kalerkantho


সিলেটে ফিরে জাফর ইকবাল

অস্ত্রটা রেখে এসো, সামনাসামনি আমার সঙ্গে কথা বলো

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ২২:৪৩



অস্ত্রটা রেখে এসো, সামনাসামনি আমার সঙ্গে কথা বলো

ছবি : কালের কণ্ঠ

জনপ্রিয় লেখক, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ঢাকায় চিকিৎসা শেষে নিজ কর্মস্থল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার পর সেই মুক্তমঞ্চে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থী, সেই সঙ্গে হামলাকারী মহলের উদ্দেশ্যে যে বক্তব্য রেখেছেন তা এখানে তুলে ধরা হলো :

এখানেই বসেছিলাম আমরা, যখন ছেলেটি মেরেছিল আমাকে। অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, তোমরা বিশ্বাস করবে কি না জানি না, আমার মনে কিন্তু তার জন্য বিন্দুমাত্র কোনো প্রতিহিংসা নাই, রাগ নাই। এক ধরনের মায়া আছে, করুণা আছে। সে কেন এটা করেছে? বেহেশতে যাওয়ার জন্য। আমাকে যদি মারতে পারে তাহলে সে বেহেশতে যাবে। যেভাবেই হোক এটা তার মাথার মধ্যে ঢুকানো হয়েছে। তুমি চিন্তা করো একজন মানুষ কত দুঃখী হতে পারে। যার জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আরেকজন মানুষকে হত্যা করে বেহেশতে যাওয়া। এটা কি হতে পারে! পৃথিবীটা কত সুন্দর, জাস্ট তাকিয়ে দেখো চারদিকে। কত সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে, কত ভালোবাসা মানুষের মধ্যে। সেই মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা পৃথিবীর কিচ্ছুই সে জানে না, কিছুই সে দেখে না। সে মনে করে, ওই মানুষটাকে যদি আমি হত্যা করতে পারি তাহলে আমি বেহেশতে যাব। একজন মানুষের ভেতরে কতটুকু কষ্ট থাকলে এরকম হতে পারে। আমি নিশ্চিত, সে ছেলেটি তো একা না আরো হয়তো ছেলেরা আছে। এখানে হয়তো দাঁড়িয়ে আছে এই মুমেন্টে সেরকম কোনো ছেলে। যে নাকি আমার দিকে তাকিয়ে আছে এবং ভাবছে যে পারলাম না আরেকবার একটা এটেম নিতে হবে। তাই তো? শোনো আমি বলি। যদি সেই ছেলেটি থেকে থাকে তাকে বলি, তোমাদের মধ্যে যদি কোনো বিভ্রান্তি থাকে প্লিজ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো। শুধু অস্ত্রটা বাসায় রেখে এসো। সামনাসামনি আমার সঙ্গে কথা বলো, প্লিজ। তোমার মনে যে বিভ্রান্তি আসে সেটা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলো। আই লাইক টু নো, আমি শুনতে চাই। কেন তোমার মনের ভেতরে এত কষ্ট?

 ‘তোমরা আমাকে নাস্তিক বলো, আমি পবিত্র কোরআন শরিফ একেবারে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত খুবই মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আমার চেয়ে মনোযোগ দিয়ে কেউ পড়েছে কি না জানি না। কোরআন শরিফে আছে। হুবহু সঠিকটা বলতে পারব না হয়তো, কিন্তু তা এ রকম—ইফ ইউ কিল আ ম্যান ইউ কিল ম্যানকাইন্ড। তুমি যদি একটা মানুষকে মারো তুমি সমস্ত মানবজাতিকে হত্যা করো। কেউ যদি কোরআন শরিফের সেই লাইনটা পড়ে তাহলে কেমন করে সে আরেকজনকে হত্যা করে? খোদা বলে দিয়েছেন একটা মানুষকে মারা মানে সমস্ত মানবজাতিকে হত্যা করা। কেমন করে তারা এত বড় একটা দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নেয়। কে তোমাদের বিভ্রান্ত করেছে বলো। বুঝাও আমাকে। যারা তোমাদের বুঝিয়েছে তারা নিশ্চিন্ত নিরাপদে আরামে বসে আছে। তাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে। আর তুমি (হামলাকারী) জেলখানায় আছ, তুমি রিমান্ডে আছ, তোমার ভাই রিমান্ডে, তোমার বাবা রিমান্ডে, তোমার মা রিমান্ডে। এটা কি একটা জীবন হলো বলো? তুমি কেন এই জীবন বেছে নিয়েছ? প্লিজ, তোমরা যারা এভাবে চিন্তা করো আসো কথা বলো, সামনাসামনি কথা বলো। একদম আনন্দের সঙ্গে তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি আছি। আমি শুনতে চাই তোমার ভেতরে কী নিয়ে বিভ্রান্তি।

