kalerkantho


ছুটির সর্বোৎকৃষ্ট সুখ অস্ট্রিয়ায় নিকৃষ্ট নিয়ম মার্কিন মুল্লুকে

মাতৃত্বকালীন ছুটিতেও নিকৃষ্ট যুক্তরাষ্ট্র!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২১:১৫



ছুটির সর্বোৎকৃষ্ট সুখ অস্ট্রিয়ায় নিকৃষ্ট নিয়ম মার্কিন মুল্লুকে

প্রতীকি চিত্র

কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল/ কোন দেশেতে চলতে গেলে দলতে হয়রে দুর্বা কমল? কবির এই ধাঁধাঁর উত্তর কবি নিজেই দিয়েছেন এবং অবধারিতভাবে সেটি হচ্ছে আমাদের এই বাংলাদেশ! 

তবে দেশপ্রেমের এই চিরন্তন আবেগ এড়িয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়- দুনিয়ার কোন দেশে বা শহরে চাকরিজীবীরা সবচেয়ে সুখী? আর এমন দেশ বা শহর কি আছে যেখানকার কর্মীরা তাদের কাজে সবচেয়ে অনাগ্রহী? কোথায় চাকরির ক্ষেত্রে ছুটিছাটার নিয়ম-কানুন পুরোপুরি মানা হয় আর কোথায় এমন হয় যে কর্মচারীদের বড় একটি অংশই ছুটিকালীন বেতন পান না! 

চাকরি খোঁজার ওয়েবসাইট মন্সটার ডটকম এবং সেন্টার ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জরিপ চালিয়ে এ সংক্রান্ত যেসব তথ্য পেয়েছে তা জেনে আপনার ভ্রু কুঁচকে উঠতে পারে।

ছুটিপ্রিয় চাকরিজীবীদের পছন্দের শীর্ষে কানাডা 
ওই জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ কানাডীয় তাদের কাজ বা চাকরিকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এক চতুর্থাংশ কানাডীয় জানান, তারা তাদের চাকরিকে এতটাই পছন্দ করেন যে বিনা বেতনেও এই কাজ করতে চান। এখানে মাত্র ৭ ভাগ মানুষ তাদের কাজকে বা কর্মস্থলকে ঘৃণা করে। 

তবে, প্রিয়পাঠক, এতদূর পড়ে আপনার হয়তো আনন্দই লাগছে আর ভাবছেন, আহ্, এমন চাকরির পরিবেশ যদি আমরা পেতাম। কিন্তু জেনে আশ্চর্য হবেন, এই কানাডায়ই কর্মচারীদের বেতনসহ ছুটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্পণ্য করা হয়। 

দেখা গেছে, কর্মীদের সবেতন ছুটি না দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের ২১টি শীর্ষ ধনী দেশের মধ্যে কানাডার অবস্থান তৃতীয়। এই দেশটিতে বছরে মাত্র ১০দিন বেতনসহ ছুটির সুযোগ রয়েছে কর্মীদের। যাহোক, সুবিধা-অসুবিধার যোগ-বিয়োগে আপনি হয়তো ভাবছেন, তারপরও কানাডা চাকরির জন্য ভালো। কিন্তু এই চাকরিবান্ধব দেশটি নিয়ে জরিপে আরও মজার তথ্য আছে। তা হচ্ছে, জরিপে অংশ নেওয়াদের ৮৩ ভাগ আসন্ন নতুন বছরে নতুন চাকরির জন্য মরিয়া তৎপরতা চালাবেন বলে জানিয়েছেন। 

জার্মানদের সবচেয়ে অপছন্দ
মন্সটারের জরিপে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরাজিত নায়ক এডলফ হিটলার আর বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী এঙ্গেলা মের্কেলের দেশ জার্মানির মানুষ তাদের কাজকে খুব একটা পছন্দ করেন না। এতে দেখা যায়, মাত্র ৩৪ ভাগ জার্মান তাদের কাজকে পছন্দ করেন। তবে আমতা আমতা করে বলার মতো করে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৪ ভাগ জার্মান বলেছেন, হ্যাঁ, পছন্দ করি বইকি!

