kalerkantho


ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন

মেয়েরা কেন গর্ভপাতে বাধ্য হয়?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৯ মার্চ, ২০১৭ ০২:৩০



মেয়েরা কেন গর্ভপাতে বাধ্য হয়?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গর্ভপাতের জন্য নারীদের দায়ী করা হয়৷ কেননা সন্তানটির জন্মদ্রাত্রী তিনি৷ কিন্তু আসলেই কি নারী ইচ্ছে করেই কাজটি করেন, নাকি বাধ্য হন করতে?
দু'টি ঘটনার কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয়৷ একটি ঘটনা ২০০৭ সালের রাজধানীর অদূরে বালুর মাঠে এক নবজাতককে কে বা কারা ফেলে রেখে যায়৷ কাকগুলো শিশুর কোমল দেহ থেকে মাংস তুলে নেয়ার চেষ্টা করছিল আর তাকে রক্ষায় মরিয়া ছিল একটি কুকুর৷ এ দৃশ্য পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নজরে আসে স্থানীয় এক রিকশাওয়ালার৷ তিনি তৎক্ষণাত নবজাতকটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন৷ খবর পড়ে সে ঘটনা নজরে আসে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর৷ বর্তমানে সেই শিশুটি তার কাছেই সযত্নে মানুষ হচ্ছে৷
দ্বিতীয় ঘটনাটি ২০১৫ সালের৷ রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়ার পুরাতন বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে আবর্জনার স্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল নবজাতকটিকে৷ কয়েকটি শিশু প্রথমে দেখতে পায় এই শিশুকে৷ কুকুরের মুখে ঝুলছিলো নবজাতকটি৷ খবর পেয়ে স্থানীয় লন্ড্রি দোকানদারের স্ত্রী জাহানারা বেগম সেখানে পৌঁছান এবং কুকুর তাড়িয়ে নবজাতককে রক্ষা করেন৷ চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় পরিচয়হীন নবজাতক পেয়েছে নতুন জীবন৷ ফাইজা নামে শিশুটি এখন আছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আজিমপুরের ছোটমণি নিবাস কেন্দ্রে৷
এই দু'টি ঘটনা থেকেই বোঝা যায় এই সন্তান দু'টি তার বাবা বা মায়ের কাঙ্ক্ষিত ছিলো না৷ আর যদি সেই মা হয়ে থাকেন অবিবাহিতা বা এই সন্তান তার কাঙ্ক্ষিত ছিল না, তাহলে এই সন্তানকে পৃথিবীতে আনার চেয়ে গর্ভপাতই কি ভালো ছিল না? যদি কেউ লক্ষ্য না করতো এই শিশুদের কুকুরের খাদ্য হতে হতো৷ তাদের ভাগ্য ভালো ছিলো যে তারা রক্ষা পেয়েছে৷ কিন্তু এমন কত খবরই জানা যায় না যেখানে এই শিশুরা প্রাণ হারায়৷
আপনার দৃষ্টিতে কোনটা সমর্থনযোগ্য-অপ্রত্যাশিত সন্তান, নাকি তার পৃথিবীতে না আসা? গর্ভপাতের জন্য কিন্তু কেবল নারীটিকে দায়ী করা হয়৷ বলা হয় এ কেমন মা যে তার নিজের সন্তানকে ফেলে গেল! কিন্তু কি করবে সেই মেয়েটি? কী করার আছে তাঁর? এ সমাজ সব দায় তো মেয়েদের উপর চাপিয়েই খালাস৷ জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করবে নারী, কেননা পুরুষের কনডোম ব্যবহার পছন্দ নয়৷ না এটা কেবল অশিক্ষিত পরিবারের পুরুষদের কথাই বলছি না৷ শিক্ষিত পরিবারের অনেক পুরুষও এটা পছন্দ করে না৷ ফলে এই দায় কেবল নারীদের উপর বর্তায়৷
ভাবুন তো বিয়ের আগে কোনো নারী যদি গর্ভবতী হয়ে পড়েন, সমাজ কি তাকে গ্রহণ করবে? পুরুষ যেন ধোঁয়া তুলসী পাতা, সে তো তার সব আনন্দ নিয়ে তার কৌমার্যের খোলস গায়ে চাপিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ সেক্ষেত্রে প্রেমিকটি মেয়েটিকে যদি সেই মুহূর্তে বিয়ে না করে বা ঐ সন্তানের দায়িত্ব না নেয় তাহলে মেয়েটির গর্ভপাত করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে কি?
এছাড়া যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হতে থাকে৷ বোঝা যাচ্ছে এই সম্পর্ক বিচ্ছেদের দিকে যাচ্ছে এবং স্ত্রী যদি অন্তঃসত্ত্বা হন৷ সেক্ষেত্রে তিনি কোন পথ বেছে নেবেন বলে আপনার ধারণা?
আমাদের সমাজ এখনো এত উদার হয়নি যে অবিবাহিত মাকে মেনে নেবে৷ তাহলে সমাজের কটাক্ষের শিকার কেন হতে চাইবে মেয়েরা, আপনারাই বলুন?
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনের ৩১২ থেকে ৩১৬ ধারা পর্যন্ত গর্ভপাত সংক্রান্ত আইন ও সাজার কথা বলা হয়েছে৷ এরমধ্যে ৩১২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নারী গর্ভপাত ঘটালে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তিন বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় প্রকার শাস্তি পেতে পারে৷
কিন্তু কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে যদি অন্তঃসত্ত্বা হন, সেক্ষেত্রেও কেন তার জন্য গর্ভপাত আইনত নিষিদ্ধ হবে? কেন সে অনিচ্ছাকৃত ঘটে যাওয়া ঘটনার মাশুল সারাজীবন বয়ে বেড়াবে?
সবশেষে পরিচিত এক মানুষের কথা দিয়ে শেষ করবো৷ সেই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী এবং দুই সন্তানের সুন্দর পরিবার৷ কিন্তু স্বামী ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন৷ সেসময় চিকিৎসকই পরামর্শ দেন গর্ভপাত করানোর৷ কেননা চিকিৎসকের আশঙ্কা ছিল এ অবস্থায় বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে৷ তাই স্বামী-স্ত্রী দু'জনেই গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন৷ একটি শিশুর জীবন নষ্ট করার চেয়ে একটি ভ্রুণ হত্যা করা অনেক ক্ষেত্রে সমর্থনযোগ্য যদি না সেটা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে৷ যেমন ভারতের অনেক জায়গায় মেয়ে সন্তান যাতে না হয় সেজন্য কন্যা ভ্রুণ হত্যা করা হয়৷ অর্থাৎ আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে লিঙ্গ নির্ধারণ করে মেয়ে হলে গর্ভপাত করা হয়৷ আমি একেবারেই এ ধরনের গর্ভপাতের পক্ষে নই৷ তবে নারীরা যেন তার শারীরিক এবং মানসিক সব সুবিধার কথা চিন্তা করে একটি সন্তানের জন্ম দেন আমি তার পক্ষে৷ কেননা এতে সন্তানটি সুন্দর ভাবে গড়ে উঠবে ভবিষ্যতের জন্য৷


মন্তব্য