কোরআন শরিফে লেখা আছে, ইফ ইউ কিল্ড এ ম্যান ইউ কিল্ড ম্যানকাইন্ড। এরপরের লাইনটা কী? আরো সুন্দর—ইফ ইউ সেইভ এ ম্যান, ইউ সেইভ দ্য মেনকাইন্ড। একটা মানুষকে তোমরা বাঁচাও সমস্ত মানবজাতিকে তোমরা বাঁচাও। কাজেই আমার ছাত্রছাত্রীরা যারা আমাকে এখান থেকে ধরে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে পাঠিয়েছ তোমরা সমস্ত মানবজাতিকে বাঁচিয়েছ।

‘মোটামুটি এই জায়গাতেই বসে ছিলাম (মুক্তমঞ্চে আক্রমণের স্থান দেখিয়ে)। এখানে আমাকে আঘাত করা হয়েছে। আমি বুঝতে পারিনি যে আমাকে স্ট্যাব করেছে এরকম কিছু। আমার মনে হয়েছে কেউ কিছু দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি দিয়েছে। আমি এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। দাঁড়িয়ে দেখি কয়েকটা মেয়ে চিত্কার করছে পাগলের মতো। আমি বললাম, কিছু হয়নি। বলে হাত দিয়ে দেখি রক্ত। তখন বুঝলাম যে, না কিছু একটা হয়েছে।

আমার প্রথমেই মনে হলো আমার মস্তিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা! যদি হয় তাহলে বেঁচে থেকে আর কী হবে! মানুষের যদি ব্রেনটা না থাকে তাহলে কী নিয়ে বেঁচে থাকবে। কাজেই প্রথমে আমি আমার স্ত্রীকে ফোন করার চেষ্টা করলাম। পাইনি। মেয়েকে ফোন করলাম, কথা বললাম, যে দেখ, আমি চিন্তা করতে পারছি। আমার মাথায় প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে, বাট এখন পর্যন্ত আমি ঠিক আছি। তারপর আমি আমার ব্রেন টেস্ট করা শুরু করলাম। ব্রেন যদি ঠিক থাকে তাহলে আমি সংখ্যার সিকোয়েন্সটা মনে করতে পারবো। আমি শুরু করলাম- ওয়ান, ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ, এইট, ফোরটিন, টুয়েন্টি ওয়ান...। আমি পারছি। যদি স্মৃতি ঠিক থাকে তাহলে নিশ্চয়ই কয়েকটা কবিতা মনে করতে পারব, ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাটিতেছি পৃথিবীর পানে। সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর..। সিরিয়াসলি, আমি গাড়িতে বসে আমার ব্রেন টেস্ট করতে করতে যাচ্ছিলাম। যখন হাসপাতালে নিয়ে গেছে, স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ দেখি একটা ছেলে পাগলের মতো ছবি তোলার জন্য ছুটে আসতেছে। আমি বললাম, আসো আসো একটা সেলফি তুলি। তখন আমার মনে হলো যেহেতু আমার সেন্স অব হিউমার এখনও ঠিক আছে মনে হয় মস্তিস্কটা ঠিক আছে। তারপর মনে হলো যেহেতু প্রচুর ব্লিড করছে, একটা সার্টেন এমাউন্টের বেশি রক্ত যদি বের হয়ে যায় তাহলে তো আমি শকে চলে যাবো। কাজেই সবাই যখন জিজ্ঞাস করছে রক্তের গ্রুপ কি আমি দ্রুত বললাম, এ পস্নাস। শুনলাম সবাই বলছে, ও প্লাস, ও প্লাস। তখন আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বলেছি এ প্লাস, বলছে ও পস্নাস, কি জানি কি হয়। একজন ডাক্তারকে বললাম, প্লিজ টেস্ট না করে রক্ত দিয়েন না। 

