kalerkantho


'ধর্ষণ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি নতুন করে শিখতে হবে ভারতের মিডিয়াগুলোকে'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৯:০২



'ধর্ষণ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি নতুন করে শিখতে হবে ভারতের মিডিয়াগুলোকে'

গেল সপ্তাহে এক বিশেষ পরিস্থিতির উদয় হয়েছে যা ভারতের জন্য লজ্জাষ্কর। ভারতে যে কেবল নারীদের জন্য অনিরাপদ তাই নয়, দেশটির মিডিয়াগুলোও নারীদের সম্মান রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতা এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক অপরাধকর্ম বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ভারতের মিডিয়াগুলোকে নতুনভাবে দীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।

২০১৫ সালে ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো এক রিপোর্ট প্রকাশ করে যেখানে নারী বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়, বিগত তিন বছরে ৩৫ হাজার ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রতিদিন দেশটিতে ৯৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনাই ভারতের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় স্থান করে নেওয়ার সুযোগ পায় না। আর যেসব ঘটনা প্রকাশ পায়, তাও যথাযথভাবে মানুষের সামনে উঠে আসে না।

ধর্ষণের মতো যৌন সংক্রান্ত এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক যেকোনো সহিংসতাই মারাত্মক অপরাধ যা ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত। এই ঘটনাগুলোকে তুলে আনা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। 'সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন' টাইপ ব্যাখ্যা দিয়ে ভুক্তভোগীর ঘাড়ে দায় চাপানোর স্বভাব সাংবাদিকদের বদলানো জরুরি।

সম্প্রতি মালায়লাম অভিনেত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে কাইরালি টিভি এবং হুয়াজ খাস গ্রামের কাছে আরেকটি ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন নিয়ে ঝড় উঠেছে চারদিকে। ধর্ষণ ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ক রিপোর্ট কেমন হওয়া উচিত নয়, তার উদাহরণ হতে পারে এই দুটো ঘটনা সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো।

হুয়াজ খাস গ্রামে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে টাইমস অব ইন্ডিয়া। সেখানে নিউ দিল্লি থেকে ধর্ষক ওই নারীকে কৌশলে তুলে নিয়ে গিয়ে গ্রামের কাছেই 'ডিয়ার পার্ক'-এ নিয়ে কিভাবে ধর্ষণ করে সবাই তুলে আনা হয়েছে। এরপর মেয়েটির অবস্থা কি হয়েছিল তাও ওঠে এসেছে। কোথায় কিভাবে ঘটে সবাই এসেছে প্রতিবেদনে। ছয় জন অভিযুক্ত হয়েছেন তাও বলা হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আক্রান্ত মেয়েটির আরো কিছু তথ্য দিয়েছে তারা। সেখানে তার পরিচয়, জাতিগত তথ্য ইত্যাদি প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি মেয়েটি যেখানে বাস করে তার এক প্রতিবেশীর পরিচয়, মেয়েটি কোথায় কী কাজ করে তাও প্রকাশ করা হয়েছে। আসলে মূল ঘটনার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক অনেক কিছুই দেওয়া হয়েছে যা প্রকাশযোগ্য নয়।  
 
এমনকি প্রতিবেদন অতিরঞ্জিত করে এমনভাবে প্রকাশ করা হয়, যেখানে এমন ঘটনা ঘটার পেছনে ভুক্তভোগীর দোষ-ত্রুটি থাকার প্রসঙ্গে উঠে আসে পাঠকের মনে। সাম্প্রতিক এক অস্ট্রেলিয়ান গবেষণায় বলা হয়েছে, নারীর সহিংসতা বিষয়ে যে প্রতিবেদন করা হয়, তার প্রতি ৬টির মধ্যে একটি প্রতিবেদন এ ঘটনার কিছু দায় আক্রান্তের ওপর চাপিয়ে দেয়। এসব প্রতিবেদনে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়, তার ১৫ শতাংশ ওই নারীর আচার-আচরণের কথা বলে। আর ওই নারী নিজেকে কিভাবে এই বিপদের সঙ্গে জড়িয়ে নেয় তার বয়ান ১৬ শতাংশ জুড়ে থাকে।

শুধু ভারতেই নয়, ধর্ষণ বিষয়ে বিশ্ব মিডিয়ার চর্চা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এক অচেতন নারীকে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ করা হয়। শুনানিতে ধর্ষিতা অভিযুক্তকে নিয়ে যে বয়ান দেন তা বিশ্ব মিডিয়ার নজর কাড়ে। পরে বদলে যায় মিডিয়ার প্রতিবেদনের ভাষা। তারা ধর্ষক ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ব্রক অ্যারেন টার্নারের পরিচয় তুলে ধরে। ধর্ষণের আগে মেয়েটিকে অবচেতন অবস্থায় আনতে কিছু খাওয়ানো হয়েছিল বলা হয় প্রতিবেদনগুলোতে। বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত অবচেতন নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে তথ্য দেয় মিডিয়াগুলো। তারা কোথাও 'ওই নারী অতিরিক্ত মদ খেয়েছিলেন' বা 'ধর্ষণ করার মতো পরিবেশ তৈরি করেছেন' এর মতো ভাষা ব্যবহার করেনি। এ ঘটনা নিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ইউএসএ টুডে, টাইম, সিএনএন, স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড, এমএসএনবিসি এবং বিবিসি'র মতো বড় বড় মিডিয়া প্রতিবেদন করে।

এসব ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুতের নিয়মও রয়েছে। ভারতের ফেমিনিজম-এ নিয়ম-কানুন প্রকাশিত হয়। সেখানে ধর্ষণের শিকার বেঁচে যাওয়া নারীদের নিয়ে এমন কিছু লেখা যাবে না যা তাদের ঘাড়ে কিছুটা হলেও দায় চাপায়। যেমন- ওই নারীর এমন কিছু করেছেন বা লিখেছেন বা এমন কোথাও গিয়েছেন বা বলেছেন এবং এ কারণেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এমন কিছুই প্রকাশ হবে না।

আসলে ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনায় নারী সহিংসতা বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি সচেতন হওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন মানতে হবে এবং অন্যথায় প্রতিবেদক বা সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিও জোর দেওয়া হয়। সূত্র: ডন

 


মন্তব্য