kalerkantho


'পালকিতে বউ চলে যায়', এখন কেবলই অতীত

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৬ জুলাই, ২০১৮ ২০:২০



'পালকিতে বউ চলে যায়', এখন কেবলই অতীত

প্রতীকী ছবি

এক সময় বিয়ের কথাবার্তা পাকা হলেই ডাক পড়তো পালকিওয়ালার। কিন্তু এখন আর তাদের ডাক পড়ে না। সে কারণে আর পালকি বাহকদেরও দেখা মেলে না।

অথচ তারা পালকিতে নতুন বউ নিয়ে যাওয়ার সময় নিজেদের ঘরানার অনেক গান গাইতেন। এখন তাদের পাড়ায় মাঝে মধ্যে বাজে হাল আমলের ‘পালকিতে বউ চলে যায়’ গানটি।

ভারতের পুরুলিয়া, বীরভূম ও বাঁকুড়াতে বহু মানুষ পালকিবাহক ছিলেন। এখনো কিছু মানুষের বাড়িতে পালকি রয়েছে। তবে তাদের আর ডাক পড়ে না।

এক সময়ের পালকি বাহকেরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, যুগের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পালকির প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে গেছে। তবু পুরনো দিনের সেই খেতাব আজও থেকে গেছে পালকি পাড়ায়।

তারা আরো জানান, এক সময় ৪৫টি পরিবার ওই এক পাড়াতেই থাকতেন। প্রতিটি পরিবারের এক বা একাধিক পুরুষ পালকি বাহকের কাজ করতেন। তাদের অন্যতম প্রধান জীবিকা ছিল পালকি বহন। আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায়, আজ পালকি অবলুপ্তপ্রায়। কালেভদ্রে এখন পালকি বহনের ডাক আসে। জীবিকা হারিয়ে পালকি বাহকেরা আজ দিনমজুর। কিন্তু, আজও তাদের বাপ-দাদাদের পেশার চিহ্ন বহন করে চলেছে পালকি পাড়ার খেতাব।

পাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা কানন বাউরি বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও পালকির বায়না করতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসতেন। গ্রামে ঢুকেই জিজ্ঞেস করতেন, পালকি পাড়াটা কোন দিকে? এখন পালকির চাহিদা না থাকলেও আমাদের এই পাড়াটিকেই পালকিপাড়া হিসেবেই চেনেন সকলেই।

ডাক আসলে এখনো পালকি ঘাড়ে তোলেন লক্ষণ বাউড়ি, সুকুমার বাউড়িরা। তাদের কথায়, মূলত অর্থের অভাবে নিজস্ব কোনো পালকি ছিল না। কিন্তু বিয়ে, দ্বিরাগমন, গঙ্গাস্নান, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি যাওয়া-আসার জন্য বায়না তো বটেই রাতবিরাতে কবিরাজ কিংবা হাসপাতাল যাওয়ার জন্য সকলেই আমাদের কাছেই আসতেন। আমরা সেই মতো পালকি মালিকেরও বায়না করতাম। গ্রামে সে সময় ৮ থেকে ১০টি পালকি ছিল। বাইরের গ্রাম থেকেও পালকি ভাড়া করে আনা হতো। জমিদারবাড়ির নিজস্ব পালকি বহনের জন্যও ডাক পড়ত। কিন্তু সে সব এখন অতীত!

তাদের আক্ষেপ, অনভ্যাসে বর্তমান প্রজন্মের বাহকেরা ভুলতে বসেছেন তাদের নিজস্ব ঘরনার পালকির গান। তবু হালের ‘পালকিতে বউ চলে যায়’ গান শুনে আজও মন উড়ু উড়ু করে পালকি বাহকদের।

সুনীল বাউরি, অশোক বাউরিরা বলেন, ছোটবেলায় স্কুলে আমরাও পালকির গান মুখস্ত করেছি। হাল আমলের গানও শুনেছি। দু’টি গানই আমাদের পুরনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু, আমাদের গান ছিল স্বতন্ত্র। চলার গতির ধারাবাহিকতা রক্ষার পাশাপাশি উপরি অর্থ পাওয়ার লোভে কর্তা-কর্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য মুখে মুখে গান বেঁধে স্লোগানের আদলে গাওয়া হতো।

কেমন ছিল সেই সব গান? পালকি বাহকেরা জানান, কর্ত্রীকে গঙ্গাস্নানে নিয়ে যাওয়ার সময় গাওয়া হতো, 'কর্তাবাবুর রঙটি কালো, গিন্নি মায়ের মনটি ভালো। সামলে চলো হেঁইও’। আবার কর্তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার সময় বাইকেরা গাইতেন, ‘হেঁইও জোয়ান সরু আল চলো ধীরে, কর্তাবাবুর দরাজ দিল দেবে চিঁড়ে’।

সব আজ ইতিহাস! জীবিকা হারিয়ে দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী পালকি বাহকেরা আজ দিনমজুর। তাদের আক্ষেপ, ভর্তুকিযুক্ত ঋণ পেলে তারা বিকল্প জীবিকা খুঁজে নিতে পারতেন। কিন্তু, তার নাগাল মেলেনি।



মন্তব্য