kalerkantho


সৌদি আরবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলো

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ২১:৫৭



সৌদি আরবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলো

বর্তমান রাজা সালমান বিন আব্দুল আজিজের সিংহাসনে আরোহনের পর থেকেই গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবে দ্রুত গতিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে চলেছে। যা মূলত ওই রাজতান্ত্রিক দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনরায় ঢেলে সাজানোর জন্যই একটি প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে।

তবে এ ক্ষেত্রে রাজা সালমান বিন আব্দুল আজিজের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানের সিংহাসনে বসার বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং এরপর স্থিতিশীলতা বজায় থাকাকে সবেচেয়ে বেশি গুরত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন রাজা আব্দুল আজিজ আল সৌদের প্রথম নাতী।

এই লক্ষ্য অর্জনে সৌদি আরবের বর্তমান সরকার প্রচুর ধারাবাহিক পরিবর্তন এনেছে। যার সবগুলোর লক্ষ্য হলো একটাই। মোহাম্মদ বিন সালমানের হাতে সব ক্ষমতার উৎস কেন্দ্রীভুত করা। রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তার ফ্রন্টে উত্তারাধীকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়েছে তার বাবা সিংহাসনে বসার পরপরপই। এরপর সাবেক উত্তরাধীকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সিংহাসনের উত্তারধীকারী যুবরাজের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। আর সবশেষে যুবরাজ মোতালিব বিন আব্দুল আজিজকেও ন্যাশনাল গার্ড এর নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

যাতে সৌদি রাজতন্ত্রের তিনটি প্রধান নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান- সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নতুন উত্তরাধীকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একক নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে আসা যায়। বিস্তৃত রাজ পরিবারের আর কোনো প্রভাবশালী যুবরাজকে প্রতিদ্বন্দ্বীতার সুযোগ না দিয়েই।

অর্থনৈতিক ফ্রন্টে, ২০০-র বেশি সৌদি যুবরাজ এবং ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে। আর তাদের ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের সম্পদ আটক করা হয়েছে। সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেল এই হিসেব দিয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের অনেকে আরবী ভাষার বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ মিডিয়া হাউজেরও মালিক। যার মধ্যে আছে আল আরাবিয়া এবং রোটানা টেলিভিশন চ্যানেল দুটিও। এর ফলে মোহাম্মদ বিন সালমানের হাতে আরো বেশি অর্থনৈতিক এবং গণমাধ্যম ক্ষমতা চলে আসল।

ধর্মীয় ফ্রন্টে, কয়েকডজন প্রভাশালী ধর্মতাত্বিক এবং শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটিতে ধর্মীয় পুলিশের কতৃত্বও কমানো হয়েছে। এর পাশাপাশি কিছু গুরুতর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও আনা হয়েছে। যেমন নারীদেরকে গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ছুটির দিনগুলোতে গণ উদযাপন এবং বিনোদন উৎসব আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

উত্তরাধীকারী যুবরাজের হাতে বেশিরভাগ ক্ষমতার উৎস তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যে আরো বড় কিছু করার প্রচেষ্টা আছে বলেই মনে হচ্ছে। আর তা হলো, সৌদির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনরায় ঢেলে সাজানো। এর জন্য এমনকি দরকার হলে সৌদি রাজনৈতিক সিস্টেমের অতীতের মৌলিক নীতিমালাও লঙ্ঘন করা হবে। অতীতের এমন মৌলিক নীতিমালার একটি হলো নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সম্পদ আল সৌদ রাজবংশের নানা শাখার মধ্যে এমনভাবে বিতরণ করে দেওয়া যাতে কেউই একা নিজের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারেন। এর মধ্যে আরেকটি নীতি ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমুহের সমর্থনের ওপর নির্ভর করা। এবং এমন একটি রেন্টিয়ার স্টেট যেটি তেলের রাজস্ব বিতরণের মাধ্যমে সৌদি জনগনের আনুগত্য এনে দিত।

একটি বিষয়ের উল্লেখ দরকার যে, মোহাম্মদ বিন সালমান সামনের বছরগুলোতে সৌদি অর্থনীতির আধুনিকায়নের কথা বলেছেন। এর জন্য নানা খাতে প্রাইভেট কম্পানিগুলোকে একটি বড় ভুমিকা পালন করতে দেওয়া হবে। বিশেষ করে তেলের ব্যবস্থাপনায় ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা হবে। কেননা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরামকো-কে আন্তর্জাতিক বাজারে আনতে চাইছেন আগামী বছর থেকেই। আন্তর্জাতিক বাজারও এর জন্য অপেক্ষা করছিল। এটি তাদের জন্য অনেকটা একটি চুক্তি বা সুযোগের মতোই।

