kalerkantho


পৃথিবী হার মেনেছে যে ‘পুঁচকে গ্রহ’র কাছে!

জাহাঙ্গীর সুর   

১২ আগস্ট, ২০১৮ ২০:৪৫



পৃথিবী হার মেনেছে যে ‘পুঁচকে গ্রহ’র কাছে!

ছবি: পপুলার সায়েন্স

পৃথিবীর চেয়ে ৫১ গুণ ছোট। অথচ পৃথিবীকে হারিয়ে সৌরজগতের চার বড় গ্রহ বৃহস্পতি (পৃথিবীর ১৩১৬ গুণ), শনি (পৃথিবীর ৭৫৫ গুণ), ইউরেনাস (পৃথিবীর ৭৫৫) ও নেপচুনের (পৃথিবীর ৪৪ গুণ) সম-মর্যাদা অর্জন করেছে ‘পুঁচকে গ্রহ’ কারিকলো। সৌরজগতের বিশাল চার গ্রহের মতো বলয় আছে তারও। 
আবর্জনার আংটি
গ্রহাণু কারিকলোকে (Chariklo) ঘিরে রয়েছে দুটো বলয়। ব্রাজিলের দুটো নদীর নামে এদের নাম রাখা হয়েছে ওয়েপক ও চাই। বলয় দুটোর উৎপত্তি রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়নি এখনও, তবে ধারণা করা হচ্ছে, মহাশূন্যে ভেসে বেড়ানো আবর্জনাদের সংঘর্ষে এদের জন্ম।
 
সৌরজগতের সৌন্দর্য বলা হয় শনি গ্রহকে। বলয়গ্রহ নামেই যার পরিচিতি বেশি। শনির মতো বলয় আছে প্রতিবেশী গ্রহ ইউরেনাসেও। ‘প্রতিবেশী’ হলেও শনি আর ইউরেনাসের মাঝের দূরত্ব কিন্তু কম নয়। ১৪০ কোটি কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের সাড়ে নয়গুণ। এই বিশাল অঞ্চলে রয়েছে অগণিত সৌরজাগতিক বস্তু; এদের কোনোটা ধুমকেতু, কোনোটা গ্রহাণু। এরা সবাই সর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে। এরকমই একটা গ্রহাণু কারিকলো। ১৯৯৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মার্কিন জ্যোতির্বিদ জেমস ভারনন স্কটির টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। সূর্যকে পরিক্রমণ করার সময় সব গ্রহই স্বতন্ত্র কক্ষপথ ধরে ঘোরে। কিন্তু গ্রহাণু কারিকলোর বেলায় দেখা গেল, সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরার সময় সে ইউরেনাসের কক্ষপথকেও ছুঁয়ে যায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের বস্তুকে বলা হয় সেনটোর। গ্রিক পুরাণে পাওয়া অদ্ভুত জীব সেনটোরের নামে এই নাম। সেনটোরের অর্ধেক অংশ মানুষের, আর বাকি অর্ধেক ঘোড়ার। 
 
জ্যোতির্বিজ্ঞানে সেনটোর মানে ‘পুঁচকে গ্রহ’। যেমন কারিকলো। এর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্ব  (ব্যাস) মাত্র ২৫০ কিলোমিটার। পৃথিবীর বেলায় যা ১২৭৪২ কিলোমিটার। পৃথিবীর তুলনায় ৫১ গুণ ছোট এই পুঁচকে গ্রহই সৌরজাগতিক সেনটোরদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। (১৯৯৫ সালে এসএন৫৫ নামে একটি সেনটোর আবিষ্কৃত হয়েছিল যার ব্যাস ছিল ২৫৯ কিলোমিটার, কিন্তু তার কক্ষপথ এত বেশি অস্থায়ী যে মাস খানেকের ব্যবধানে তাকে আর দেখা যায়নি শক্তিশালী টেলিস্কোপেও)। 
 
