kalerkantho


ফারাক্কা বনাম সর্দার সরোবর ড্যাম : কত মূল্য দিতে হলো জনগণকে?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২০:০৮



ফারাক্কা বনাম সর্দার সরোবর ড্যাম : কত মূল্য দিতে হলো জনগণকে?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঁধ, গুজরাটের নর্মদা জেলায় সর্দার সরোবর ড্যামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। এ বাঁধের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে সে অঞ্চলে প্রচুর আন্দোলন হয়েছে।

ফারাক্কা বাঁধ যেমন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অবর্ণনীয় প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে তেমনটা আশঙ্কা করছেন এ বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরাও।   বাংলাদেশের সীমান্ত  থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে পদ্মা নদীর উজানে ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ভারত। এরপর একতরফাভাবে পানি নিজ দেশের অভ্যন্তরে ফিডার ক্যানেল দিয়ে নিয়ে যায় ভারত।

ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদীসহ ৪০টি নদ-নদী নাব্যতা হারিয়ে হয়ে পড়েছে পানিশূন্য। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল হয়ে পড়েছে বিরানভূমি। ফারাক্কা প্রভাবের ফলে বন্যায় যেমন ভাসতে থাকে সমগ্র এলাকা, তেমনি বন্যা শেষ হলেই মরুভূমিতে পরিণত হয় পদ্মা নদী ও আশপাশের এলাকা।

ভারতের নর্মদা নদীর ওপর নির্মিত এ বাঁধটির আশপাশের অধিবাসীরাও অনুরূপ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করছেন বহুদিন ধরে। তার প্রমাণও পাওয়া গেছে বাঁধটি উদ্বোধনের মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে। এ সময় নর্মদা নদীর জলসীমা বৃদ্ধি পেয়ে মধ্যপ্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা ও বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেত্রী মেধা পাটেকর, পরিবেশগত ঝুঁকি আর মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হওয়ার যুক্তিতে যিনি আগাগোড়াই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছেন, তিনি এদিন মধ্যপ্রদেশের বারওয়ানি জেলাতে এই ড্যামের বিরুদ্ধে 'জল সত্যাগ্রহ' আন্দোলন করেছেন।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির এদিন ছিল ৬৭তম জন্মদিন। নিজের জন্মদিনে তিনি যে প্রকল্পটি জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করলেন - তাতে নর্মদা নদীর ওপর ওই ড্যামের উচ্চতা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩৮ মিটার।
এর ফলে ওই জলাধারের ধারণক্ষমতা ১২.৭ লক্ষ কিউবিক মিটার থেকে বেড়ে হবে ৪৭.৩ লক্ষ কিউবিক মিটার।

ভারত সরকার দাবি করছে, এই পানি একটি ক্যানাল নেটওয়ার্কের মধ্যে দিয়ে গুজরাটের প্রায় নয় হাজার গ্রামে পৌঁছে দেওয়া হবে, আর তাতে সেচের পানি পাবে ১৮ লক্ষ হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি।
সর্দার সরোবর ড্যামে উৎপাদিত বিদ্যুৎ মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট - এই তিন রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথায়, "মা নর্মদার পানি দেশের লক্ষ লক্ষ নাগরিকের জীবনকে চিরতরে পাল্টে দেবে। "

কিন্তু ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের যে কর্মীরা বহু বছর ধরে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন তারা একমত নন। বরং এই সর্দার সরোবর ড্যাম লক্ষ লক্ষ গ্রামবাসীকে আশ্রয়হীন করেছে বলেই তাদের দাবি।

'নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে'র নেতৃত্ব বলছেন, এই প্রকল্পের ফলে বাস্তুচ্যুত মধ্যপ্রদেশের ১৯০টি গ্রামের চল্লিশ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসনের আওতাতেই আনা হয়নি। যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো গড়া হয়েছে সেগুলোও বাসের অযোগ্য।

শুক্রবার যখন ড্যামের উচ্চতা বাড়িয়ে ১২৮.৩ মিটার করা হয়, তখনই মধ্যপ্রদেশের নিসারপুর শহর ও আশেপাশের বহু গ্রাম জলমগ্ন হয়ে পড়ে।

