kalerkantho


'শিশুরা অপরাধ করে না, ভুল করে'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৬:১১



'শিশুরা অপরাধ করে না, ভুল করে'

সকাল বেলা তটিনী’র বাবা মার মধ্যে বেঁধে গেল বাকযুদ্ধ। বাবার প্রশ্ন, ‘কেন তুমি মেয়েকে মারলে?’ মা রুদ্ধরোষে ফেটে পড়ে। ‘তোমার আশকারা পেয়ে মেয়ের দুষ্টামির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।’ জবাবে তটিনীর বাবা বললেন, ‘বাচ্চারা তো দুষ্টুমি করবেই। ওর যে এখন দুষ্টুমির বয়স’। তখন মা আরো তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বলেন, ‘গায়ে হাত না পড়লে ও মানুষ হবে না।’ বাবা স্তব্ধ হয়ে যান। তটিনী’র বয়স ৫ এখনো পার হয়নি। বাড়ির নিকটস্থ একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে নার্সারিতে পড়ে। তার যত দুষ্টামি বাড়ির গন্ডির ভেতরে; বাইরে বা স্কুলে নয়।

গায়ে হাত না পড়লে সন্তান মানুষ হবে না এ ধারণা থেকে অভিভাবকদের বের হয়ে আসতে হবে। শাস্তি, মার, থাপ্পড় শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ না করাই ভালো। কারণ শিশুরা অপরাধ করে না; ভুল করে। 

বাচ্চারা দুষ্টুমি করেছে, করবে। এখানে কোনো ব্যারিকেড নয়। তবে ওরা দুষ্টুমি করলে, বাবা-মা শাসন করবে- এটাও স্বাভাবিক। সবচেয়ে জরুরি হলো শিশুকে আদর করা। সে যেন কোনোভাবেই বুঝতে না পারে যে, সে ভালোবাসা পাচ্ছে না; ভালোবাসা থেকে সে বঞ্চিত হচ্ছে। সন্তানের প্রতি আদর-সোহাগ, ভালোবাসা বাবা-মায়ের স্বাভাবিক আবেগ। 

সম্প্রতি ব্লাস্ট ও সেভ দ্য চিলড্রেনের উদ্যোগে আয়োজিত 'শিশুর অধিকার সুরক্ষায় শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসন’ বিষয়ে এক গণশুনানি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, ‘শিশুদের শাস্তি নয়, ভালোবাসা দিয়ে বোঝাতে হবে। ভুল শুধরে দেয়ার মানসিকতা আমাদের মধ্যে তৈরি করতে হবে।'

একই অনুষ্ঠানে জুরিবোর্ডের সদস্য গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, 'যারা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেন, তারা নিজেরাইবা কতটুকু সচেতন, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আর শারীরিক নির্যাতন বন্ধ হলেও মৌখিকভাবে নির্যাতন বন্ধ হয়নি।' 

গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, অভিভাবকদের ৫৫ শতাংশ মনে করেন, শাস্তি শিশুকে ভালো পথে নিয়ে যায়। ২৭ শতাংশ মনে করেন, শাস্তি না হলে শিশুরা বখে যায় এবং ২৫ শতাংশ মনে করেন, শাস্তি দিলে শিশুরা শিক্ষকদের কথা শোনে। তাই এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের এগিয়ে আসতে হবে। শিশুদের মানসিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাদের সাথে মিশে যেতে হবে।

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়; ওরা সাধারণত বড়দের দেখেই শেখে এবং অনুকরণ করে। জোর করে ওদের কিছু শেখানো যায় না। তাই তাদের ভালো-মন্দ বোঝার সুযোগ দিতে হবে। তাদের সামনে শিক্ষক ও বাবা-মাকে যেমন ধৈর্য্য নিয়ে থাকতে হবে তেমনি হতে হবে সচেতন। বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে শিশু তার চারপাশে দেখা মা-বাবা, নিকটাত্মীয়দের মাঝেই আদর্শ খোঁজে। তাই শিশু যাতে সঠিক আদর্শের সন্ধান পায়, সে জন্য তাকে সহায়তা করতে হবে। 

শাসনের বেড়াজালে আটকে নয়; আদর আর শাসনের সঠিক ব্যালেন্স রেখে শিশুকে বড় করতে হবে। তার সাথে বন্ধুর মতো মিশতে হবে; তার সব কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। শিশুকে বুঝাতে হবে। শাসন করে নয়; আদর-সোহাগ দিয়ে ভালো-মন্দ শেখাতে হবে। বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে একটু ভালোবাসা দিয়ে ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে; তবেই লক্ষ্মীসোনার মতো কথা মেনে নেবে।

প্রবাদ আছে শিশু-কিশোররা উপদেশ শোনার সময় কান বন্ধ রাখে, কিন্তু দৃষ্টান্ত যখন দেখে তখন চোখ দুটো খুলে রাখে। প্রকৃতিগতভাবেই যারা শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে তাদের প্রতি শিশুর ভালোবাসা জন্মায় না। তাদের সাথে সহযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে; আদর, ভালোবাসা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে শিশুর সাথে সম্পর্ক তুলতে পারলে সে সম্পর্কই হয় স্থায়ী, দৃঢ় ও অটুট। জনপ্রিয় অভিনেতা বিল কসবি বাবার স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, তার উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করাকে নিরুৎসাহিত করতেন এবং পাশাপাশি সুন্দরভাবে বলার জন্য উৎসাহিত করতেন। 

‘সন্তানকে ভালোবাসা দিন। তার চেয়েও বেশি করে সন্তানকে ভালো হওয়ার সুশিক্ষা দিন’- প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার কথাটি অনেকেরই স্মৃতিতে আজো অম্লাল। সন্তানের পেছনে সঠিক সময়ের পরিশ্রম এনে দেবে সুফল আর অবলোয় মিলবে কান্না। বাচ্চারা তো দুষ্টুমি করবেই আর সে দুষ্টুমি যদি ক্ষতিকর না হয়, তবে তা দেখেও না দেখার ভান করে থাকাই শ্রেয়। সবার মধ্যে তাদের সাথে মিলেমিশে বড় হবে সন্তান; সে যেন কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে বড় না হয় সে খেয়াল রাখতে হবে।



মন্তব্য