এই বড় পরিবর্তনগুলোর ভবিষ্যত বুঝার জন্য, এগুলো সফল হবে কি হবে না, এবং রাজতন্ত্র ও এর রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য এদের কার্যকারিতা বুঝার জন্য, এই পরিবর্তনগুলোর চরিত্র এবং পরিপ্রেক্ষিতের দিকে নজর দিতে হবে। যা থেকে পাঁচটি বিষয় বেরিয়ে এসেছে:

প্রথমত, এই পরিবর্তনগুলো প্রায় পুরোপুরি গোপনীয়তার সঙ্গে করা হচ্ছে। কখনো কখনো করা হচ্ছে আচমকা, বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিবর্তন গুলোর ক্ষেত্রে। এর কারণ মূলত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকা। যার মাধ্যমে হয়তো একদিকে স্বচ্ছতাও বজায় রাখা যেত এবং অন্যদিকে, আশ্বস্ত করা যেত। এর ফলে এসব পরিবর্তন এবং তাদের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো কিছু আগাম অনুমানও কঠিন হয়ে পড়ছে। এবং দেশের ও দেশের বাইরের পর্যবেক্ষকদেরকে দীর্ঘ মেয়াদে আশ্বস্ত করার সুযোগও হাতছাড়া হয়ে পড়ছে। কীভাবেই বা তারা আশ্বস্ত হবেন যখন এত দ্রুত এবং গোপনে এমন বড় বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে?

দ্বিতীয়ত, এই ধারবাহিক পরিবর্তন, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া এবং সৌদি রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরায় ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি রাজীনৈতিক উদারতা বা প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্র গঠনের কোনো প্রচেষ্টা করা হচ্ছে না। বরং এই পরিবর্তনগুলো বিপরীত দিকে ছুটে চলেছে। সৌদি রাজপরিবারের গণ্ডির মধ্যেই যে সীমিত বহুত্ববাদ এবং বৈচিত্র ছিল তাও বিলুপ্ত করা হয়েছে। আগে যেখানে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী যুবরাজ মিলে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করত সেখানে এখন এই সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হচ্ছে শুধু রাজার হাতে। সিদ্ধান্ত প্রণয়নে বৈচিত্র হরণের ফলে সৌদি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এখন আর বৈচিত্রময় প্রকাশের সুযোগ একেবারেই কমে এসেছে।

তৃতীয়ত, পরিবর্তনগুলো হচ্ছে খুবই অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে এবং ব্যাপক পরিসরে। এবং প্রায়ই কোনো শক্তিশালী আভ্যন্তরীন প্রতিক্রিয়াও থাকছে না। সিংহাসনের সাবেক উত্তরাধীকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে যখন সরিয়ে দেওয়া হয় তখন কোনো প্রতিরোধের চিহ্নও দেখা যায়নি। তেমনিভাবে বেশ কয়েকজন ধর্মতাত্বিক এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং সম্পদশালী যুবরাজদের গ্রেপ্তারের পরও কোনো প্রতিরোধ হয়নি। এটি খুবই বিস্ময়কর এবং এ থেকেই সৌদি রাজতন্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে এতসব পরিবর্তনের ভার বহন করতে পারবে তো সৌদি রাষ্ট্র? এছাড়া এই পরিবর্তনের গতি নিয়ন্ত্রণ বা পথ প্রদর্শন বা এর ব্যাপকতা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকার কারণেও সৌদি রাজতন্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আপাত দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধ না থাকার ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং ইতিবাচক বা নেতিবাচক যে কোনো দিকেই পরিবর্তনও অনিবার্য হয়ে উঠেছে। একে আর থামানো যাবে না।

চতুর্থত, তার মানে এই নয় যে এইসব পরিবর্তনের সামনে কোনো বিরোধীতা নেই। এসবের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো, তেলের দাম কমে যাওয়া, বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া এবং সৌদি অর্থনীতির ব্যাক্তিমালিকানায়ন এর মতো খুবই কঠিন সব চ্যালেঞ্জ। এছাড়া সৌদি আরব ইয়েমেনে এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে উত্তপ্ত আঞ্চলিক বিরোধীতায় জাড়িয়ে পড়েছে। আর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আছে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো। রাজপরিবারের যে সদস্যরা এই পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারাও অন্তত কিছুটা বিরোধীতা করছেন।