আলোয় এলো কারিকলো
প্রায় দেড় যুগ আগে আবি®কৃত হলেও তেমন আলোচনায় আসেনি কারিকলো। কারণ তার সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা ছিল খুবই কম। অনেক দূরের বস্তু সম্পর্কে জানতে হলে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ-অপেক্ষার পরীক্ষা দিতে হয়। কারিকলোর বেলাতেও তাই। কারিকলোর গতিপথের অঙ্ক কষে বিজ্ঞানীরা দিনক্ষণ ঠিক করে রেখেছিলেন, ২০১৩ সালের ৩ জুন দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকে কারিকলোর দিকে তাক করা হবে টেলিস্কোপ। ওইদিন কারিকলোর পেছনে থাকবে দূরের এক নক্ষত্র (UCAC4 248-108672)। ওই নক্ষত্রের সামনে দিয়ে ধীর লয়ে হেঁটে যাওয়ার আলো-আঁধারির একটা খেলা দেখা যাবে। বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের ঘটনাকে গ্রহণ বলে। সৌরজগতে কোনো গ্রহ, উপগ্রহ কিংবা গ্রহাণু দ্বারা সূর্যের গ্রহণকে আমরা বলি সূর্যগ্রহণ (eclipse)। সূর্য ছাড়া অন্য নক্ষত্রের বেলায় এ ধরনের গ্রহণকে বলতে পারি সমাবরণ (occultation)।
কারিকলোর বলয় দ্বারা অপর নক্ষত্রের সমাবরণ
 
হিসেব মতো ২০১৩ সালের ৩ জুন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও চিলির সাতটি জায়গা থেকে কারিকলোর দিকে টেলিস্কোপ তাক করা হয়। উদ্দেশ্য সমাবরণ পর্যবেক্ষণ। ঠিক যে সময়ে দূর-নক্ষত্রটির আলো গ্রাস করার কথা, কারিকলো তাই করেছিল। কিন্তু দেখা গেল, নির্দিষ্ট সময়ের সমাবরণের কয়েক সেকেন্ড আগে এবং সমাবরণের কয়েক সেকেন্ড পরে আবারও নক্ষত্রটি কারিকলোর পেছনে ঢাকা পড়ে গেল, যা ছিল হিসেবের বাইরে। কেন এমনটা হয়েছিল? তারই উত্তর সন্ধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন, কারিকলোকে ঘিরে রয়েছে দুটো বলয়। তাই নক্ষত্রটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ওই দুটো বলয়ের ছায়া এসে পড়েছিল টেলিস্কোপের লেন্সে।
 
কোনো গ্রহাণুর যে বলয়-ব্যবস্থা থাকতে পারে একথা জানা ছিল না বিজ্ঞানীদের। কারিকলো তাই সবাইকে অবাক করে দিয়েছে তার বলয় সৌন্দর্যে। কারিকলো পর্যবেক্ষক ফিলিপ ব্রাগা-রিবাস যেমনটি বলেছেন, ‘কস্মিনকালেও কল্পনা করিনি, কারিকলোর মতো এত খাটোদেহী কোনো বস্তুর বলয়-ব্যবস্থা থাকতে পারে। না আমাদের লক্ষ্য ছিল বলয়-দর্শন। কিন্তু (সেদিন) বলয়-বেশভূষায় কারিকলো আমাদের চোখে জন্ম দিল এক অপার আশ্চর্য।’
কারিকলোর বলয় দুটো প্রস্থে সাত ও তিন কিলোমিটার। আর তাদের মাঝে নয় কিলোমিটারের ফারাক। ব্রাজিলের দুটো নদীর নামে বলয় দুটোর নাম রাখা হয়েছে ওয়েপক ও চাই।
 
সৌরজগতের আটটি গ্রহের মধ্যে চারটির বলয়-ব্যবস্থা আছে। গ্রহগুলো হলো বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন। কারিকলো গ্রহাণু হওয়া সত্ত্বেও বলয়-বিবেচনায় এই চারটি গ্যাসীয় গ্রহের সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হলো।
 
পুঁচকে চাঁদ?
কারিকলোর কি কোনো চাঁদ আছে? 
আমরা এখনও জানি না। তবে থাকলে খুব একটা আশ্চর্য হতে চান না ফিলিপ ব্রাগা-রিবাস, ‘বলয় যেমন আছে, আমার ধারণা ছোটখাট চাঁদও আছে কারিকলোর, অন্তত একটা যা এখনও আবি®কৃত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।’
যদি কখনো সেই পুঁচকে চাঁদের সন্ধান মেলে, তাহলে তার গঠন ও উৎপত্তি জানতে পারলে আমাদের পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের জন্ম-রহস্য সম্পর্কেও বাড়তি ধারণা পাওয়া যাবে।
কারিকলোর বলয় আবিষ্কারের খুঁটিনাটি ছাপা হয়েছে নেচার জার্নালে, ২৬ মার্চ ২০১৪। 
তথ্যসূত্র : সায়েন্স ডেইলি, নেচার


মন্তব্য