kalerkantho


বিশেষ লেখা

বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান

ইমদাদুল হক মিলন   

২০ আগস্ট, ২০১৭ ০৯:১৮



বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান

বৃদ্ধার শুধু মাথাটুকু জেগে আছে পানির ওপর। শুধু তাঁর অসহায় মুখখানি দেখা যাচ্ছে।

ক্লান্ত-অসহায়-বিপর্যস্ত মুখ। মাথার সাদা চুল উঁকি দিয়ে আছে। এক হাতে ধরে রেখেছেন অ্যালুমিনিয়ামের একটা হাঁড়ি। পানিতে ভেসে ভেসে তিনি চলেছেন ত্রাণের আশায়। এই ছবি ছাপা হয়েছে আমাদের কালের কণ্ঠে। জামালপুর জেলার ইসলামপুর এলাকার দৃশ্য। বন্যায় ডুবে যাওয়া জনপদের একটুখানি এক দৃশ্য।

সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লাল কাপড়ে তাকে জড়িয়ে মাথার ওপর তুলে রেখেছেন বাবা। অসহায় শিশু চোখ বন্ধ করে আছে।

বাবার গলা পর্যন্ত বন্যার পানি। দুই হাতে আকাশের দিকে তুলে শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বন্যার পানি ঠেলে ঠেলে তিনি যাচ্ছেন আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। যেমন অসহায় শিশুর মুখ, তার চেয়ে অনেক বেশি অসহায় বাবার মুখ। কেমন করে তিনি বাঁচাবেন তাঁর এই কয়েক মাসের সন্তানকে!

ঘরের চালা পর্যন্ত উঠে গেছে পানি। আসবাব ভেসে গেছে বন্যায়। ছোট একটা চৌকি রক্ষা করা গেছে। ঘরে ছোট ছোট তিন সন্তান। বন্যার হাত থেকে তাদের কেমন করে বাঁচাবেন মা-বাবা? স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে চৌকি উল্টো করে নিয়েছেন মাথায়। তার ওপর বসিয়েছেন তিন সন্তানকে। মায়ের মাথায় চৌকির এক অংশ, বাবার মাথায় আরেক অংশ। বুক পানিতে ডুবে তিন সন্তানকে বাঁচানোর জন্য তীব্র স্রোতের পানি ভেঙে এগোচ্ছেন মা-বাবা।

এক গ্রাম্যবধূ ডুবে আছেন গলা পানিতে। কোলে বছরখানেকের খালি গায়ের শিশু। লাজুক বধূটি হয়তো কখনো তাঁর বাড়ি থেকে বেরোননি। আজ বন্যার হাত থেকে সন্তান বাঁচাতে তিনি যাচ্ছেন আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। এক হাতে বুকের কাছে জড়ানো শিশু। মাথায় ঘোমটা দিয়েছেন, অন্য হাতে শাড়ির আঁচলে ঢেকে রেখেছেন মুখ। নাকের নথ দেখা যাচ্ছে।

শুধু চালাটুকু জেগে আছে। বন্যার তোড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে ঘর। কলার ভেলায় দাঁড়িয়ে আছে ১০-১২ বছর বয়সী দুটি শিশু। অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে ডুবে যাওয়া ঘরবাড়ির দিকে। একটি শিশুর পরনে লাল রঙের প্যান্ট, আরেকজনের প্যান্টের রং সবুজ। এ আমাদের বাংলাদেশের রং। আমাদের হৃদয়ের রং। লাল-সবুজের বাংলার অনেকখানি এলাকা বন্যায় ভয়াবহভাবে আক্রান্ত। যে ছবিগুলোর কথা বললাম, এই ছবিগুলোই বলে দিচ্ছে বন্যা-আক্রান্ত মানুষের দুর্দশার কথা। অসহায় বৃদ্ধ বসে তাঁর আছে ঘরের সামনে, কলার ভেলায়। ঘর ডুবে গেছে। তিনি এখন কোথায় যাবেন, কার কাছে যাবেন? বন্যার তোড়ে ঘরদোর-আসবাব- সব ভেসে গেছে। নিজের ছোট্ট ডিঙি নৌকায় যতটুকু আসবাব-টিন ইত্যাদি রক্ষা করা গেছে, তুলে নিজে বুক পানিতে নেমে নৌকা টেনে নিচ্ছেন মধ্যবয়সী অসহায় মানুষ। লালমনিরহাটের হাতিবান্ধার স্কুলছাত্রীর পড়ার বই ভিজে গলে যাওয়ার উপক্রম। সেই বই বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে ছাত্রীটি দিয়েছে রোদে শুকাতে। কুড়িগ্রামের বালুডোবাচর বন্যার পানিতে থৈ থৈ করছে। কোথাও জেগে নেই একটুখানি শুকনো মাটি। নৌকায় আশ্রয় নিয়েছে কোনো কোনো পরিবার। এইমাত্র সেই নৌকায় জন্ম নিয়েছে একটি শিশু। মায়ের বুকের দুধ পাচ্ছে না। কেমন করে পাবে? গত প্রায় ১০ দিন ধরে অভুক্ত মা, অভুক্ত পুরো পরিবার। ১০ দিনেও পরিবারটির কাছে ত্রাণ পৌঁছায়নি।

বন্যাকবলিত জেলাগুলোর রাস্তাঘাটের অবস্থা ভয়াবহ। রেললাইনের তলা থেকে সরে গেছে মাটি। বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে রেললাইনের ওপর দিয়ে। রেল চলাচল বন্ধ। স্কুলঘর, দোকানপাট, হাটবাজার, মানুষের ঘরবাড়ি—সব, সব ডুবে গেছে। বাঁচার আশায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছে উঁচু সড়কে, একটুখানি জেগে থাকা আশ্রয়কেন্দ্রে। সেসব জায়গায় ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না ত্রাণ। হাজার হাজার মানুষ অসহায় হাত বাড়িয়ে আছেন ত্রাণের জন্য। ত্রাণ পৌঁছালে চলছে হুড়োহুড়ি, কাড়াকাড়ি। মানুষ কী করবে? মানুষকে তো বাঁচতে হবে!

