kalerkantho


কখন বিয়ে করব?

মারুফা মিতু    

১৮ জুলাই, ২০১৮ ১১:২৬



কখন বিয়ে করব?

মডেল : নোমান ও পৃথা, ছবি : মঞ্জুরুল আলম

রওশন আরা। দেশের একটি অন্যতম নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সরকারি চাকরিতে ভালো পদে আছেন। সব সময় পড়াশোনা ও নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে বন্দি থাকার পর এখন একটু নিজের মতো করে ঘুরেফিরে জীবনটাকে উপভোগ করতে চান। এখনই বিয়ের মতো কোনো রকম কমিটমেন্টে যেতে তিনি মোটেও আগ্রহী নন। তবে তাঁর এই অনাগ্রহ নিয়ে মা-বাবার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তাঁরা দিনমান চিন্তা করেন, মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে গেলে মেয়েকে কিভাবে পাত্রস্থ করবেন। বাড়িতে কোনো আত্মীয় এলেই তাঁকে ধরেন মেয়েকে বোঝাতে। পাড়া-প্রতিবেশীরা মেয়ের ‘বিয়ে হচ্ছে না’ কেন, এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন।

হুমায়রা শবনম। কাজ করেন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল হলেও সমাজের চোখে তিনি ব্যর্থ, কারণ তাঁর ‘বিয়ে হয় না’, বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে অথচ ‘বিয়ে হয়নি’ বলে তাঁর পরিবারের সবার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। বাস্তবতা হলো, অনেক পাত্রকে তিনি পছন্দ করেননি, আবার তাঁকেও অনেকে অপছন্দ করেননি। অর্থাৎ ব্যাটে-বলে মেলেনি বলে এখনো সময় নিচ্ছেন। কিন্তু সবাই ধরে নিয়েছে যে তাঁর ‘বিয়ে হয় না’।

হিরের আংটি বাঁকাও ভালো। আমাদের সমাজের পুরুষরা হচ্ছে হিরের আংটির মতো। তাঁর যত দোষ থাকুক, পুরুষ গুণে পার পেয়ে যান তিনি। এই পুরুষগিরি দেখা যায় যখন তিনি বিয়ে করতে যান তখনো। একজন পুরুষ যখন বয়স বেশি করেও বিয়ে করেন, তখন কারো তেমন কোনো মাথাব্যথা থাকে না। কিন্তু একজন নারী যখন বিয়ে করতে একটু দেরি করেন, তখন চারপাশ থেকে কানাঘুষা শুরু হয়ে যায়। হায়রে বিয়ের বয়স তো পার হয়ে যাচ্ছে। নারীর এই বিয়ের বয়স কত? এই প্রশ্ন অনেকের?

এই বিয়ের বয়স পার হওয়াদের দলে আরেকজন হলেন তারেক। তিনি একজন গবেষক, বয়স ৩৮। তাঁকেও আত্মীয়-বন্ধুরা প্রায়ই বিয়ে করতে তাগাদা দেন। ‘কেন বিয়ে করছ না’ জাতীয় প্রশ্নে তিনি জেরবার। তবে তার ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘বিয়ে হয় না’র বদলে ‘বিয়ে করে না’ জাতীয় সমস্যা হওয়ায় এবং পুরুষ হওয়ার কারণে তাঁর মা-বাবার প্রেসার এখনো খুব একটা বেড়ে যায়নি।

আমরা বুঝতে পারলাম। বিয়ের বয়স বিষয়টি ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য প্রযোজ্য হলেও মেয়েদের বেলায় ব্যাপারটা একটু বেশিই চাপের। কারণ মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে গেলে সমাজ অবিবাহিত মেয়েটির কপালে ‘বিয়ে হয় না’ লেখা একটি অদৃশ্য মোহর এঁটে দেবে। যত বয়স বাড়বে, ততই তার বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকবে বলেই মনে করা হয়।

মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ের বয়সটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়? এ প্রশ্নের মূল অনেক গভীরে। বিয়ে প্রথাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জটিল সমীকরণ। এসব সমীকরণকে ছাপিয়ে এখনো পর্যন্ত খুব কম মানুষই বিয়েকে দুজন মানুষের মধ্যকার ভালোবাসার সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করেন। যার জন্য বিয়ের বয়স এখনো এত বেশি গুরুত্ব বহন করে চলেছে।