কাজ বা কর্মস্থল নিয়ে জার্মানদের এই দোনোমনো ভাবের কিছুটা ব্যাখ্যা হয়তো পাওয়া যেতে পারে তাদের নৈমিত্তিক কর্ম-অভ্যাসের আয়নায়। কাজের প্রতি নিষ্ঠার জন্য পরিচিত জার্মান কর্মীদের কর্ম-অভ্যাসের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে আছে সময়ানুবর্তীতা এবং কর্মনিষ্ঠা। তবে এর ফলশ্রুতিতে তারা যে সুবিধাটা আশা করে এবং তা ভোগ করেও অভ্যস্ত, তা হলো- স্বল্পদৈর্ঘ্যরে কর্মদিবস বা তুলনামূলক কম সময় কাজ করা। 

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, উদার গণতান্ত্রিক আর মানবাধিকারবোধে টনটনে জ্ঞান সর্বস্ব দেশ হলেও জার্মানির অনেক অফিস-কারখানায়ই কাজের সময়ে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে খোশগল্পে মগ্ন হয়ে রাজা-উজির মারার সুযোগ নেই, কারণ ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারটাই নিষিদ্ধ থাকে তখন। 

তবে এর সুফলটা যেমন বলা হয়েছে আগে, তা ঠিক ঠিক কড়ায় গণ্ডায় বুঝিযে দিতে হয় জার্মানদের- সেটা হচ্ছে, তাদের একেকটি কর্মসপ্তাহের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ মাত্র ৩৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ সপ্তাহে জার্মাানরা স্বাভাবিক হিসেবে ৩৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করে না। 

অস্ট্রিয়ায় সর্বোৎকৃষ্ট নিয়ম
সেন্টার ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ এর মতে, কর্মীদের ছুটি-ছাটা বিষয়ে জার্মানির প্রতিবেশি দেশ অস্ট্রিয়ায় রয়েছে দুনিয়ার সর্বোৎকৃষ্ট কয়েকটি কর্মীবান্ধব আইন। অস্ট্রীয় কর্মীরা এমনিতে সাধারণ নিয়মে বছরে ৩০ দিন ছুটি ভোগ করে থাকে। তবে নির্দিষ্ট বয়স গ্রুপের জন্য, আরও কিছু সুবিধা আছে। 

যেমন, তরুণ কর্মীদের ক্ষেত্রে, যদি তারা আবেদন করে, তবে জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তাদেরকে অবশ্যই ১২ দিনের একটি ছুটি দিতে বাধ্য থাকবে প্রতিষ্ঠান। আর বয়ষ্ক চাকুরেরা যারা কর্মস্থলে ২৫ বছর পার করেছেন, তারা মৌলিক প্রাপ্য ৩০ দিনের ছুটির সঙ্গে আরও ৬দিন ছুটি পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ বছরে ৩৬ দিনের ছুটি যার অর্থ প্রায় প্রতি ১০ দিনের বিপরীতে ১ দিনের ছুটি! 

এরপরও সন্তুষ্ট নন! ঠিক আছে, এবার যা বলছি তা শুনে নিশ্চয়ই বলেবেন- একেই বলে ‘সোনায় সোহাগা’! এতসব ছুটিছাটার সঙ্গে অস্ট্রিয়ানরা আরও ভোগ করে বছরে ১৩ দিনের সরকারি সার্বজনীন ছুটি। আর এই ১৩টি ছুটির দিনে যদি কেউ কাজ করে, তাহলে নিয়োগকর্তা তাকে প্রতিদিন কাজের বিনিময়ে দ্বিগুণ বেতন দিতে বাধ্য থাকেন। এর বাইরে সাপ্তাহিক ছুটিগুলোর কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি! ছুটিছাটার এই হিসেব দেখে দুনিয়ার আর সব জাতি অস্ট্রিয়ানদের হিংসে করতেই পারে, কী বলেন?

জঘন্যতম নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রে!
মুক্তবিশ্ব বা অনেকের মতে ‘সব পেয়েছির দেশ’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চাকরিজীবীদের জন্য ছুটি আইন উন্নত ধনী দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে জঘন্য- একথা আপনি নির্দ্ধিধায় বলতে পারেন। সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ জানাচ্ছে, কর্মচারীদের সবেতন ছুটির ক্ষেত্রে অন্য ধনী দেশগুলোর চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক পেছনে। 

এর বাইরে অনেকের জন্য চোখ কপালে তোলা খবর হতে পারে এটা- যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার একমাত্র দেশ যে জাতীয় ছুটি বা কর্মীদের ব্যক্তিগত ছুটির দিনগুলোর জন্য মজুরী নিশ্চিত করণে ব্যর্থ হয়েছে।

মার্কিন কর্মীদের এক চতুর্থাংশই বঞ্চিত থাকে সবেতন ছুটি পাওয়া থেকে। ফলে কম বেতনের, পার্ট টাইম বা ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য সেদেশে অতিরিক্ত কাজের বোঝাটা অসহনীয়ই বলা যায়। 