পঞ্চমত, এই পরিবর্তনগুলোর পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্পষ্টত ব্যক্তিগত সমর্থণ রয়েছে। যিনি রাজা সালমান ও উত্তরাধীকারী যুবরাজের পদ্ধতি পছন্দ করেছেন। তবে এটাও পরিষ্কার যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সমর্থণের ফলে যে আমেরিকানরা দীর্ঘ মেয়াদে তাদেরকে সমর্থন দিবেন এমনটা নয়। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরও এখনো যথেষ্ট সমর্থণ জানায়নি। যার একটি বড় নজির হলো কাতার সংকট। কাতার ইস্যুতে পুরোপুরি মার্কিন সমর্থণ পায়নি সৌদি আরব।

ওপরে উল্লেখিত ইস্যুগুলোর যৌক্তিক পরিণতি হলো, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের ফলে দায়িত্বেরও কেন্দ্রীভবন ঘটবে। এবং সৌদি রাজতন্ত্রে যা কিছু ঘটে চলেছে তার পূর্ণ দায়িত্বও বর্তাবে শুধু উত্তরাধীকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর। যারা এই নীতিসমুহের বিরোধীতা করেছে ভবিষ্যতে তাদেরকে এটা বুঝানো অসম্ভব হয়ে পড়বে যে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রাজ পরিবার বা প্রজাদের মধ্য থেকে কোনো বিরোধী পক্ষের প্রতিরোধের কারণেই সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং এই সবগুলো শক্তির ওপর যুবরাজের কতৃত্ব ক্রমাগত বেড়ে চলার ফলে তিনি একাই যা কিছু ঘটছে তার জন্য দায়ী থাকবেন।

অবশ্য, তিনি হয়তো সফলও হতে পারেন এবং এমন নতুন কোনো লৌহ কঠিন শাসন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতাও হয়ে উঠতে পারেন। যেখানে সম্পদ এবং ক্ষমতা শুধু রাজার হাতেই কুক্ষিগত থাকবে, শাসক পরিবারের হাতে নয়।

তবে এই ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই যে, সফলতা এত সহজেই ধরা দিবে না। কেননা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে অত্যন্ত কঠিন কিছু আভ্যন্তরীন এবং বহিরাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমেই তাকে তেলের দাম কমে যাওয়ার ফলে বিধ্বস্ত হয়ে পড়া সৌদি অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার চরম কঠিন একটি কাজ করতে হবে। এছাড়া তাকে দ্রুতগতির সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় পরিবর্তনের ফলাফলও মোকাবিলা করতে হবে। নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবং আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তি, বিশেষ করে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরন ঠেকাতে হবে।

একই সময়ে তাকে কঠিন সব বহিরাগত চ্যালেঞ্জসমুহ মোকাবিলা করতে হবে। যেমন, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, উপসাগরীয় সংকট এবং ট্রাম্প পরবর্তী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। আর তাকে অবশ্যই কোনো ধরনের রাজনৈতিক ভোগান্তি এবং কুটনৈতিক ক্ষতি ছাড়াই এসব মোকাবিলা করতে হবে যা তার আভ্যন্তরীন ইমেজকে দূর্বল করবে।

এর পাশাপাশি ক্ষমতা ও দায়-দায়িত্বের কেন্দ্রীভবন এবং বিরোধীতা ও পরিবর্তন শুষে নিতে সক্ষম বৈচিত্রময়তা এবং প্রতিষ্ঠানহীনতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নতুন সিস্টেমটাকেও বজায় রাখার দায়িত্ব পড়বে তার একার ওপরই। ক্ষমতা ও কতৃত্বের কেন্দ্রীভবন একে আয়ত্বে আনার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু, দায়িত্বের কেন্দ্রীভবন বিরোধীদের অসন্তোষকেও কেন্দ্রীভুত করে। আর বৈচিত্র বিলুপ্ত করার কারণে বিরোধীপক্ষ এবং সরকারের মধ্যেও শান্তিপূর্ণভাবে পরিবর্তনের সুযোগ রহিত হয়।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানিক দূর্বলতার কারণে ফের নাটকীয় কোনো পরিবর্তনের দরজাও খুলে যায়, যদি বিরোধীরা পর্যায়ক্রমে নিজেদেরকে সংঘবদ্ধ করতে পারে, এমনকি কিছুটা সময় পরে হলেও। প্রতিটি সিস্টেমেরই নিজস্ব কিছু চরিত্র আছে।

আরও পড়ুন: সৌদি আরবও কি ‘মধ্যপ্রাচ্যের রুগ্ন ব্যক্তি’ হতে চলেছে?

 


মন্তব্য