আসতে শুরু করলো। তখন আমাদের প্রতি বিভিন্ন মানুষের মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা যেমন বাড়তে লাগলো, তেমনি স্থানীয় বেশ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিরা আমাদের বিরোধীতা শুরু করলেন। নানা সমালোচনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের নৈশ স্কুলটি বন্ধ করে দেয়। দিনটা ছিল ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। সেই দিনটার কথা এখনো মনে পড়ে। কষ্ট হয়, ভীষণ কষ্ট! সেদিন খুব অপমানিত হয়েছিলাম।

এরপর ঘুরে দাঁড়ানো সহজ নয়, কিন্তু সেটাই করে দেখিয়েছেন যুবরাজ ও তার দল। সাহায্যে এগিয়ে এলেন পাগাড় মুহাম্মদ আলী পাঠান স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা রহিম পাঠান। তার স্কুলেই নৈশ বিদ্যালয় শুরু করার প্রস্তাব দেন। সেই থেকে এখানেই চলছে স্কুলের কার্যক্রম। যা যুবরাজের মনে অনেকটা স্বস্তি এনে দিয়েছে, শ্রমজীবী শিশু-কিশোরদের নিয়ে যে স্বপ্নটা প্রথম আমি দেখেছিলাম। কিন্তু স্বপ্নটা এখন আর আমার একার নয়। অনেকেই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মানসিক এবং অর্থনৈতিক সমর্থন জোগাচ্ছেন। এখন আর পাঠাগারের ভাড়া আমার একার বহন করতে হয় না। অনেকেই প্রতি মাসে নিয়মিত চাঁদা দিচ্ছেন তাদের সাধ্যমত। আবার কিছু মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাঠাগারের জন্য কম্পিউটার, প্রিন্টার, বুক সেল্ফ এসব কিনে দিয়েছেন।

শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরেও আমাদের পাঠাগার এবং আমাদের নৈশ বিদ্যালয় বিভিন্ন রকম সামাজিক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তার মধ্যে রক্তদান কর্মসূচী অন্যতম। এ পর্যন্ত কয়েক শতাধিক মানুষকে আমাদের পাঠাগারর পক্ষ থেকে রক্তদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নৈশ বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা দেড়শো ছাড়িয়েছে। 



মন্তব্য