kalerkantho


বিদ্যুৎ বাতির প্রকৃত উদ্ভাবক কে?

সর্বশেষ অগ্রগতি স্মার্ট বাল্ব

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ আগস্ট, ২০১৭ ১৪:০৬



বিদ্যুৎ বাতির প্রকৃত উদ্ভাবক কে?

যদিও মার্কিন বিজ্ঞানী থমাস এডিসনকে বিদ্যুৎ বাতি উদ্ভাবনের কৃতিত্ব দেওয়া হয় তথাপি তিনি ছাড়াও আরো অনেক এই বিপ্লবী প্রযুক্তিটি উদ্ভাবনে অবদান রেখেছেন। আরো অনেকেই ইলেকট্রিক ব্যাটারি, ল্যাম্প এবং বাল্ব উদ্ভাবনে অবদান রেখেছেন।

প্রাথমিক গবেষণা এবং অগ্রগতি
১৮৭৯ সালে থমাস এডিসন প্রথম বাণিজ্যিকভাবে সফল বাল্ব এর প্যাটেন্ট করার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে বিজলি বাতির গল্প। ১৮০০ সালে ইতালিয়ান উদ্ভাবক আলেসান্দ্রো ভোল্টা সর্বপ্রথম বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবহারিক প্রণালি- ভোল্টেইক পাইল উদ্ভাবন করেন। ভোল্টার আলোক বিচ্ছুরণকারী তামার তারটি বিদ্যুৎ বাল্ব এর প্রথম নিদর্শন হিসেবেও বিবেচিত হয়।

লন্ডনের রয়েল সোসাইটিতে ভোল্টার উপস্থাপনের পরপরই ১৮০২ সালে ইংরেজ রসায়নবিদ হাম্ফরি ডেভি বিশ্বের প্রথম ইলেকট্রিক ল্যাম্প আবিষ্কার করেন। ডেভির ১৮০২ সালের আবিষ্কার ইলেকট্রিক আর্ক ল্যাম্প নামে পরিচিত ছিল। এর দুটি কার্বন রডের মাঝখানে নির্গত উজ্জ্বল আর্ক আলোর কারণে এর এমন নামকরণ করা হয়েছিল।

কিন্তু এই বাতিটি এত বেশি তাড়াতাড়ি পুড়ে যেত এবং এর আলো এত বেশি উজ্বল ছিল যে সেটি ঘর কিংবা কর্মস্থলে ব্যবহারের উপযোগী ছিল না। কিন্তু ডেভির আর্ক লাইট এর মূলনীতিগুলোই পুরো ১৮ শতকজুড়ে আরো অনেক বিদ্যুৎ বাতি এবং বাল্ব উদ্ভাবনে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

১৮৪০ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ওয়ারেন ডে লা রু তামার জায়গায় কয়েলের মতো পেঁচানো প্ল্যাটিনাম ফিলামেন্ট ব্যবহার করে একটি বাল্ব উদ্ভাবন করেন।

কিন্তু প্লাটিনামের দাম বেশি হওয়ায় তার ওই উদ্ভাবনটি বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি।
১৮৪৮ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী উইলিয়াম স্ট্যাইটে প্রচলিত আর্ক ল্যাম্পের আয়ুষ্কাল বাড়াতে সক্ষম হন। কিন্তু সেটিও ব্যয়বহুল হওয়ায় বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি।

জোসেফ সোয়ান বনাম থমাস এডিসন
১৮৫০ সালে ইংরেজ রসায়নবিদ জোসেফ সোয়ান আগের উদ্ভাবিত বিদ্যুৎ বাতিগুলোর খরচ কমাতে সক্ষম হন। ১৮৬০ সালে তিনি এমন একটি বিদ্যুৎ বাতি উদ্ভাবন করেন যাতে কার্বনযুক্ত কাগজের ফিলামেন্ট ব্যবহার করা হয়। ১৮৭৮ সালে জোসেফ সোয়ান ইংলেন্ডে তার উদ্ভাবিত বিদ্যুৎ বাতির প্যাটেন্ট করান। ১৮৭৯ সালে সোয়ান এক ইংল্যান্ডের নিউক্যাসেলে এক লেকচারে তার উদ্ভাবতি বিদ্যুৎ বাতির প্রদর্শনী করেন। আগের উদ্ভাবকদের মতো সোয়ানও তার ফিলামেন্টগুলোকে একটি ফাঁপা টিউবের মধ্যে স্থাপন করেন যাতে অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসতে না পারে। কিন্তু সে সময়কার ফাঁপা টিউবগুলো আজকের দিনের মতো কার্যকরী ছিল না।

থমাস এডিসন বুঝতে পারলেন যে সোয়ানের ডিজাইনের সমস্যাটি হলো এর ফিলামেন্টের মধ্যে। এডিসন বুঝতে পারেন উচ্চ বিদ্যুৎ প্রতিরোধী ক্ষমতা সম্পন্ন একটি পাতলা ফিলামেন্ট তৈরি করতে পারলেই সবচেয়ে বেশি কাজ হবে। এমন একটি পাতলা ফিলামেন্ট অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎেই অনেক বেশি আলো দিবে।

১৮৭৯ সালের ডিসেম্বরে এডিসন তার বিদ্যুৎ বাতির প্রদর্শনী করেন। এরপর ইংল্যান্ডেই তিনি একটি ইলেকট্রিক লাইটিং কম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।