অসহায় মানুষ কাঁদছে। অভুক্ত মানুষ দিশেহারা। কেমন করে বাঁচাবে সন্তান, কেমন করে বাঁচবে নিজে? এ এক ভয়ংকর লড়াই। পানির বিরুদ্ধে লড়াই। এ লড়াই থেকে বাঁচার উপায় কী?

বাঙালি লড়াই করা জাতি। বিপদে পরস্পরের হাত ধরে পাশে দাঁড়ায় এই জাতি। বিপদ মোকাবেলা করে সমবেতভাবে। এই বিপদেও দেশের মানুষ বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যার্তদের সাহায্যে এগিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। নানা রকমভাবে মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে দাঁড়িযেছে বন্যার্তদের পাশে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও চলছে বন্যার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার চেষ্টা। স্কুলের ছেলেমেয়েরা তাদের টিফিনের টাকা দিয়ে দিচ্ছে বন্যার্তদের। যে যেভাবে পারছে সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে।

এই অবস্থায় কিছু নষ্ট ব্যবসায়ী খাদ্যদ্রব্য মজুদে নেমেছেন। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। চাল-গমের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। তাঁদের সঙ্গে তাল দিয়ে কোনো কোনো পরিবারও বাড়িতে বাড়তি চাল-আটা মজুদ করছে। তাদের ধারণা, খাদ্যদ্রব্যের দাম আরো বাড়বে। এই ধরনের মানুষদের কী বলব? তাঁরা কী টেলিভিশন দেখেন না? খবরের কাগজ দেখেন না? বন্যার্ত অসহায় মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁদের কি একবারও মনে হয় না, এই অবস্থাটি তাঁদেরও হতে পারত, তাদের সন্তান ও প্রিয়জনদেরও হতে পারত?

ছেলেটির মাথা প্রায় ডুবে গেছে পানিতে তার পরও অন্য হাতে অ্যালুমিনিয়ামের একটি জগ শূন্যে তুলে রেখেছে। খাবার পানির তীব্র সংকট। ভাত-রুটি না হোক, একটু বিশুদ্ধ পানি তো খেতে হবে! পানি খেয়ে অন্তত জীবনটা বাঁচাতে হবে। বন্যার পানি সাঁতরে এই ছেলে যাচ্ছে খাবার পানি সংগ্রহ করতে। এই ছেলেটির কথা একটু ভাবুন।

ছোট্ট মেয়েটি রিলিফ আনতে গিয়েছিল। অতি কষ্টে পলিথিনের ব্যাগে কিছুটা রিলিফের চাল সে সংগ্রহ করেছে। সেই চাল এক হাতে ধরে অন্য হাতে অতি কষ্টে সাঁতরে সাঁতরে যাচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। এইটুকু চালে মেয়েটি নিজেকে আর তার পরিবারকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। এই মেয়েটির কথা একটু ভাবুন।

বসুন্ধরা গ্রুপের মাননীয় চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান নঈম নিজাম ও আমাকে ডাকলেন। নঈম নিজাম বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও রেডিও ক্যাপিটালের সিইও। জনাব আহমেদ আকবর সোবহান একটি বিশাল অঙ্কের টাকা নির্ধারণ করলেন বন্যার্তদের জন্য। আমাদের নির্দেশ দিলেন যত দ্রুত সম্ভব বন্যার্ত মানুষের হাতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। এক সময় বললেন, খবরের কাগজ আর টেলিভিশনে যখন এই মানুষগুলোর অসহায় মুখ দেখি, ভাত মুখে তুলতে আমার সংকোচ হয়। মনে হয়, আমি খাচ্ছি আর এই মানুষগুলো খেতে পাচ্ছে না। প্রয়োজনে আমি আরো ত্রাণের ব্যবস্থা করব। আপনারা তাদের পাশে দাঁড়ান।

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের মতো দেশের অন্য ব্যবসায়ীরাও বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াবেন আশা করি। আর যেসব ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় খাদ্যপণ্য মজুদ করে বাজারে সংকট সৃষ্টি করছেন, তাঁদের বিনীতভাবে অনুরোধ করি, দয়া করে এই কাজটি করবেন না। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বাড়ানোর চেষ্টা করবেন না। মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করবেন না। বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ান। তাদের সাহায্য করুন, বেঁচে থাকার পথ করে দিন।

আগেও বলেছি, বাঙালি লড়াই করা জাতি। আমাদের এবারের লড়াই বন্যার বিরুদ্ধে, বন্যার্তদের বাঁচানোর লড়াই। আসুন, সমবেতভাবে আমরা প্রত্যেকটি মানুষ আমাদের এই অসহায় মানুষগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করি। সমবেত চেষ্টায় অবশ্যই এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাব আমরা।


মন্তব্য