খুবই অসাধারণ ডাক্তাররা। আমি তাকিয়ে দেখছি। ডাক্তাররা বলছেন, পিস্নজ বাইরে যান। কারও বাইরে যাওয়ার দিকে খুব একটা আগ্রহ নেই। কান্নাকাটি করছে আমার জন্য। আমি সেই ডাক্তারদের কংগ্রেচুলেট করি, এইরকম প্রেসারের মাঝে ঠাণ্ডা মাথায় উনারা চিকিত্সা করেছেন। আমি একটু বোকাসোকা মানুষ তো আমার কাছে মনে হলো আমাকে যদি জেনারেল এনেস্থেশিয়া দিয়ে দেয়, অজ্ঞান হবো। সেখান থেকে আর কোনদিন জ্ঞান ফিরে পাবো না। আমি উনাদের সাথে তর্ক করছি, খবরদার আমাকে জেনারেল এনেস্থেশিয়া দিতে পারবেন না। জ্ঞান থাকা অবস্থায় আমার ট্রিট করেন। উনারা আমার সাথে মৌখিকভাবে কথা বলেছেন, কিন্তু যেটা করার ঠিকই করেছেন। আমাকে জেনারেল এনেস্থেশিয়া দিয়ে দিয়েছেন। আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছি সেখান থেকে। 

অত্যন্ত সুন্দর কাজ করেছেন। মাথাতে কাজ করতে হলে মাথা ন্যাড়া করতে হয়। ভালোভাবে ন্যাড়া করতে পারেন নাই, একপাশে জুলফি স্টাইলের চুল থাকে না ছেলেদের? ওই রকম চুল ছিল। কাজেই এই যে আমার ন্যাড়া মাথা (ক্যাপ খুলে ন্যাড়া মাথা দেখিয়ে) এই ন্যাড়া মাথাটা পুরাপুরি করতে পারেন নাই। চুল ছিল এদেকি-সেদিকে। সিএমএইচে তারা আচ্ছামতো সেটাকে মুড়িয়ে ন্যাড়া করে দিয়েছেন আমাকে। কাজেই ন্যাড়া মাথায় থাকতে কেমন লাগে সেটা আমি অনুভব করছি এখান থেকে। 

যখন আমি বেঁচে ফেরত আসছি তখন আমার খালি বারবার ঘুরেফিরে অভিজিতের কথা মনে পড়েছে। আমার ছাত্র অনন্তের কথা মনে পড়েছে, নিলয়ের কথা মনে পড়েছে, দীপনের কথা মনে পড়েছে, ওয়াসিফের কথা মনে পড়েছে। হুমায়ুন আজাদ স্যারের কথা মনে পড়েছে, আরো আছেন তো নিশ্চয়ই, সব হয়তো মনে নেই আমার। সব আস্তে আস্তে একটা স্মৃতি হয়ে গিয়েছেন। তাই তো? আমারও নামটা ওদের সাথে যুক্ত হতে পারত। হয় নাই। আমি বেঁচে গিয়েছি।

আমার যারা ঘনিষ্ট তারা নিশ্চয়ই টের পাচ্ছে। কয়েকদিন থেকেই আমি বলছি, আমার খালি বই পড়তে ইচ্ছে করছে। এত চাপ ভালো লাগে না। একটু যদি বই পড়তে পারতাম, একটু যদি উপন্যাস পড়তে পারতাম। বাসা ভর্তি এতো বই, বই পড়তে পারছি না। তারপর হঠাৎ আবিস্কার করলাম যে আমি একটা ঘরের ভেতর আটকা পড়ে আছি। ভেতরে বুঝাও যায় না দিন না রাত। এবং একমাত্র কাজ হচ্ছে আমি শুয়ে শুয়ে বই পড়তে পারি। আমার মাথায় চুল, চুলকাই, চুল বড় হয়, ঘন্টায় ঘন্টায় বড় হয়। ইয়াসমিন বলে বলি চুল আচড়াও, চুল আচড়াও, গুছাইয়া নাও। আমি বলি, ইসসিরে! এই চুলের যন্ত্রণায় তো বাঁচি না। 

