kalerkantho


তাসফিয়া তানিশার জন্য কান্না!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ মার্চ, ২০১৭ ১০:২৬



তাসফিয়া তানিশার জন্য কান্না!

সোশাল মিডিয়ায় তাসফিয়া তানিশা নামের এক মেয়ের একটি স্টেটাস ভাইরাল হয়ে গেছে। অতি-আবেগীয় এই পোস্ট লেখা হয়েছিল গত বছরের মে মাসে।

নিজের মৃত্যুকেন্দ্রিক ভাবনা থেকে লেখা এই পোস্টটি তখনই ভাইরাল হয় যখন মেয়েটি সত্যি মারা যায়। গত ২ মার্চ তাসফিয়া মারা যান। এরপরই ছড়িয়ে পড়ে সেই স্টেটাস। চলছে সোশাল মিডিয়ায় চোখের জলের বিসর্জন। কী ছিল সেই স্টেটাসে?

তাসফিয়া তানিশা লিখেছেন,

'গত মাসের উনিশ তারিখ রিপোর্টগুলো হাতে আসছিল। সেদিনই সেগুলো নানুবাসায় নিয়ে বড় মামাকে দেখানো হয়। আমার বড় মামা ডাক্তার। রিপোর্ট দেখে মামা কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল।
.
আমার খুব অদ্ভুত একটা অসুখ।

একদম শেষ পর্যায়ে ধরা পড়েছে। অসুখটার নাম "এ্যাংকল ভাট্টা", যদিও আমার মনে হয় উচ্চারণটা "ভেট্টা" হবে। এই অসুখের তেমন কোনো সিম্পটোম নাই, তাই আগে ধরা যায় নাই। রুটিন চেকআপ করার সময় ধরা পড়লো অসুখটা। আমি কিছুটা কনফিউজড আমার আসলেই কিছু হয়েছে কিনা। কারণ ফিজিক্যালি আমি কোনো রকম প্রব্লেম ফেস করছি না, অথচ আমার লাইফ টাইম সেট করা এক মাসের জন্য! মামা বলেছিল, সর্বোচ্চ এক মাস। কথাগুলো অবশ্যই আমার সামনে বলা হয় নাই। ইন ফ্যাক্ট এই বিষয়টা আমি কখনোই জানতে পারতাম না যদি না আব্বু এসে সব জানায় দিত।
.
যেদিন সন্ধ্যায় আমাকে জানানো হয় সেদিন আমি বারান্দায় বসেছিলাম। পড়তে ইচ্ছা হচ্ছিলো না। বাইরের সাইডে মুখ ফিরিয়ে আকাশ দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হলো পেছনে কেউ আছে। তাকিয়ে দেখলাম আব্বু, কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে কে জানে। আমি আবার সামনে ফিরে চুপচাপ বসে থাকলাম। আব্বু আমার মাথায় হাত রাখলো। আমি তাও নড়লাম না, কোনো কথাও বললাম না। চুপচাপ থাকতে বেশ ভালোই লাগছিল। চুপচাপ বসেই আব্বুর কথাগুলো শুনে গেলাম। একসময় আব্বু ভেতরে চলে গ্যালো। আমি তখনো বাইরে বসে থাকলাম। বসে বসে হিসাব করতে লাগলাম একটা মাসে কি কি করা যায়।
.
আমার দুইটা ফ্রেন্ড সার্কেল, প্রথমেই ওদেরকে বলে দিবো। ওদেরকে সাথে নিয়েই আমার সবগুলো অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করব। সন্ধ্যায় অভয়মিত্রে বসে মাহিনের গান শুনবো। গিটার থাকবে, সাথে নদীর কুলকুল শব্দ। অনেক রাত হয়ে গ্যালে নুসরাতের বাসায় থাকতে চলে যাব। এক রাতের জন্য আন্টি আমাকে নিশ্চয়ই থাকতে দেবে। আচ্ছা, এক মাসের মধ্যে কি বাঁশি শেখা যাবে না? রিয়া নাকি খুব মজা করে পুডিং বানায়। যাওয়ার আগে অবশ্যই ওর পুডিং খেতে হবে। রান্না শেখার শখ ছিল। কিন্তু এখন কার জন্য শিখবো? এসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কাউকে কিচ্ছু বলব না। একটা মাস সবার বেশি বেশি প্রায়োরিটি নিয়ে বেঁচে থাকার কি দরকার? বরং হুট করে একদিন নাই হয়ে যাব!
.
আমি খুব ভাল অভিনয় করি বোধ হয়। কারণ কেউ কিছুই বুঝে নাই। আগের মতোই কলেজে যাই না আর বলি আম্মু যেতে মানা করেছে। আগের মতোই কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাই আর দেখাই এটা নিয়ে আমি যথেষ্ট প্যারায় আছি। সব একদম হুবহু আগের মত। অথচ কিছুই আগের মত নেই।

আম্মু আমাকে শেষ কবে বকা দিয়েছিল ভুলে গেছি। আব্বুও কিছু বলে না এখন। তিহানটা টিভির রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি করে না আর। সন্ধ্যায় আমি শেষ কবে পড়তে বসেছিলাম? মাগরিব শেষ হলে আমি গিয়ে আম্মুর পাশে শুয়ে পড়ি। পরিবারের প্রতি কখনোই আমার টান ছিল না। কিন্তু এখন সব এলোমেলো হয়ে গেছে। আম্মুর পেটে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে থাকি। কি মিষ্টি একটা গন্ধ! সব আম্মুদের গায়ে বুঝি এমন গন্ধ থাকে? কিছুক্ষণ পর আম্মু ফোঁসফোঁস করে নাক টানে, আমি বুঝতে পারি আম্মু কাঁদছে। আমিও কাঁদি, অন্ধকারে আমরা মা-মেয়ে জড়াজড়ি করে কেঁদে চলি। একসময় আমি ক্লান্ত হয়ে থেমে যাই, আস্তে আস্তে উঠে ডাইনিং রুমে আব্বুর পাশে গিয়ে বসি। আব্বু চুপচাপ থাকে না, এটা ওটা নিয়ে কথা বলতে থাকে। আমি সবসময়ের মত মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনে চলি। আমার আব্বু খুব সুন্দর করে কথা বলে। একসময় আব্বুর কথা শেষ হয়ে গ্যালে আমি উঠে পড়ি।

