kalerkantho


মৃত্যুর কারণ যখন সেলফি!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২২:২৭



মৃত্যুর কারণ যখন সেলফি!

বর্তমান বিশ্ব এখন সেলফি রোগে আক্রান্ত। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সেলফি প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। সেলফি নেশায় গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে তরুণরা। সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শেয়ার করে লাইক, কমেন্টস পাওয়ার আশায় তারা বেছে নিচ্ছে ভয়ানক ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহ। কার চাইতে কে কত অভিনব উপায়ে সেলফি তুলে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও  টুইটারে আপলোড করবে তার যেন এক মহাহিরিক লেগেছে তরুণ-তরুণীদের মাঝে। তেমনি আবার সেলফি তুলতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনাও। এই নেশায় মত্ত হয়ে কেউ বেঘোরে মারা পড়ছেন অথবা পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন।

সেলফি আজ এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে, যা সমাজে মহামারি আকার ধারণ করেছে। সেই সাথে বিপজ্জনক জায়গায় সেলফি তুলতে গিয়ে দেশে-বিদেশে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। ২০১৪ সালের মার্চে প্রথম সেলফি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই বছর ১৫ জন, ২০১৫ সালে ৩৯ জন এবং ২০১৬ সালে ৯৮ জন ও ২০১৭ সালে ৪৬ জন সেলফি তুলতে গিয়ে মারা যান। যারা সেলফি তুলতে গিয়ে আত্মহুতি দিয়েছেন, আজ তেমনি কিছু ঘটনা তুলে ধরবো এখানে।

ঘটনা ১ : ২২ সেপ্টেম্বর’১৭ রাজধানী ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোডে রেল লাইনের উপরে চলন্ত ট্রেনের সামনে বসে সেলফি তুলতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে সাদিকুল ইসলাম (২৪) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকাগামী বলাকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় তিনি মারা যান।

ঘটনা ২ : দক্ষিণ কোরিয়ার ২৩ বছর বয়সী এক পর্যটক সেখানে ঢালের খুব কিনারে ছবি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যান প্রায় দুই শ ফুট নিচে। বেশ কয়েকটি মারাত্মক আঘাতের কারণে তিনি মারা যান। তিনি যেখান থেকে নিচে পড়ে যান, সে স্থানটি যে বিপজ্জনক, তা সবাই জানে। পর্যাপ্ত পরিমাণে সাইন বোর্ড সেখানে লাগানো রয়েছে বিষয়টি জানিয়ে যে, কিনারে যাওয়া যাবে না। তার পরেও পর্যটকরা এ স্থানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে খাদের একেবারে কিনারে গিয়ে ছবি তোলে।

ঘটনা ৩ : চীনের চ্যাংশা শহরে সেলফি তুলতে গিয়ে ৬২ তলা ভবন থেকে পড়ে নিহত হয়েছেন উয়ু ইয়ংনিং নামের এক ব্যক্তি। গত ৮ নভেম্বর’১৭ ইয়ংনিংয়ের মৃত্যু হয়। উঁচু ভবনে চড়ার জন্য বেশ জনপ্রিয় ছিলেন ইয়ংনিং। কোনোরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই আকাশচুম্বী ভবনের চূড়ায় উঠতেন তিনি। সেসব মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটেও প্রকাশ করতেন।

ঘটনা ৪ : গত সেপ্টেম্বর’১৭ ভারতের ন্যাশনাল কলেজ অব বেঙ্গালুরুর এক শিক্ষার্থীর পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা আলোড়ন ফেলে। বন্ধুরা যখন সেলফি তুলতে ব্যস্ত ঠিক তখনই পাশে পানিতে ডুবে মৃত্যু ঘটে তার। ওই কলেজের ২৫ শিক্ষার্থী রামা নগরে পিকনিকে গিয়ে এমন মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়। পরে স্থানীয় কাগালিপুরা থানার পুলিশ পুকুর থেকে ১৭ বছরের বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করে।

ঘটনা ৫ : বৃহস্পতিবার (০৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮) সকালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের স্যামসন স্টেশনে বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে মোবাইলে সেলফি তুলতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ওই বন্ধু গুরুতর আহত হয়েছেন। ২৪ বছর বয়সী তরুণী তার ছেলে বন্ধুর সঙ্গে স্যামসেন রেলস্টেশনে রেললাইনের ওপরে সেলফি তুলছিলেন। এমন সময় পাশের লাইন দিয়ে অপর একটি ট্রেন এসে তাদের ধাক্কা দেয়। এতে ওই তরুণীর পা ট্রেনে কাটা পড়ে। পরে ওই তরুণীকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনা ৬ : যমুনা টিভির এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ভারতে অল্প বয়সের একটি ছেলে এক হাতে তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে অন্য হাতে মোবাইল হাতে নিয়ে সেলফি তুলতে পোজ দেয়। মনের ভুলে মোবাইলের ক্যামেরার বাটনে ক্লিক না দিয়ে পিস্তলের ট্রিগারে চাপ দেয়। ফলে ছেলেটি সাথে-সাথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

সেলফি তুলতে গিয়ে এমন অনেক ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত যা হয়তো আমরা জানি না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত তরুণ-তরুণীরা আকর্ষনীয় সেলফির জন্য বেপরোয়া হয়ে এই ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। সামাজিক তথা পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই এই ধরণের কার্যক্রম হচ্ছে। সন্তানের শিক্ষার প্রধম ধাপ হচ্ছে পরিবার। তাই পরিবারের পিতা-মাতার প্রয়োজন তার সন্তানের খোঁজখবর রাখা। সন্তান কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, নাকি সে রাতভর ফেসবুকে চ্যাট করছে? এই বিষয়ে পিতা-মাতাকেই অবগত থাকতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করলে তারা এ বিষয়ে সতর্ক হয়ে উঠবে।

এদিকে সেলফি প্রেমীদেরকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ভারতের পুলিশ প্রশাসন। তাঁরা বলেছেন বিপজ্জনক জায়গায় সেলফি তুলতে দেখলে এবং সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। - ডিএমপি নিউজ



মন্তব্য