kalerkantho


‘কান পেতে রই’

হতাশার আগুন থেকেও উৎসারিত হয় আলো, আশা, আনন্দ

পার্থ সারথি দাস   

২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ২০:৩০



হতাশার আগুন থেকেও উৎসারিত হয় আলো, আশা, আনন্দ

‘কান পেতে রই’-এর মতবিনিময় সভায় পুলিশ সদস্যরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কান পেতে শোনা, চোখ মেলে দেখা থেকে মনের গহিনে চলে নানা রকম খেলা। বহিছে আনন্দধারা। তবু কি আনন্দভেলায় সবাই ভাসতে পারে কিংবা ভাসাতে পারে অন্যকে? ভাবনায় ভাসতে হয় সত্যি, কিন্তু আনন্দে আর ভাসা যায় না সব সময়। জীবনে চলার ছন্দে পতন হলে ডুব দিতে হয় হতাশায়। মন মলিন হয়ে ওঠে, বুক ফাটে, মুখ ফোটে না। বন্ধুর সঙ্গে বিচ্ছেদে তো আর আনন্দে ভাসা যায় না। তবে বিচ্ছেদের করুণ বিউগল বেজে উঠলে পাশে কেউ থাকলে, তার সঙ্গে কথা বলা গেলে সান্ত্বনা মেলে। হতাশার আগুন থেকেও উৎসারিত হয় আলো, আশা, আনন্দ।

বিশ্বকবির মতো ‘মরিতে চাহি না এ সুন্দর ভুবনে’ উচ্চারিত হয় যাদের মুখ থেকে তাদের অনেকে মাঝেমধ্যে রেহাই চায় জীবনের যন্ত্রণা থেকে। জীবন যন্ত্রণায় মৃত্যু কামনা থেকে তাদের উদ্ধার করতে, বিষণ্নতার বিপন্নতা থেকে বাঁচাতে তাদের কথা কান পেতে শুনতে চায় কেউ। যন্ত্রণাদগ্ধদের যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ দিতে পরামর্শ দেয় কেউ। তেমনই একটি উদ্যোগের নাম ‘কান পেতে রই’। দেশের প্রথম মানসিক সহায়তা ও আত্মহত্যা হেল্পলাইন এটি।

‘কান পেতে রই’ পরিচালিত হয় সম্পূর্ণভাবেই ব্যক্তিগত অনুদানে। তহবিল উন্নয়নের লক্ষ্যে এর আগে ২০১৪ সালে তারা এক কনসার্টের আয়োজন করে। একই উদ্দেশ্যে আগামী ২৬ জানুয়ারি তারা আয়োজন করতে যাচ্ছে দ্বিতীয় কনসার্টের।

বন্ধুতার মধ্য দিয়ে মানসিক সেবা দিয়ে যাচ্ছে ‘কান পেতে রই’। হেল্পলাইনের মূল উদ্দেশ্য সমাজের অনেক মানুষের মনের হতাশা, একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা। তাদের মানসিক সমর্থন জোগানো। ‘কান পেতে রই’ গোপনীয়তা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হেল্পলাইনের নম্বর ০১৭৭৯৫৫৪৩৯১, ০১৭৭৯৫৫৪৩৯২, ০১৬৮৮৭০৯৯৬৫, ০১৬৮৮৭০৯৯৬৬, ০১৯৮৫২৭৫২৮৬ ও ০১৮৫২০৩৫৬৩৪।

বাংলাদেশ ছাড়াও আরো ৪০টি দেশে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে মানসিক সহায়তার হেল্পলাইন চালু রয়েছে। কে এর স্বপ্ন দেখেছিলেন? ইয়েশিম ইকবাল। দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের কন্যা তিনি। ‘কান পেতে রই’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহরে এ রকম একটি হেল্পলাইনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতেন ইয়েশিম। তিনিই ‘কান পেতে রই’-এর প্রতিষ্ঠাতা। গত রাতে কাজের ফাঁকে ইয়েশিম ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুরুর পর থেকে এক দিনও আমাদের সেবা বন্ধ থাকেনি। ২৪ ঘণ্টা সেবা খোলা রাখা হলে পূর্ণতা পাবে আমাদের উদ্যোগ। আমার বাবাকে সবাই চেনেন। আমি চাইনি তাঁকে সামনে রেখে এ সেবা সংস্থাটি সামনে যাক, আমরা কর্মের মাধ্যমে পরিচিত হতে চাই। তবে আমার বাবা ও মায়ের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা না পেলে আমি এ সেবা এত দূর নিয়ে আসতে পারতাম না। আমাদের এখানে ৫০-৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়মিত কাজ করছেন। তার বাইরে অনিয়মিত আছেন কমপক্ষে ১০০ জন।  তাঁরাও এগিয়ে নিচ্ছেন এ সংস্থাকে।’