একসময় ধর্মই ঠিক করে দিয়েছে ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়স। হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ মনুসংহিতায় বিশেষত মেয়েদের বিয়ের বয়সের ব্যাপারটায় বেশ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এতে মেয়েদের ঋতুমতি হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়ার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এর পরে কোনো মেয়ের বিয়ে হলে মা-বাবার নরকে যেতে হবে। আট বছরের মেয়েকে বিয়ে দেওয়াকে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হিসেবে অনেকে বলেন, বাবার বাড়িতে বেশি দিন কন্যা থাকলে সে বাবার বাড়ির রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং পরে শ্বশুরবাড়িতে তার শিকড়টি ঠিকমতো বসতে চায় না। তাই যত কম বয়সে সম্ভব কন্যাটিকে বাবার বাড়ি থেকে উৎখাত করাই কর্তব্য। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে দুজন মানুষের নতুন সংসার তৈরি করার ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে একটি পরিবারের মেয়েকে আরেক পরিবারে স্থানান্তর করার বিষয়টি। ইসলাম ধর্মেও বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে প্রায় একই মত অবলম্বন করা হয়। এতে ছেলে-মেয়ে উভয়েরই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিয়ে দেওয়ার জন্য মা-বাবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্কের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

এর পর রাষ্ট্রব্যবস্থা সুসংগঠিত হওয়ার পরে আইন করে ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়স ঠিক করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রে বিয়ের বয়সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। আর প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় মেয়েদের বিয়ের বয়সটা একেবারে আঁটসাঁট করে ধরে-বেঁধে দেওয়ার চেষ্টায় থাকে সমাজ।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন জানান, ‘আমাদের দেশে বিয়ের সম্পর্কে মানবিক লেনদেনের গুরুত্ব কম। এখানে বিয়েটা একটা বৈধ যৌনতার লাইসেন্স এবং মা হওয়ার উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। আর তাই সমাজ বিভিন্ন ধরনের মাপকাঠি দিয়ে ঠিক করে দেয় বিয়ের বয়স। যেহেতু বিয়েকে বংশবিস্তারের উপায় বলে মনে করা হয়, তাই মনে করা হয় একটি কম বয়সী মেয়ের শরীরই মা হওয়ার জন্য বেশি উপযুক্ত। যদিও পুরুষের স্বাস্থ্যও বংশবিস্তারের অন্যতম গুরুত্ব বহন করে, সেটিকে অবশ্য তেমন ধর্তব্যে আনা হয় না। এ ছাড়া আমাদের সমাজে সাধারণভাবেই একটি কথা চলে, সেটি হলো ‘কুড়িতে বুড়ি’। অর্থাৎ প্রচলিত সামাজিক ধারণা হলো, মেয়েরা খুব তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যায়, মানে যৌন আবেদন হারিয়ে ফেলে। তাই মেয়েদের ‘বিয়ের বয়স’ খুব দ্রুত পার হয়ে যায়। কিন্তু এখন মানুষের ধ্যান-ধারণা পরিবর্তন হয়েছে অনেক। নারী নিজেকে স্বাবলম্বী দেখতে চায়। তাই তিনি তাঁর শিক্ষাকার্যক্রম সমাপ্ত করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেও অনেক সময় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এটা আসলে একজন মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি তাঁর জীবনটাকে আয়নায় কিভাবে দেখতে চান। কিভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করবেন এটা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়টিতে অনেক সময় নারী স্থির থাকতে পারেন না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে একটা চাপ তাঁর থাকেই। সেই পারিবারিক ও সামাজিক নানাজনের চাপ যখন মেয়েটির মা-বাবার ওপর পড়ে, তখনই কিন্তু তাঁরা মেয়ের বিয়ের জন্য কিছুটা চাপ অনুভব করেন। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নিজেদের মতামতের জবরদস্তি করেন। সেটা যেমন একজন ক্লাস এইটপড়ুয়া কিশোরীর ক্ষেত্রে, তেমনি একজন স্নাতকোত্তর শেষ করা তরুণীর ক্ষেত্রে। অনেক সময় দেখা যায়, মেয়েটি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশের পথ পাড়ি দেওয়ার পরও তাঁর ওপর মা-বাবার সিদ্ধান্তের একটা চাপ থাকেই। এটা আসলে একটা সামাজিক ও পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গিই। এতে পরিবর্তন আনতে হবে।

সমাজের পরিবর্তন হচ্ছে এবং তার ইতিবাচক প্রভাব আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখতে পাচ্ছি। নারী যখন ব্যক্তিস্বাধীন হবেন, তখন সমাজে সেটা ইতিবাচক প্রভাবই ফেলবে। 



মন্তব্য