আমি সেই প্রথম থেকে বলে আসছি আমাকে ক্যাম্পাসে যেতে হবে। ক্যাম্পাসে গিয়ে আমাদের ছেলেমেয়ের সাথে কথা বলতে হবে। তার একটা কারণও আছে। আমি বলি, ওই যে বিল্ডিং (ভবন দেখিয়ে) তার সামনে ছাত্ররা শিক্ষদের উপর হাত তুলেছিল। ২৩ আগস্ট কোন এক বছর আগে ২০১৫ তে । তখন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আমার ছাত্ররা শিক্ষকের উপর হাত তুলবে। আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। বলি নাই। একবার ভাবলাম যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতে পারে সেখানে থেকে কি হবে চলে যাই। আবার ভাবলাম, চলে গেলে আবার নাটক হবে। আমরা সহ্য করি। আর তো কয়েকটি বছর। আমরা অবসরে চলে যাবো। কাজেই সকাল বেলা আমরা হেটে হেটে আইসিটি বিল্ডিংয়ে ঢুকি, সারাদিন থাকি। যখন অন্ধকার হয়ে যায়, মাথাটা নিচু করে ফিরে যাই বাসাতে। সবকিছু থেকে গুটিয়ে ফেলি নিজেকে। ছাত্র সংগঠন যারা তারা আমার কাছে এসেছে। আমি বলেছি, সরি। আমি তোমাদের যত সংগঠন আছে সব সংগঠনের অফিসে গিয়েছিলাম। এডভাইজার ছিলাম আমি কিন্তু এখন আর এডভাইজার না। তোমরা যদি আমাদের গায়ে হাত তুলতে পারো, তাহলে আমি তোমাদের এডভাইজার না। ছেলেপিলেরা মিনতি করেছে।  আমি একেবারে নিষ্ঠুরের মতো বলেছি, না আমি তোমাদের সাথে থাকব না। একেবারেই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলাম এবং অপেক্ষা করছিলাম কখন অক্টোবর মাস আসে। কখন আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাই। এই ঘটনাটা ঘটার পরে আমি হঠাত্ করে টের পেলাম যে আমি নিশ্চয়ই অনেক বড় নিষ্ঠুরতা করেছি। সেটা বলার জন্য আমি এসেছি যে, দেখো, আমি তোমাদের সাথে আছি, আমি তোমাদের সাথে থাকবো। তোমরা যখন নাটক করবে আমাদের ডাকবে আমরা আবার তোমাদের নাটক দেখতে যাবো। তোমরা যখন গানের অনুষ্ঠান করবে, আমাদের আবার ডেক, আমরা আবার সেই গানের অনুষ্ঠান শুনতে যাবো, তোমরা যখন সায়েন্সের কিছু করবে আমাদের ডেকো আমরা শুনতে যাবে। আমি যে নিষ্ঠুরতা করেছি আমি সেজন্য তোমাদের কাছে ক্ষমা চাই। কিন্তু আমি আশা করি তোমরা নিশ্চয়ই বুঝবে যে একজন শিক্ষক সবচেয়ে বেশি মনে কষ্ট পায় যখন দেখে একজন ছাত্র সেই শিক্ষকের সাথে কোনরকম বেয়াদপি করে কিংবা কোনভাবে তার গায়ে হাত দেয়। কিন্তু আমি জানি তোমরা সেটা আর কখনই করবে না। আমি সেজন্যই ছুটে এসেছি বলার জন্য যে আমি আছি তোমাদের সঙ্গে। তোমাদের সমস্ত ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে আছি।”


মন্তব্য