kalerkantho


সাহস আর শপথে উজ্জ্বল ওঁদের প্রথম ভালোবাসা দিবস

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১১:৪৪



সাহস আর শপথে উজ্জ্বল ওঁদের প্রথম ভালোবাসা দিবস

উত্তর কলকাতার শোভাবাজারে গঙ্গাঘাটের কাছে পুরনো গলি। এই গলিতেই পলেস্তরা খসে ইট বের করা একটি বাড়ির একতলা। সেখানেই খুনসুটি চলছিল মিলন আর অন্নপূর্ণার। বিয়ের ৯ দিনের মাথায় ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস। ভালোবাসা দিবসটি কেমন করে পালন করা যায়, তা নিয়েই এ খুনসুটি।

স্বামীর কোন জিনিসটা সবচেয়ে ভালো লাগে?- এমন প্রশ্নের উত্তরে অন্নপূর্ণা জবাব দেয়, 'ওর মনটা খাঁটি হীরের মতো। ' স্ত্রীর কোন গুণটি সব চেয়ে বেশি টানে?- এমন প্রশ্নের উত্তরে মিলন বলে, 'ওর জেদ। জেদটা না থাকলে হয়ত বিয়েটাই হতো না!'

মিলন দাসের আদি বাড়ি ওড়িশার ভদ্রকে। তবে ছোটবেলা থেকেই উত্তর কলকাতার বাসিন্দা। জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। হাঁটাচলা দূরে থাক, ভালো করে বসতেই পারেন না।

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয় কারও কোলে চড়ে বা বিশেষ ধরনের হুইল চেয়ারে। অন্যদিকে অন্নপূর্ণা দাস ওড়িশার জাজপুরের মূক-বধির-দৃষ্টিহীনদের স্কুলের শিক্ষক। শারীরিক বৈকল্য নেই। কেবল ভালোবাসার টানে তিনি চলে এসেছেন শোভাবাজারের দাস পরিবারে। কারো কোনো আপত্তি মিলন-অন্নপূর্ণার সামনে বাধা হতে পারেনি। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছে তাঁদের।

অকপটে স্বীকার করে মিলন, 'মনের দিক থেকে যতই শক্ত হই না কেন, শারীরিকভাবে বাথরুমে বসতে গেলেও কারও সাহায্য দরকার হয়। স্বপ্নেও কোনো মেয়েকে ভালোবাসতে ভয় পেতাম। কিন্তু অন্নপূর্ণা এসে সব এলোমেলো করে দিল। আমি সারা দুনিয়ার সামনে জানানোর সাহস পেলাম যে, সারা জীবনের জন্য পাগলের মতো কাউকে ভালোবাসতে চাই। '

মনে হবে সিনেমার চিত্রনাট্য অভিনীত হচ্ছে মঞ্চে। এভাবেই তো মণিরত্নমের 'গুরু'  ছবিতে মাল্টিপল স্কেলেরোসিস-আক্রান্ত প্রতিবন্ধী মিনুর (বিদ্যা বালান) যাবতীয় সংকোচ উড়িয়ে তাঁকে বিয়ে করেছিলেন তরুণ সাংবাদিক শ্যাম সাক্সেনা (মাধবন)। 'গুজারিশ' ছবিতে মাথা ছাড়া বাকি শরীর স্থবির হয়ে যাওয়া (কোয়াড্রিপ্লেজিক) জাদুকর ইথান মাসকারেনহাসকে (হৃতিক রোশন) ভালোবেসে ফেলেছিলেন তাঁর দেখাশোনা করায় নিযুক্ত নার্স সোফিয়া (ঐশ্বর্যা রাই)। হুইল চেয়ারে বসা মিলনের হাত দুটো আলগোছে নিজের হাতে নিয়ে আনমনেই অন্নপূর্ণা বলে ওঠেন, 'এবার তোমাদের আগলে রাখার দায়িত্ব আমার। '

অন্নপূর্ণার দায়িত্ব অবশ্য আরও বেশি। কারণ, দাস পরিবারে মিলনের মতো তাঁর বাকি দুই ভাইবোন তপন আর মমতাও বিরল জিনঘটিত রোগে আক্রান্ত হয়ে জন্ম থেকে অতি খর্বাকৃতি এবং প্রায় এক শ ভাগ বিকলাঙ্গ। নিজে থেকে তাঁরা খাট থেকেও নামতে পারেন না। সেই সঙ্গে শ্বশুর সন্ন্যাসীচরণ বার্ধক্যজনিত কারণে শয্যাশায়ী এবং শাশুড়ি লক্ষ্মীপ্রিয়া ক্যানসারে আক্রান্ত।

এর কোনো কিছুই অবশ্য অন্নপূর্ণাকে দমাতে পারেনি। তিনি পরোয়াই করেননি লোকের কথার। বরং বিয়ের পর অনায়াসে দেওর বা ননদকে কোলে নিয়ে এবং স্বামীর  হুইল চেয়ার ঠেলে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন শপিং-এ বা মন্দিরে। অবাক, মুগ্ধ মিলন এখন জোর দিয়ে বলতে পারছেন, 'শরীর যে কোনো বাধা নয়, মানসিক শক্তিতে সব নেতিবাচকতাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়, সেটা এখন শিখলাম। '

জাজপুরে মিলনদের মামাবাড়ির পাশেই অন্নপূর্ণাদের বাড়ি। আসা-যাওয়ার পথে প্রথম আলাপে দুইজনেরই ভালোলাগার শুরু। কিন্তু নিজের শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে নিজের অনুভবের কথা জানানোর সাহস হয়নি মিলনের। স্বপ্নেও ভাবেননি কোনও সুস্থ-সবল মেয়ে কোনও দিন তাঁকে ভালোবেসে ঘর বাঁধতে চাইতে পারে। অথচ অন্নপূর্ণা সেটাই চাইলেন।

অন্নপূর্ণার চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাস। শ্বশুরবাড়িতে এসে তিনি প্রথমেই শিখে নিয়েছেন, কীভাবে স্বামী ও দেওর-ননদের বিশেষ হুইল চেয়ারকে কায়দা করে ঘরের চৌকাঠ পার করাতে হয়, কীভাবে তাঁদের কোলে করে শৌচাগারে নিয়ে যেতে হয়। যখন প্রশ্ন করা হয়, সারা জীবন এসব করার ধৈর্য থাকবে তো? পরে হতাশা-আফশোস-বিরক্তি গ্রাস করবে না? অন্নপূর্ণা অবিচল, 'আমি অন্য ধাতুতে তৈরি। সব দিক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সুস্থ লোককে বিয়ে করলে পরে কোনও দুর্ঘটনায় সে-ও তো প্রতিবন্ধী হতে পারে। তখন কি তাঁর থেকে পালাতে চাইতাম?'

উত্তর শুনে ভরসা আর ভালোবাসা ঠিকরে ওঠে মিলনের মুখে। স্ত্রীর জন্য শাড়ি বাছাইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। বিশ্ব ভালোবাসার দিনে তাঁর পছন্দের শাড়িতে সেজেই পরিবারের সবার সঙ্গে বেড়াতে যাবেন অন্নপূর্ণা। তাঁদের জীবনে হারিয়ে যাওয়া আনন্দ যে এতদিনে ফিরে এসেছে!

 


মন্তব্য