kalerkantho


বাসাবো মাঠ দখল করে ক্লাবের বাণিজ্য মেলা

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল    

১৬ আগস্ট, ২০১৭ ১০:৪১



বাসাবো মাঠ দখল করে ক্লাবের বাণিজ্য মেলা

রাজধানীর বাসাবো খেলার মাঠ দখল করে মেলা বসানো হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের মালিকানাধীন এ মাঠে গত ২৪ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে অবৈধ এ মেলা।

মেলার কারণে বাসাবো ফুটবল একাডেমি, জাহিদ স্মৃতি ফুটবল একাডেমিসহ বেশ কিছু ক্রীড়া সংগঠন মাঠে খেলাধুলা করতে পারছে না। সমস্যা হচ্ছে এলাকাবাসীরও। দখলদার হিসেবে অভিযুক্ত বাসাবো তরুণ সংঘ ২০১৫ সালেও মাঠটি এক বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে ভাড়া দিয়েছিল মেলা বসাতে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, মাঠে মেলা বসানোর কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই। তরুণ সংঘের শীর্ষ পদের লোকজন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা মাঠে মেলা বসানোর কথা স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার যেহেতু ক্লাবকে টাকা দেয় না, তাই তাঁরা মেলা বসিয়ে পরিচালনা ব্যয় তুলছেন।

যোগাযোগ করা হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, দখলের তথ্য তাঁদের হাতে নেই। তিনি বলেন, 'বাসাবো মাঠটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-৪-এর অধীনে রয়েছে। এ মাঠে মেলা বসাতে হলে অবশ্যই আমাদের অনুমোদন দরকার।

যদি এখানে কেউ মেলা বসিয়ে থাকে, আমি নির্বাহী প্রকৌশলীকে পাঠিয়ে তা উচ্ছেদ করব। '

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা সিটি করপোরেশন-দক্ষিণের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসাবো খেলার মাঠে চলছে মেলা। বাহারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। শতাধিক দোকান। ২৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ মেলায় দোকান পেতে গুনতে হয়েছে ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। মেলার জন্য মাঠে ব্যাপক আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এ মেলা। মেলার জন্য আশপাশের বাসাবো টেম্পোস্ট্যান্ড, বাসাবো আমতলা ও দক্ষিণ বাসাবো এলাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আর বাঁশ পুঁতে মাঠের মধ্যে শত শত গর্ত করা হয়েছে।

বাসাবো তরুণ সংঘের সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাস সবুজবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সংঘের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হাসান শামিম ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। ক্লাবের পক্ষে এ দুই কর্তা ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে মেলা বসানোর অনুমতি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন একাধিক ব্যক্তি। মেলার আয়োজক কমিটিতে ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি তানিয়া হোসেন ও সুবজবাগ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আখতারুজ্জামান মিথুনেরও থাকার কথা জানা যায়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সুযোগ পেলেই বাসাবো তরুণ সংঘ মাঠ ভাড়া দেয়। ২০১৫ সালেও সংগঠনটি অবৈধভাবে একটি অ্যাডভারটাইজিং কম্পানিকে মাঠ ভাড়া দেয়। 'নেপল্যান্ড ফ্যান্টাসি পার্ক' নামে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মাঠে বাণিজ্যিক কার্মকাণ্ড শুরু করেছিল তারা। টিন দিয়ে সীমানা ঘিরে মাঠ দখলে নেয় বিজ্ঞাপনী সংস্থাটি। ফলে সরকারি মাঠে প্রবেশ করতে স্থানীয়দের গুনতে হয়েছে ২০ টাকা। বসানো হয় লোহালক্কড়ের ১৩টি রাইডস। এর বিকট শব্দ এলাকাবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়। সেবার এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে মেলা বাতিল করতে হয়। কিন্তু এবার বাধা দিয়েও মেলা ঠেকাতে পারেনি এলাকাবাসী।

তরুণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুদ হাসান শামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'মাঠটি গণপূর্ত বিভাগের হলেও আমরা পুলিশের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মেলা বসতে দিয়েছি। মেলার থেকে লাখ দশেক টাকা পাওয়া যায়, যা আমাদের ক্লাব পরিচালনার কাজে লাগানো হবে। আরো অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন ক্লাব পরিচালনায়। সরকার থেকে কোনো অর্থ পাই না। তাই মাঠে মেলা বসিয়ে অর্থ আয় করতে হয়। '

তরুণ সংঘের সভাপতি ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দাস বলেন, 'মেলাটি ভালো উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। মেলা বসিয়ে সুলভ মূল্যে মানুষকে পণ্য দেওয়া হচ্ছে। দোকান ভাড়া থেকে পাওয়া অর্থের একটা অংশ ক্লাব পরিচালনার জন্য নেওয়া হয়েছে। তবে এটি আমি করিনি, করেছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুদ হাসান শামিম। '

আয়োজক কমিটির আরেকজন আখতারুজ্জামান মিথুন বলেন, 'মেলার কারণে খেলার কিছুটা তো সমস্যা হয়। কিন্তু ক্লাব পরিচালনার জন্য অর্থ জোগাড় করতেই আমরা মেলা বসিয়েছি। এ অর্থে ফুটবল টিম গঠন করা হবে। ' ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি তানিয়া হোসেন বলেন, 'আমি মেলা আয়োজনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নই। ক্লাবের সদস্য হিসেবে মেলার বিষয়টি জানি। বিস্তারিত বলতে পারবেন শামিম। '

সবুজবাগ থানার ওসি মো. কুদ্দুস ফকির কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা আইন-শৃঙ্খলার বিষয়টি নিয়ে শুধু তাদের অনুমোদন দিয়েছি। সেখানে শর্ত দেওয়া আছে, মাঠের মালিকানা থাকা প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন নিতে হবে। '

এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাসাবো বালুর মাঠ গণপূর্ত বিভাগের। এ জায়গাটির রয়েছে বাসাবো উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, মাঠ লাগোয়া বড় মসজিদ ও আবাসিক এলাকা। এলাকার আর কোনো খোলা জায়গাও নেই যে লোকজন একটু বিশ্রাম করতে বা বেড়াতে যাবে। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে মাঠটির বাণিজ্যিকীকরণ করা হয় বলে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না।


মন্তব্য