সুইডেন : মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটির স্বর্গ 
কাজের ব্যস্ততার সমান্তরালে নবজাতকের উপযুক্ত দেখাশোনা কে করবে- এই চিন্তায় দুনিয়ার অন্যত্র মা-বাবার রাতের ঘুম হারাম হতে পারে কিন্তু একজন সুইডিশ অন্তত এই দুশ্চিন্তা থেকে পুরোটাই মুক্ত থাকেন। মাতৃত্ব বা পিতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে দুনিয়ায় সবচেয়ে সন্তোষজনক কিছু আইন নিয়ে গর্ব করতেই পারে সুইডেন। 

সুইডেনে দুগ্ধপোষ্য শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় বাবাদেরও

এইদেশটিতে প্রতিটি নবজাতকের জন্য বাবা-মারা সর্বমোট ৪৮০ দিনের ছুটি ভোগ করে থাকেন। এই বিশাল ছুটিকালীন সময়ে তারা বেতনের ৮০ ভাগ পেয়ে থাকেন সাধারণ হিসেবে যা সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। 

সুইডেনে নবজাতকদের প্রতিপালনের নিমিত্তে করা জগৎসেরা আইনের আরেকটি দিক হচ্ছে- শুধু মা নয়, বাবাদেরও গুরুত্ব দেওয়া। উন্নয়ন সূত্রে ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ এই দেশটিতে নবজতকদের বাবারা ২ মাসের বাধ্যতামূলক ছুটি পেয়ে থাকেন। 

এ বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবজাতকদের পিতাদেরকে এই ছুটি শুধু সংসারধর্মে সাম্যই প্রতীষ্ঠা করে না, পরষ্পরের কাজের অনুপাতের ভারসাম্যও রক্ষা করে। এ বিষয়ে জোহান্না নরেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, যদি বাচ্চাদের নিয়ে বাড়িতে শুধুমাত্র মায়েরাই থাকেন, তাহলে তো পুরুষদের তুলনায় নারীরা উল্লেখযোগ্যহারে প্রতিকূল অবস্থার মুখে পড়বেন। 

মাতৃত্বকালীন ছুটিতেও নিকৃষ্ট যুক্তরাষ্ট্র!
ছুটিনীতির দুর্বলতার কারণে নিন্দিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন পরিবার পত্তন করা দম্পতিদের উৎসাহদানের ক্ষেত্রেও উন্নত দেশগুলোর তালিকার লেজের দিকে আছে। নবজাতকদের মাতা-পিতাদের ছুটিদানের ক্ষেত্রে রীতিমত কঞ্জুসের পর্যায়ে আছে দেশটি। 

এ প্রসঙ্গে নিউইয়র্ক টাইমসের টারা সাইগেল বার্নার্ডের মূল্যায়ন হচ্ছে- মাতৃ-পিতৃকালীন ছুটি দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুনিয়ার দেশগুলোর তলানিতে আছে। সেখানে তাদের সঙ্গে আছে এমন গুটিকতক দেশ যেখানে সবেতন ছুটি এক্কেবারেই দেওয়া হয় না। এই স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী দেশগুলো হলো, লাইবেরিয়া, সুরিনাম ও পাপুয়া নিউগিনি।    

যুক্তরাষ্ট্রীয় আইনে নতুন মা-বাবাদের জন্য মোটের ওপর ১২ সপ্তাহের বিনাবেতনে ছুটি দিতে হলেও নিয়োগকর্তাকে হতে হয় যথেষ্ট হৃষ্টপুষ্ট (অর্থাৎ বৃহৎ প্রতিষ্ঠান)। অসংখ্য মানুষ আছে যারা যুক্তরাষ্ট্রে বিনা বেতনে ওই ১২টি সপ্তাহ চলার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস বা পাগলামী কোনওটাই করতে পারেন না। এছাড়া সেখানে নবযাতকের লালন-পালনের জন্য মোটা অঙ্ক হাতে রাখতে হয়। 

অপরদিকে, দেশটির ৪০ ভাগ কর্মীর উল্লেখিত ওই ১২ সপ্তাহ ছুটি লাভের যোগ্যতাও নেই, কারণ তাদের নিয়াগকর্তারা হচ্ছে খুবই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান। আইন অনুযায়ী ‘অতি ক্ষুদ্র’ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সেই ছুটিভোগের যোগ্যতা বা অধিকার নেই। সূত্র: নিউজওয়ান২৪, বিবিসি                                



মন্তব্য