লম্বা, কালো এবং সুচালো টুপি দেখলে অনেকের মনেই প্রথমে ডাইনির কথা আসে। সিনেমা, টেলিভিশন, বই কিংবা হ্যালোইনের সাজ—সব জায়গাতেই এই টুপিকে ডাইনির পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে এই পরিচিত টুপির ইতিহাস শুধু কল্পকাহিনি বা বিনোদনের জগতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় বৈষম্য, সামাজিক নিপীড়ন এবং শত শত বছরের পুরোনো নানা ঐতিহাসিক ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাইনির টুপির প্রকৃত উৎস নিয়ে এখনো একমত হওয়া যায়নি। তবে আধুনিক সময়ে এই টুপিকে জনপ্রিয় করে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘দ্য উইজার্ড অব ওজ’। এই ছবিতে ‘উইকেড উইচ অব দ্য ওয়েস্ট’ চরিত্রটিকে কালো পোশাক ও সুচালো টুপিতে দেখানো হয়েছিল। এর পর থেকেই ডাইনির পরিচিত চেহারা হিসেবে এই টুপির ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এই সিনেমাটি ডাইনির বেশভূষা ও চেহারাকে জনপ্রিয় করলেও ইতিহাসবিদরা বলছেন, সূচালো টুপিকে অশুভ বা ভয়ংকর কিছু হিসেবে দেখার ধারণা এরও বহু আগে থেকে চলে আসছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ত্রয়োদশ শতকে ক্যাথলিক গির্জার নেতারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সভা আয়োজন করেন, যা পরে ‘গ্রেট কাউন্সিল’ নামে পরিচিত হয়। ওই সভায় এমন একটি নীতি গ্রহণ করা হয়, যার মাধ্যমে ইহুদি ও মুসলমানদের খ্রিস্টানদের থেকে আলাদা করে চেনার জন্য বিশেষ পোশাক পরতে বাধ্য করা হয়।
সে সময় ইহুদিদের একটি বিশেষ সুচালো টুপি পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই টুপির নাম ছিল ‘জুডেনহাট’। অনেক গবেষক মনে করেন, এটি ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণের একটি উদাহরণ।
সাবেক যাজক ও লেখক জেমস ক্যারল তার বই 'কন্সট্যানটাইন্স সোর্ড : দ্য চার্চ অ্যান্ড দ্য জিউস : এ হিস্টোরি'-এ এই নিয়মকে পরবর্তীকালে নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কুখ্যাত হলুদ ব্যাজ ব্যবস্থার পূর্বসূরি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এর প্রায় এক শতক পর ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে জাদুবিদ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত নারীদের ওপরও একই ধরনের নিপীড়ন চালানো হয়। হাঙ্গেরির জাগরেব এলাকায় অভিযুক্ত নারীদের প্রকাশ্যে অপমান করার জন্য দেবদূতের ছবি আঁকা সূচালো টুপি পরানো হতো। পরে তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো।
ফলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ডাইনির টুপি শুধু কল্পনার জগতের কোনো পোশাক নয়; বরং এটি বহু মানুষের ওপর চালানো বৈষম্য ও নিপীড়নের স্মৃতিও বহন করে।
তবে ডাইনির টুপির উৎস নিয়ে আরেকটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যাও রয়েছে। ভেষজ বিশেষজ্ঞ ও নিজেকে ডাইনি হিসেবে পরিচয় দেওয়া মিশেল গেরেরোর মতে, এই টুপির সঙ্গে মধ্যযুগের নারী বিয়ার ব্যবসায়ীদেরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
ইতিহাস বলছে, প্রায় ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইউরোপে বিয়ার তৈরি ও বিক্রির কাজ মূলত নারীরাই করতেন। এসব নারী ব্যবসায়ী বাজারে নিজেদের সহজে আলাদা করে দেখাতে লম্বা ও সুচালো টুপি পরতেন। এতে ক্রেতারা দূর থেকেই তাদের চিনতে পারতেন।
পরে তাদের বিরুদ্ধে নিম্নমানের বা দূষিত বিয়ার বিক্রির অভিযোগ তোলা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ব্যবসা ও সামাজিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেকের মতে, সেখান থেকেও সূচালো টুপি পরা নারীদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণার জন্ম হতে পারে।
তবে সময়ের সঙ্গে ডাইনিদের চিত্র বদলাতে শুরু করে। আগে চলচ্চিত্র ও গল্পে ডাইনিদের সাধারণত দুষ্ট, ভয়ংকর এবং অশুভ চরিত্র হিসেবে দেখানো হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তাদের উপস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে।
'চার্মড', 'সাবরিনা দ্য টিনেজ উইচ', এবং 'বাফি দ্য ভ্যাম্পায়ার স্লেয়ার'–এর মতো জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজে ডাইনিদের শক্তিশালী এবং ইতিবাচক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তারা নিজেদের ক্ষমতা মানুষের উপকারে ব্যবহার করত।
একইভাবে ১৯৯৮ সালের ‘প্র্যাক্টিক্যাল ম্যাজিক’ চলচ্চিত্রে দুই বোনকে অতিপ্রাকৃত শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘আমেরিকান হরোর স্টোরি :কোভেন' এবং 'দ্য চিলিং অ্যাডভেঞ্চারস অফ সাবরিনা'–এর মতো সিরিজও নতুন প্রজন্মের কাছে ডাইনিদের নতুনভাবে পরিচিত করেছে।
এর প্রভাব ফ্যাশন জগতেও পড়েছে। বর্তমানে অনলাইনে ডাইনিবিষয়ক পোশাক, অলংকার ও সাজসজ্জার সামগ্রীর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্যের একটি হলো আধুনিক ডাইনির টুপি।
এই টুপিগুলো সাধারণত আকারে ছোট হয়। অনেক সময় বোনা কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয় এবং দেখতে কিছুটা নরম ও ঝুলে থাকা ধরনের হয়। অনেকের কাছে এগুলো 'হ্যারি পটার' সিরিজের বিখ্যাত ‘সর্টিং হ্যাট’-এর মতো মনে হয়।
বর্তমানে অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে এসব টুপির চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অনেক মানুষ ডাইনি সংস্কৃতি ও এর প্রতীকগুলোর প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে।
তবে এই জনপ্রিয়তা নিয়ে সবার মতো এক নয়। কেউ কেউ মনে করেন, যে প্রতীক একসময় নিপীড়ন ও বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত ছিল, সেটিকে নিছক ফ্যাশনের অংশ বানানো ইতিহাসের প্রতি সংবেদনশীলতার অভাব প্রকাশ করে।
অন্যদিকে মিশেল গেরেরোর মতো অনেকে বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। তার মতে, মানুষ যদি ফ্যাশনের অংশ হিসেবে ডাইনির টুপি পরে, তাহলে সেটি ক্ষতিকর কিছু নয়।
তিনি বলেন, ডাইনিরা দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতা, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। আধুনিক সংস্কৃতিতে সেই পরিচয়ই এখন আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
গেরেরোর ভাষায়, ডাইনিদের সাহসী, রহস্যময়, আকর্ষণীয় কিংবা শক্তিশালী হিসেবে দেখা হয়। তারা কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে মানুষ তাদের কিভাবে কল্পনা করছে তার ওপর। আর এ কারণেই ডাইনির টুপি আজও মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।