সর্দার সরোবর ড্যাম এভাবে বহু গ্রাম-শহর-জনপদকেই চিরতরে দেশের মানচিত্র থেকে মুছে দিয়েছে বলে অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন।

ফারাক্কা বাঁধের ফলে ক্ষতির সম্মুখীন বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ। ভারতেরও কিছু অংশে বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী এ বাঁধ।

ফারাক্কার সবচেয়ে বড় যে প্রভাবটি পড়েছে, তা হলো মরুকরণ। পদ্মার পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের উত্তর অববাহিকায় বিশেষ করে রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ ভূগর্ভস্থ পানির প্রথম স্তর ৮-১০ ফুট জায়গা বিশেষে ১৫ ফুট নীচে নেমে গেছে। ফলে পানির অভাবে মাটির আদ্রতা শুষ্ক মওসুমে ৩৫% কমে গেছে। পানি প্রবাহের এমন করুণ অবস্থা থেকে সৃষ্ট হয় মরুকরণ প্রক্রিয়া। যা এই অঞ্চলের জনগণ প্রত্যক্ষ করছেন।

ফারাক্কা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গঙা নদীর (পদ্মা) প্রবাহে চরম বিপর্যয় ঘটে। প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর নাব্যতা কমে যায়। বহু নদীতে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের মাটির লবনাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফারাক্কার প্রভাবে কৃষির সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হয়। পানির স্তর অনেক নেমে যাওয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের জি-কে সেচ প্রকল্প মারাত্বক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পানি অপসারণের ফলে পদ্মা ও এর শাখা-প্রশাখাগুলোতে মাছ কমে গেছে এবং বহু জেলে বেকার হয়ে পড়ে।

ফারাক্কার প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ৩২০ কিলোমিটারের বেশি নৌপথ নৌ-চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে, কয়েক হাজার লোক বেকার হয়ে পড়ে, নৌ-পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে ভূ-অভ্যন্তরের পানির স্তর বেশিরভাগ জায়গায়ই তিন মিটারের বেশি কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, শিল্প, পানি সরবরাহ ইত্যাদির উপর।

শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও ফারাক্কার জেরে গঙ্গার উজানে যে পলি পড়া শুরু হয়েছে, তারে জেরে প্রতি বছরই বর্ষার মরশুমে বন্যাকবলিত হয়ে পড়ছে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের একটা বিস্তীর্ণ অংশ। এ কারণে বহুদিন ধরেই মালদহ-মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গা তীরবর্তী দুর্ভোগ ও বিপর্যয়কবলিত মানুষ ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। এছাড়া বিহার রাজ্য সরকারের দাবি, ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রায় প্রতি বছরই বিহারে বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।

সর্দার সরোবর ড্যামের বিতর্কও আজকের নয়। বস্তুত ১৯৬১ সালে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু যখন এই প্রকল্পের শিলান্যাস করেন তখন থেকেই এই বিতর্কের শুরু। প্রকল্পটিকে ঘিরে বিতর্ক ছিল বলেই ১৯৮৭ সালের আগে এর নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি।

এদিন প্রকল্পের চূড়ান্ত পর্যায়টির উদ্বোধন করার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্য দাবি করেছেন, এই ড্যামের বিরুদ্ধে বিপুল অপপ্রচার ও মিথ্যা ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে। কিন্তু আসলে এটি হলো প্রযুক্তিগত একটি বিস্ময়!

ফারাক্কা বাঁধের সঙ্গে সর্দার সরোবর ড্যামের একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, ফারাক্কা বাঁধের পানি প্রত্যাহারজনিত ক্ষতিকর বিষয়টি মূলত বাংলাদেশের ওপর পড়ে। আর বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ভারত সরকারের সেভাবে মাথা না ঘামালেও চলে। অন্যদিকে সর্দার সরোবর ড্যামের উজান-ভাটির লোকজন ভারতীয় হওয়ায় তাদের মতামতের দিকে কিছুটা হলেও গুরুত্ব দিতে হয় ভারত সরকারকে।

তথ্যসূত্র : কালের কণ্ঠের পুরনো সংখ্যা, বিবিসি বাংলা ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন


মন্তব্য