kalerkantho


মানিকগঞ্জ

পানির দেখা নেই নদী-খাল-বিলে

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

১৬ মার্চ, ২০১৮ ১৫:৩৪



পানির দেখা নেই নদী-খাল-বিলে

একসময়ের খরস্রোতা কালীগঙ্গায় এখন পানির দেখা নেই। নৌকাও চলে না স্বাভাবিক গতিতে। হেঁটে পার হওয়া যায় নদী। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে চলে ধান চাষ। ছবি : কালের কণ্ঠ

পদ্মা, যমুনা ও ৯টি শাখা নদী একসময় প্রবাহিত হতো মানিকগঞ্জ জেলার ভেতর দিয়ে। জালের মতো জড়িয়ে থাকত অসংখ্য খাল। ছিল বড় বড় বিলও। এসবই এখন মৃতপ্রায়। বেশ কয়েকটি নদী-খাল-বিলের অস্তিত্ব নেই। বাকিগুলোর অবস্থাও সংকটাপন্ন। সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জ কার্যত মরুভূমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

মানিকগঞ্জের নদীগুলোর মধ্যে পদ্মা, যমুনা, ইছামতী, কালীগঙ্গা, কান্তাবতী, মনলোকহানী, গাজীখালী, ক্ষীরাই, মন্দা, ভুবনেশ্বর ও ধলেশ্বরী অন্যতম। যমুনা নদীটি জেলার দৌলতপুর উপজেলার পশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষে শিবালয় উপজেলায় আরিচা ঘাটের অদূরে পদ্মা নদীর সঙ্গে মিশেছে। এর পর থেকে পদ্মা নাম ধারণ করে প্রবাহিত হয়েছে দক্ষিণে। পদ্মা নদীর শাখা ইছামতী নদী হরিরামপুর উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আবার পদ্মা নদীতে মিলিত হয়েছে। বছর ১৫ আগে ভাঙন ঠেকাতে যাত্রাপুরের কাছে বাঁধ দিয়ে এর প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। দৌলতপুরের কাছে যমুনা নদী থেকে কালীগঙ্গা নদীর উৎপত্তি। এরপর নদীটি ঘিওর উপজেলার জাবরা গ্রাম হয়ে তরা ব্রিজের নিচ দিয়ে মানিকগঞ্জ সদরের বেওথা ঘাট হয়ে সিংগাইর উপজেলার চারিগ্রাম হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়েছে। বর্তমানে এই নদীর বেশির ভাগ স্থানে শুষ্ক মৌসুমে নৌকা চলাচলের মতো পানি থাকে না। কোথাও কোথাও একেবারে শুকিয়ে যায়। টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায় যমুনা নদী থেকে ধলেশ্বরী নদীর উৎপত্তি। নাগরপুর থেকে এই নদী মানিকগঞ্জের ঘিওর ও সাটুরিয়া উপজেলার মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি সিংগাইর হয়ে বুুুড়িগঙ্গায় মিলিত হয়েছে। তবে এই নদীটিও মৃত প্রায়। বছরের বেশির ভাগ সময় সেখানে নৌকা চলাচল করতে পারে না। ধলেশ্বরী নদীর শাখা কান্তাবতী, মনলোকহানী, ক্ষীরাই, মন্দা ভুবনেশ্বর নদীর এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ইতিহাসের বই আর বয়স্ক মানুষের মুখেই শুধু এই নদীগুলোর নাম শোনা যায়। ধলেশ্বরী নদীর আরেকটি শাখা নদী গাজীখালী। সেটি বর্তমানে মৃতপ্রায়। শুধু বর্ষা মৌসুমের কয়েক মাস পানি থাকে।

একই অবস্থা জেলার খালগুলোরও। মানিকগঞ্জ শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খালটিতে বছর বিশেক আগেও সারা বছর পানি থাকত। কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গে এর যোগাযোগ। কালীগঙ্গা শুকিয়ে যওয়ায় এই খালটিও এখন মৃতপ্রায়। অথচ এই খালটিকে কেন্দ্র করেই মানিকগঞ্জ জেলা শহর গড়ে উঠেছে। শুকিয়ে গেছে কাশাদহ খাল। পদ্মা নদীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ছিল এই খালের। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানিকগঞ্জে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয়েছিল গোলইডাঙ্গার খালে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাতটি নৌকা ডুবে গিয়েছিল এই খালেই। অথচ সেই গোলাইডাঙ্গার খাল এখন হেঁটেই পার হওয়া যায়। এ ছাড়া বাস্তার বিল, ভাতছালার বিল, গজারীর বিল, বৈরাগীর বিল, পটল বিল, আয়না পুরের বিল এখন শুধুই স্মৃতি। 

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজিনাস নলেজ (বারসিক) ও ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলনের সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, ‘অপরিকল্পতিভাবে বাঁধ দেওয়া, সেতু, রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করা এবং উজান থেকে পলি মাটি এসে ভরাট করে ফেলছে নদীগুলো। আবার নদী দখল করে বিভিন্ন জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করছে প্রভাবশালীরা। প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্তাদের সহায়তায় এবং আইনের মারপ্যাঁচে এই দখল স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে।’

বিমল রায় বলেন, ‘সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর প্রতিকার করা দরকার। অব্যাহত খননের মাধ্যমে নদীগুলোকে আবার জীবিত করা সম্ভব। অন্যথায় নদী-খাল-বিলের মানিকগঞ্জ মরুভূমিতে পরিণত হবে।’

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ থেকে কিছুদিন আগে বদলি হওয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, ঘিওর উপজেলার জাবরা থেকে দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারি পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটার নদীখননের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) মানকিগঞ্জ সদর উপজেলার তরা থেকে সিংগাইর উপজেলার হজরতপুর পর্যন্ত প্রায় ৫৫ কিলোমিটার নদীখননের কাজ করছে। তবে তিনি বলেন, ‘শুধু মানিকগঞ্জ অংশের নদীগুলো খনন করলেই হবে না। যেসব এলাকা দিয়ে এই নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে তার সব জায়গাতেই খনন করতে হবে। তা না হলে সেই খনন টেকসই হবে না।’


মন্তব্য