বোস্টনে এ ধরনের কাজ করার সময় ইয়েশিমের মাথায় পরিকল্পনা আসে বাংলাদেশে এ রকম একটি হেল্পলাইন প্রতিষ্ঠার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাড়না থেকেই ২০১২ সালে দেশে ফিরে তিনি ‘কান পেতে রই’ নিয়ে কাজ শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল শুরু হয় হেল্পলাইনটির পথচলা। চার বছরে এটি প্রায় দুই হাজার ৬০০ শিফট পরিচালনা করেছে। ১৩ হাজারের বেশি কল গ্রহণ করেছে।

হেল্পলাইনটির প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বিভাগের প্রধান রুবিনা জাহান রুমি কালের কণ্ঠকে জানান, সাতটি ফোন নম্বরে আগ্রহীরা তাদের সমস্যার কথা শোনাতে পারে। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ফোন করা যায়। আর প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত ফোন গ্রহণ করা হয়। লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, তরুণরাই বেশি সমস্যার কথা জানায়। আসক্তি, বিয়েবিচ্ছেদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে তারা মানসিক স্বাস্থ্যহানির শিকার হয়। আর পরামর্শ পেয়ে সুফলের কথাও জানায় তারা।

হেল্পলাইনে সংশ্লিষ্টজনকে মানসিক সেবা দেওয়া ছাড়াও ‘কান পেতে রই’ আয়োজন করেছে অসংখ্য কর্মশালা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে আয়োজিত কর্মশালা, ওয়ারীতে পুলিশ বিভাগের সঙ্গে কর্মশালা, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কর্মশালা এবং বুয়েট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার। ঢাকার বাইরে রাঙামাটি, খুলনা ও মৌলভীবাজারে স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ে কর্মশালা করেছে তারা। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল ও কাউন্সেলিং বিভাগ যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেছে একটি মানসিক স্বাস্থ্য ডিরেক্টরি, যেখানে ঢাকায় মানসিক সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।

হেল্পলাইনটির উদ্যোগে আগামী ২৬ জানুয়ারি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে রাজধানীর খামারবাড়িতে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অডিটরিয়ামে। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করবেন স্বনামধন্য চার ব্যান্ড শূন্য, নেমেসিস, দৃক ও অর্ণবের শিল্পীরা। অতিথি থাকবেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আয়মান সাদিক, অনিক খানের মতো ব্যক্তিত্ব। স্পন্সর হিসেবে রয়েছে সিলেট সিক্সারস। প্রিন্ট মিডিয়া পার্টনার কালের কণ্ঠ। এ ছাড়া ইয়ুথ এনগেজমেন্ট পার্টনার ডেইলি স্টার, স্টার ইয়ুথ রেডিও পার্টনার এবিসি রেডিও এবং প্রিন্টিং পার্টনার হিসেবে থাকছে সময় প্রকাশনী।

কনসার্টটি উপভোগ করতে চাইলে আগ্রহীদের টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। টিকিটের শুভেচ্ছা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে সাধারণ টিকিট ৬০০ টাকা ও ভিআইপি টিকিট এক হাজার টাকা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য টিকিটের মূল্য ৪০০ টাকা। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে টিকিট সংগ্রহ করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি, পুরান ঢাকা; নওয়াব চাটগাঁ, গুলশান-১; বিটারসুইট ক্যাফে, গুলশান-২; জামিল’স কমিক কালেকশন্স, বনানী; প্রিয় মেজবান, মিরপুর ৬; ফুডগিক, মোহাম্মদপুর; লাইভ কিচেন, ধানমণ্ডি; জর্জেস ক্যাফে, উত্তরা এবং দীপনপুর, শাহবাগ। কনসার্টের আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় যত দ্রুত সম্ভব টিকিট সংগ্রহ করার অনুরোধ করেছেন আয়োজকরা। অনুষ্ঠানটি শুরু হবে বিকেল ৪টায়। এক ঘণ্টা আগে ৩টা থেকে দর্শকদের আসন গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।



মন্তব্য