মোবাইল হাতে নিয়ে গ্রুপে মেসেজ দিই আমি পড়ালেখা করছি। প্রমাণ হিসেবে জৈব যৌগের একটা পৃষ্ঠার ছবিও দিই। সবাই বিশ্বাস করে নেয়। মাইশাকে বলি দিনের পড়া দিনেই শেষ করে ফেলছি। এমন তো আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। কেন অবিশ্বাস করবে?
.
সবকিছু খুব স্বাভাবিক। আমার মজা লাগে না। আকিবকে বার্থডে সারপ্রাইজ দেওয়া হয়, আমার মনে পড়ে যায়, এটাই শেষ! নাদিরার বাসায় গিয়ে ভাবি, আর আসা হবে? আমার খারাপ লাগে, প্রচন্ড খারাপ লাগে। একটা একটা সেকেন্ড চলে যায়, আমি খুশি হয়ে উঠি, "আহ্, বেঁচে গেলাম"। সাথে সাথেই মনে হয়, "পরের সেকেন্ডেই কি সব শেষ?"।
.
এক মাসের মেয়াদ শেষ আজকে নিয়ে সাতদিন। এখন আমার এক্সট্রা টাইম চলছে। একটা একটা মূহুর্ত আমি গিলে খাচ্ছি। কারণ, যেকোনো সময়েই আমার সামনে পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যাবে। সবগুলো স্বপ্ন আগের মতোই স্বপ্ন রয়ে গেছে। এমনকি ভালোবাসার স্বপ্নটাও। রাজপুত্র আসে নি 'ভালোবাসি' বলতে। আমার এক মাসের গল্প শুনলে হয়তো বলে ফেলতো। কিন্তু আমি চাই নি তাকে মায়ায় বেঁধে ফেলতে। মায়া খুব খারাপ জিনিস। একটা মাস একটু একটু করে বেঁচে থাকতে গিয়ে লাইফটাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। যেতে ইচ্ছা করছে না, কিছুতেই যেতে ইচ্ছা করছে না আমার।
.
মাঝেমাঝে আমি খুবই হতাশ হয়ে পড়ি। আশেপাশের মানুষ কিংবা সিচুয়েশন আমাকে ভাবতে বাধ্য করে "মরে গ্যালে মেবি বেঁচে যেতাম"। আমি তখন বারান্দায় বসে চোখ বন্ধ করে আমার মৃত্যুটাকে এভাবে অনেকরকম করে কল্পনা করি। কখনো হুট করে মরে যাই, আবার কখনো ধুঁকে ধুঁকে মরি। প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত চোখ ভিজে যায়, আর লাইফ থেকে পালানোর ইচ্ছাটা পালিয়ে যায়। চোখ মুছে বারান্দা থেকে ভেতরে এসে আবার আম্মুর বকা শুনি, খারাপ লাগে না কিন্তু। এ্যাংকল ভেট্টা(!) থেকে আম্মুর বকা অনেক বেটার!
.
বেঁচে থাকাটা আসলে সুন্দর। মরতে ইচ্ছা হলে নিজের মৃত্যুটাকে কল্পনা করে দেখো একবার। একটা ট্রাকের নিচে থেঁতলে থাকো কিংবা ক্যান্সারের রোগী হয়ে মরতে থাকো। বিলিভ মি, তোমার মরে যাওয়ার ইচ্ছাটা মরে যাবে। তুমি বেঁচে থাকবা, লাইফটাকে ভালোবেসে খুব ভালভাবেই বেঁচে থাকবা!

তবে জয়নাল আবেদীন নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী ও গল্পকার বলছেন, 'এটা তাসফিয়ার জীবনের প্রকৃত ঘটনা নয়। এটা একটি গল্প। তিনি বলেন, সে উত্তমপুরুষে লিখে আমাকে প্রথমে দিয়েছিল মন্তব্য করার জন্য। আমি বলেছিলাম গল্পটা আরেকটু বড় হলে ভালো হতো। '

অবশ্য তাসফিয়া নিজেও এটাকে গল্প বলেছিলেন। এক বন্ধুর প্রশ্নের জবাবে তাসফিয়া বলেছিলেন, 'এটা কল্পনা, জ্বী, এটা শুধুই গল্প' তাসফিয়া অবশ্য তার ওই পোস্টে বেশ মজাও করেছিলেন।    

জানা গেছে, তানিশা কয়েকদিন আগে brain hemorrhage এ আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হয়। এবং ২ মার্চ সেখানেই মারা যায়। এরপর থেকে সেই পোস্টটি ভাইরাল হতে শুরু করে। সেই গল্পটি তানিশার নিজের জীবনের না হলেও কাকতালীয়ভাবে ১০ মাস পর মিলে যাবে কে জানতো।   তার এই পোস্ট দেখে সোশাল মিডিয়ায় বিলাপ চলছে। কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না।

তবে জয়নাল আবেদীন বলেছেন, এখন যেহেতু সে মারা গেছে তাই এখন সে কি করলো, কেন লিখলো এসব না চিন্তা করে আমাদের সকলের তার জন্য দোয়া করা উচিত।


মন্তব্য