ওদিকে জোসেফ সোয়ান তার বিরুদ্ধে প্যাটেন্ট জালিয়াতির মামলা ঠুকে দেন। যেহেতু সোয়ানই আগে প্যাটেন্ট করেছিলেন সেহেতু তার দাবিই বেশি শক্তিশালী ছিল। ফলে এডিসন সোয়ানকে তার কম্পানির অর্ধেক মালিকানা দিতে বাধ্য হন। পরে তারা কম্পানির নাম বদলে রাখেন এডিসন-সোয়ান ইউনাইটেড। এটি পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বাল্ব উৎপাদনকারী কম্পানিগুলোর একটি হয়।

এরপর ১৮৭৪ সালে হেনরি উডওয়ার্ড এবং ম্যাথিউ ইভানস নামে কানাডার দুই উদ্ভাবক একটি বিদ্যুৎ বাতির প্যাটেন্ট করেন। তাদের বাতিটি একুট ভিন্ন ছিল- নাইট্রোজেনপূর্ণ একটি গ্লাস সিলিন্ডারে ইলেকট্রোডস এর মাঝে ভিন্ন ভিন্ন আকারের কার্বন রড লাগিয়ে বানানো হয় তাদের বিদ্যুৎ বাতিটি। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে না পেরে তারা তাদের প্যাটেন্ট থমাস এডিসনের কাছে বিক্রি করে দেন ১৮৭৯ সালে।

১৮৮০ সালে এডিসন নিউইয়র্কে এডিসন ইলেকট্রিক ইলুমিনেটিং কম্পানি নামে আরেকটি নতুন কম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। জে. পি. মরগ্যানের মতো সম্পদশালী বিনিয়োগাকারীদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পান তিনি। কম্পানিটি প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদন স্টেশন নির্মাণ করে। নিউ ইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের পার্ল স্ট্রিটে ১৮৮২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদন স্টেশন যাত্রা শুরু করে। উইলিয়াম সয়ার এবং অ্যালবন ম্যান নামের দুই উদ্ভাবকও এডিসনের কম্পানির সঙ্গে যোগ দেয়। এবং জেনারেল ইলেকট্রিক নামের একটি কম্পানি তৈরি করে।

টাঙস্টেন ফিলামেন্ট
এরপর কম্পানিটি ১৯০৩ সালের মধ্যে সত্যিকার অর্থেই চারদিক আলোকিত করতে সক্ষম বিদ্যুৎ বাতি বানাতে সক্ষম হয়। ১৯১০ সালেরর মধ্যে টাঙস্টেন ফিলামেন্ট উদ্ভাবন করে জেনারেল ইলেকট্রিকের গবেষকরা।

এলইডি লাইট
বর্তমানে এলইডিকেই বিদ্যুৎ বাতির ভবিষ্যত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এতে অনেক কম শক্তি খরচ হয়। ফলে বিদ্যুৎ বিলও আসবে কম। আর এই প্রযুক্তি অনেক বেশি টেকসইও বটে।

১৯৬০ সালে জেনারেল ইলেকট্রিক এর এক মার্কিন বিজ্ঞানী হলোন্যাক লেজার তৈরির চেষ্টা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাক্রমে এলইডি লাইট আবিষ্কার করে ফেলেন। ২০ শতকের শুরুর দিক থেকেই এই ধরনের প্রযুক্তি কম বেশি উদ্ভাবকরা ব্যবহার করেছেন। কিন্তু হলোন্যাক প্রথম বিজ্ঞানী যিনি লাইট ফিক্সার হিসেবে এর প্যাটেন্ট করেন।

এর কয়েক বছরের মধ্যেই লাল এবং সবুজ এলইডি তৈরি হয়। আর ১৯৯০-র দশকে জাপানিজ-আমেরিকান বিজ্ঞানী ইসামু আকাসাকি, হিরোশি আমানো এবং সুজি নাকামুরা নীল এলইডি আবিষ্কার করেন। এর জন্য তারা ২০১৪ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।

প্রযুক্তির পরিবর্তন
এখন লাইটিং কম্পানিগুলো বিদ্যুৎ বাতি কী করতে পারে তার সীমানা অতিক্রম করে চলেছে। এমন দুটি কম্পানি হলো ফিলিপস এবং স্ট্যাক। ফিলিপস একটি বিদ্যুৎ বাতি আবিষ্কার করেছে যেটি ওয়্যারলেস বা তারহীন। যা স্মার্টফোন অ্যাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এমনকি এই বাতির সঙ্গে মিউজিক, মুভি এবং ভিডিও গেমসও সিঙ্ক করা যায়।

স্ট্যাক নামের কম্পানিটি বানিয়েছে টেসলা ও নাসার বিজ্ঞানীরা। কম্পানিটি এলইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি স্মার্ট বাল্ব উদ্ভাবন করেছে। চারপাশের প্রাকৃতিক আলোর সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাডজাস্ট করতে পারে এই বাল্ব। যে কক্ষে বাতিটি থাকবে সে কক্ষে কেউ প্রবেশ করলেই সেটি মোশন সেন্সরের মাধ্যমে জ্বলে উঠবে। এটি ঘুম থেকে ওঠার অ্যালার্ম হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। এবং দিনজুড়ে আলোর রঙ এবং প্রাকৃতিক আলোর প্যাটার্নের সঙ্গেও অ্যাডজাস্ট করতে সক্ষম এটি। আর স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট থেকে এই সবগুলো ফাংশন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এতে সাধারণ এলইডি বাল্ব এর চেয়ে আরো ৬৯% কম শক্তি খরচ করতে হবে।
সূত্র : লাইভ সায়েন্স


মন্তব্য