kalerkantho


গ্রামের একমাত্র পাস এই পাবেলকেই ওরা মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ জুলাই, ২০১৮ ১৪:৪৭



গ্রামের একমাত্র পাস এই পাবেলকেই ওরা মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল

ওইদিন মার খেয়ে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতালে পাবেল (ডানে)

নিজ গ্রামের প্রথম এইচএসসি পাস ছেলে হিসেবে নাম ছড়াচ্ছে পাবেল মিয়ার। আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ'র এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে দেশের 'কলঙ্কিত' গ্রামের এই অদম্য মেধাবীর কথা। যে গ্রামের সবাই বংশানুক্রমিকভাবে একসময় চৌর্যবৃত্তির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে কথিত রয়েছে, সেখানে এখন কেবল মাদক আর সন্ত্রাসের কারবার। সেই গ্রামের কেউ লেখাপড়া করবে তা তারা নিজেরাও ভাবতে পারে না। কিন্তু গোবরে পদ্মফুল ঠিকই মাথাচাড়া দিয়েছে। কেবল লেখাপড়াতেই নয়, পাবেল তার মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার। প্রতিবাদ করতে গিয়ে একবার মার খেয়ে হাসপাতালেও চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। 

মাথা, পা এবং মুখে আঘাত পেয়েছিলেন পাবেল

 

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার এই গ্রামটি 'চোরাপল্লী' নামে পরিচিত। ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের সময় গ্রামের অনেকে ভোটার তালিকায় পেশা হিসেবে 'চোর' লিখতে চাওয়ায় দেশে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তারা এখন আর সেই পেশায় নেই। কিন্তু কলঙ্ক কি আর এত সহজে ঘোচে? আজও তারা অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। দারিদ্র্যতা তো রয়েছেই। এমন পরিবেশের মধ্যে পাবেল মিয়া দিরাই ডিগ্রি কলেজ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৩.৮০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার আগে কেউ কলেজ এ অবধি আসতেই পারেনি। পাবেল শাল্লা উপজেলার শ্যামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি (বিজ্ঞান) ৩.২০ জিপিএ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল। 

আবার 'চোরাপল্লী' নামক গ্রামে যত মাদক আর সন্ত্রাসের ছড়াছড়ি, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও পিছপা হন না তিনি। গ্রামের জন্যে সুনাম বয়ে আনতে চান। নিজ গ্রামবাসীর মধ্যে সচেতনতামূলক কাজ করেন। মূলত তার গ্রামের মানুষের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন এলাকার মাদক কারবারিরা তাদের মাধ্যমে চোলাই মদ তৈরি করে বাজারজাত করে, এমন অভিযোগ আছে। 

এই তো গত মাসের ঘটনা। মদ প্রস্তুত এবং বিক্রির জন্যে নিজ গ্রামবাসীকে আর ব্যবহার হতে দিতে চান না পাবেল। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। আর এ কারণে তাকে মারধর করেছিল মাদক কারবারিরা। আহত হয়ে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দু'দিন ভর্তিও ছিলেন। এখন সুস্থ আছেন। 

পাবেল আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পরই তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা ফেসবুকে তাকে নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার হারুন উর রশীদ ও বর্তমান পুলিশ সুপার বরকত উল্লাহ খান মহোদয়দের একান্ত সহযোগীতায় লেখাপড়া করেছে পাবেল। পাবেল একটি কথাই বার বার বলতো, 'ভাই আমাদের গ্রাম সম্পর্কে একটু লেখেন, কোমলমতি শিশুগুলোকে আলোর পথে নিয়ে আসতে হবে'। এর আগে দিরাই সার্কেলের সাবেক এএসপি সুরত আলমের সহায়তায় গ্রামে অভিযান চালিয়ে চোলাই মদ তৈরির কারখানা ধ্বংস করে পাবেল। এমনকি নিজের ফেসবুকে নিজ গ্রামের মদ তৈরির কারখানা নিয়ে সরব প্রতিবাদ করে এসেছেন।

পাবেলের হতদরিদ্র বাবা আব্দুর রহমান বড় ছেলের পড়ালেখার খরচ জোগাতে পারতেন না। একাধিকবার ছেলের পড়ালেখা বন্ধ করিয়েছিলেন। কিন্তু হার মানেনি পাবেল। নিজে শ্রমিকের কাজ করে পড়ালেখা চালিয়েছেন। আর এই কঠিন সংগ্রামের ফলে পাবেল এখন গ্রামের প্রথম এসএসসি ও এইচএসসি পাস যুবক। শিক্ষিত এবং প্রতিবাদী। কাজেই তাকে ঘিরেই এই পিছিয়ে পড়া গ্রাম সামনে এগিয়ে যাবে বলে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন অনেকেই। 



মন্তব্য