kalerkantho


বিশুদ্ধ ইফতারি

সিলেটে ইফতারিতে আখনি থাকবেই

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট    

২২ মে, ২০১৮ ১২:১৬



সিলেটে ইফতারিতে আখনি থাকবেই

সিলেটে ইফতারিতে অন্য উপকরণের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী আখনি থাকবেই। ছবি : কালের কণ্ঠ

পুরান ঢাকার চকবাজারের মতো এত মনকাড়া ও চমকপ্রদ ইফতারসামগ্রীর প্রচলন সিলেটে নেই। কিন্তু ইফতারে নানা পদের খাবার রাখে এখানকার লোকজন। এর মধ্যে অপরিহার্য পদ হচ্ছে আখনি, ভুনা খিচুড়ি কিংবা পাতলা খিচুড়ি। সিলেটে ইফতারি মানে এই তিনটির একটি থাকবেই। বিশেষ করে ইফতার পার্টি আখনি ছাড়া চিন্তাই করা যায় না সিলেটে। এটাই সিলেটের ইফতারের ঐতিহ্য।

জিবে জল এনে দেওয়া স্বাদ ও গন্ধ আখনির আলাদা পরিচিতি বহু আগে থেকেই। অনেকটা তেহারি ঘরানার এই খাবার সিলেটিদের পাশাপাশি মুগ্ধ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষকে। ইফতারে আখনির প্রকৃত স্বাদ পেতে অনেকে খোঁজ করে দক্ষ বাবুর্চির। হাল সময়ে বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিলেটের  বাজারে নানা উপাদেয় ও বৈচিত্র্যময় ইফতারসামগ্রী বাজারজাত করার পাশাপাশি রমজানে আখনি ও ভুনা খিচুড়ি বিক্রি করে।

নগরীর বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা, মদিনা মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় দুপুর থেকেই ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। চট্টগ্রামের খাদ্য উৎপাদনকারী বেশ কয়েকটি কম্পানি বনফুল, মধুবন, ফুলকলি এবং সিলেটের স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফিজা ও বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট এই ইফতারসামগ্রীর  বিক্রেতা।

দেশের অন্য এলাকায় ইফতারে ছোলা-মুড়ি যেমন আবশ্যক, সিলেটিদের কাছে এটি একেবারে অচল। আখনি কিংবা খিচুড়ি ছাড়া ইফতারের কথা চিন্তাই করা যায় না। তবে আখনি-খিচুরিতে ছোলার মিশ্রণও একটা ঐতিহ্য, বিশেষ করে খিচুড়িতে। এই মিশ্রণ দুভাবে হয়। কেউ কেউ রান্নার সময়ই খিচুড়িতে ছোলা মিশিয়ে দেন। তবে বেশির ভাগই ছোলা আলাদাভাবে ভেজে রাখা হয়, যা খিচুড়ি কিংবা আখনির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। তবে সিলেটে বসবাসকারী অন্য জেলার লোকজন ইফতারের সময় ছোলা-মুড়ি খেয়ে থাকে।

শুধু বাসা-বাড়িতেই নয়, ইফতারির দোকানগুলোতেও আখনির জয়জয়কার। দোকানগুলোতে আখনি বা খিচুড়ির আইটেম থাকবেই। আখনি তিন ধরনের হয়ে থাকে। গরু ও খাসির মাংসের আখনি এবং মোরগের আখনি। এবারের রোজায় আখনি প্রতি কেজি ২১০ থেকে ২৬০, ভুনা খিচুড়ি ১১০ থেকে ১৪০ এবং পাতলা খিচুড়ি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নগরের পশ্চিম শাহি ঈদগাহের মি. সুইটসের বিক্রয়কর্মী রিয়াজ আহমদ বললেন, ‘আমাদের এখানে আখনি প্রতি কেজি ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।’

নগরের জিন্দাবাজার এলাকার সাম্পান রেস্টুরেন্টে বিফ আখনি ২৪০ এবং চিকেন আখনি ২১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ সুহেল। রমজান উপলক্ষে তাঁদের রেস্টুরেন্ট ইফতারের বৈচিত্র্যময় খাবার নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে জালি কাবাব, চিকেন ফিঙ্গার চাপ, চিকেন স্টিক, চিকেন মাশরুম, চিকেন ললিপপসহ ৪০ পদের ইফতারসামগ্রী রয়েছে। ইফতারের বৈচিত্র্যময় আয়োজন চোখে পড়েছে একই এলাকার পানশী রেস্টুরেন্ট, ভোজনবাড়ি রেস্টুরেন্ট ও পালকি রেস্টুরেন্টে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সিলেটের ইফতারসামগ্রীর মধ্যে জিলাপি, পিঁয়াজু, আলুচপ, ডিমচপ বেগুনি, আলুনি, শাকের পাকুড়া, সবজির পাকুড়া, কাঁচকলা চপ, চিংড়ির বড়া প্রায় সবখানেই বিক্রি হচ্ছে।

সিলেটে ইফতারির আরেকটি অনুষঙ্গ বাখরখানি। ইফতারের সময় কিংবা রাতে চায়ের সঙ্গে বাখরখানির প্রচলন চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। চার প্রকারের মিষ্টি ও ঝাল জাতীয় বাখরখানি রয়েছে, যেগুলো সিলেট ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না বলে জানালেন কয়েকজন বিক্রেতা। পাঁচ টাকা থেকে শুরু করে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম একেকটি বাখরখানির।

আম্বরখানার ফুড কিংয়ের ব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান বললেন, ‘সিলেটে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী আমরা ইফতারিসামগ্রী সরবরাহ করে থাকি। এখানে ইফতারিতে আখনি অথবা ভুনা খিচুড়ির আইটেমের চাহিদা বেশি, তাই আমরা এগুলো রাখি।’

আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চিকেন ইরানি কাবাব, চিকেন টিক্কা, চিকেন ফ্রাই, রেশমি কাবাব, চিকেন রোস্ট, চিকেন রোলসহ কয়েক ধরনের কাবার এনেছে। ইদানীং হালিম ইফতারির একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। সব বড় রেস্টুরেন্ট এবং ফাস্ট ফুডের দোকানে ইফতারসামগ্রীর মধ্যে হালিম রয়েছে।

মিষ্টিজাতীয় দ্রব্যের মধ্যে সিলেটের স্পেশাল হচ্ছে আমিত্তি। একসময় এটি লাল রঙের হতো। এখন তাতে রং দেওয়া হয় না। দেখতে অনেকটা জিলাপির মতো হলেও আকার ও স্বাদে ভিন্নতা রয়েছে। সব মিষ্টির দোকানে আমিত্তি পাওয়া যায় না। হাতে গোনা কয়েকটি দোকানে আমিত্তি পাওয়া যায়। চাহিদা বেশি হলে আগে অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়।

সিলেটের ইফতারি সম্পর্কে জানতে চাইলে কলেজ শিক্ষক জয়নাল আবেদিন বলেন, সিলেটের ইফতারির আইটেম অনেকটাই ট্রাডিশনাল। আখনি, খিচুড়ির সঙ্গে ছোলা, পিঁয়াজু, মিষ্টান্ন থাকবেই। ইদানীং কয়েক ধরনের কাবাব যোগ হয়েছে। 



মন্তব্য