kalerkantho


মিশন রয়্যাল হালিম

অনিতা চৌধুরী, কলকাতা প্রতিনিধি   

১৪ জুন, ২০১৮ ১৭:১৬



মিশন রয়্যাল হালিম

ব্যাংক কর্মচারী সুভাশীষ রায় দরদর করে ঘামছেন কলকাতার জুন মাসের ভ্যাপসা গরমে। কিন্তু মুখে মিষ্টি হাসি।

‘কয়েকদিন ধরেই প্ল্যান করছিলাম, রয়্যাল এর হালিম খাবো... আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হলাম’, চোখের চশমাটা খুলে ঘাম মুছে বললেন সুভাশীষ।

রয়্যালের সামনে যে মানুষের ভিড় জমেছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা মুহিত হাসান। কালেরকণ্ঠের সাথে কথা বলতে বলতে জানালেন, চিতপুর রোডে ওনার আসার কারণও এক- ‘মিশন হালিম’।

মুহিত সাহেব চুপচাপ দাড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু সুভাশীষ একটু অস্থির কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকার পর উনি বেরিয়ে গেলেন অদুরে নাখোদা মসজিদ দেখে আসতে। ‘কাগজে পড়লাম নাখোদা মসজিদ এই রমজান মাসে নতুন করে রঙ করে সংস্কার করা হয়েছে। যাই একটু দেখে আসি, হালিম আসতে একটু দেরি’, বলেই গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন ব্যাংক বাবু।

কলকাতায় চিতপুর রোডের রয়্যাল রেস্টুরেন্টে সারা বছর মানুষ বিরিয়ানি, চিকেন চাপ খেতে ভিড় করে নবাবী স্বাদের লোভে।
রমজান মাসেও এই আইটেম দুটি বিক্রিতে কমতি নেই, কিন্তু এই পবিত্র মাসে হালিম যেন ‘হট কেক’।

আর এই সুস্বাদু হালিমের চাহিদা শুধু রোজাদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তা বোঝা যায় রয়্যালের সামনে দাঁড়ালে অথবা জাকারিয়া স্ট্রিটে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালে।

জাকারিয়া স্ট্রিটকে কলকাতার ফুড স্ট্রিট বলা যেতে পারে এই রমজান মাসে। ঘিঞ্জি রাস্তায় চারধারে পাওয়া যাচ্ছে নানান রকমের ইফতারি আইটেম- কোথাও কাবাব, কোথাও রঙবেরঙের শরবত, দেশ-বিদেশের খেজুর, হালিম, নানান রকমের ভাজাভুজি।

‘লোভনীয়ও ...চারধারে এতো রকমের খাওয়া দাওয়া। এটাই জাকারিয়া স্ট্রিটের আকর্ষণ। আর রমজান মাসে ব্যাপারটাই আলাদা। প্রতি বছর রমজান মাসে আমি এখানে আসি, ইফতারের সব আইটেম উপভোগ করতে’, জানালেন অরণ্য মজুমদার।

‘তবে হালিমটাই মেইন আকর্ষণ’ হেসে ফেললেন মাঝবয়সী অরণ্য।
চিতপুরের রয়্যাল, পার্ক সার্কাসের আরসালান, এস এন ব্যানার্জি রোডের আমিনিয়া, বেনটিঙ্ক স্ট্রীটের আলিয়াহ- কলকাতায় হালিম খাওয়ার জায়গার অভাব নেই। আর যেকোনো দোকানে পৌঁছে যান, দেখবেন ভিড় উপচে পড়ছে, কারণ হালিম চাই।

‘আমরা ৪০০ বাটি দিয়ে শুরু করেছিলাম... কিন্তু এত চাহিদা, আমরা ৬০০ বাটি করে দিয়েছি’, জানালেন আলিয়াহ দোকানের কাউন্টারে বসে থাকা বয়স্ক মানুষটি।

‘সব রকম মানুষ আসেন হালিম খেতে ... আর এটাই কলকাতার সব থেকে বড় ঐতিহ্য’, উনি আরও জানালেন, ওনার হাতে বেশিক্ষণ কথা বলার সময় নেই, চারধারে ক্রেতাদের ভিড়।

তেমনি ব্যাস্ত জাকারিয়া স্ট্রিটের রয়্যাল ইণ্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে বসে থাকা মানুষজন।

‘প্রতি বছর রমজান মাসে প্রতিদিন ৪০কেজির মতো মাটন হালিম বিক্রি হয়, তবে বন্ধের দিন চাহিদা বেশি থাকে হালিমের। ঐদিন প্রায় ৫০ কেজি বিক্রি করে থাকি... আবার অনেকে ঈদের দিনেও ফোন করে জিজ্ঞেস করেন হালিম পাওয়া যাবে? আমাদেরকে তাদের আবার জানাতে হয় শুধু রমজান মাসেই আমরা হালিম তৈরি করি...’  মুখে মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন কাউন্টারে বসে থাকা বয়স্ক ভদ্রলোক।

‘রমজান মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর মানুষ আসেন আমাদের স্পেশাল মাটন হালিম খাওয়ার জন্য... যাওয়ার আগে বলে যান আবার আসবেন আমাদের রেস্টুরেন্টে। সেটা অনেক ভাল লাগে আমাদের’, বললেন উনি।

কথা বলতে বলতে উনি তাকালেন নিজের হাতের ঘড়ির দিকে। ঘড়িতে তখন বিকেল ৫.৪০। ইফতারের ব্যবস্থা চারধারে চোখে পড়ার মতো। জ্বলে উঠছে রাস্তার সব লাইট। বাটিতে  হালিম সাজানো শুরু।



মন্তব্য