kalerkantho


দলিত পরিবারের ৬ মেয়ে, কেউ ডাক্তার তো কেউবা মেয়র!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০৯:৪১



দলিত পরিবারের ৬ মেয়ে, কেউ ডাক্তার তো কেউবা মেয়র!

শিক্ষা সব চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যা দিয়ে তুমি গোটা বিশ্ব পাল্টাতে পারো। নেলসন ম্যান্ডেলার অমর বাণী-ই সত্যি করে দেখালেন এমন একজন মানুষ যাকে পড়াশোনা চালানোর জন্য খেতমজুরের কাজ করতে হয়েছে। যিনি দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও গ্রামের প্রথম ব্যক্তি হিসাবে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। যেখানে মেয়ে সন্তানকে অভিশাপ বলে মনে করা হয়, সেখানে নিজের ৬ কন্যা সন্তানকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এমন নীরবে কাজ করে যাওয়া এক হিরোকে নিয়েই এই নিবেদন।

রাজস্থানের জয়সলমের জেলার চেলাক গ্রামে এক দলিত পরিবারে জন্ম রূপরাম ধনদেব-এর। খেতমজুর বাবা পরিবারের খুন্নিবৃত্তি করতেই দিন পার করতেন। তবুও সেটা সম্ভব হত না। গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা শুরু করেন রূপরাম। সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লাগাতার প্রথম হওয়ার পর পাঠাশালার প্রধান শিক্ষকের নজরে পড়েন রূপরাম। প্রধান শিক্ষক গিয়ে তাঁর বাবাকে অনুরোধ করেন যাতে ছেলের পড়া বন্ধ না হয়।

২৭৫ কিমি দূরে নাচনা গ্রামে এক সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়ে যান রূপরাম। সেখানেও জারি থাকে তাঁর প্রথম হওয়ার দৌড়।

এর পর আর গ্রামের গণ্ডিতে তাঁকে বেঁধে রাখা যায়নি। জয়সলমেরে হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় সেই গ্রামের স্কুলের শিক্ষকই তাঁকে সাহায্য করেন। তাঁর পরামর্শেই অঙ্ক নিয়ে দশম শ্রেণিতে ভর্তি হন। একাদশ শ্রেণিতে দুরন্ত ফল করেন। পরে শিক্ষকদের পরামর্শেই তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু করেন। রূপরামের কথায়, সেটাই ছিল আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এটাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আমার পরিবারে কেউ লেখাপড়া জানতেন না। তাই কারও সঙ্গে পরামর্শ করতে পারতাম না। শিক্ষকদের কাছ থেকে যে সাহায্য পেয়েছি তা জীবনে ভুলব না।

রাজস্থানের নিয়ম মেনে অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। তবে তাতে পড়াশোনায় কোনও বিঘ্ন ঘটেনি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া মানে ৫ বছরের পড়াশোনা। তার সঙ্গে টাকার জোগান। সেখানেই ফের আটকে গিয়েছিলেন রূপরাম। কারণ খেতমজুর বাবার পক্ষে সেই খরচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। তখন সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন তাঁর গ্রামের জমিদার। যাঁর জমিতে মজুরের কাজ করতেন রূপরামের বাবা। সেই জমিদার রূপরামের সমস্ত পড়াশোনার খরচ দেন।

রূপরাম বলেন, অনেকে বলেন, বিয়ের পর নাকি পড়াশোনা করা যায় না। আমি তা মানতে পারব না। আমার স্ত্রীর অনুপ্রেরণাতেই আমি আরও ভালো ফল করতে পেরেছি। তবে পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সপ্তাহান্তে গ্রামে গিয়ে খেতেও কাজ করে পরিবারের হাতে যত সামান্য রোজগার তুলে দিতেন। তৃতীয় বর্ষে যখন পড়ছেন, সে সময় তাঁর প্রথম কন্যা অঞ্জনা জন্মান। বছর দুয়েক বাদে ভালো নম্বর নিয়ে বি. টেক সম্পূর্ণ করেন রুপরাম। সরকারি দপ্তরে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি পান।

পর পর মেয়ে জন্মানোয় গ্রামে নানা রকম আলোচনা শুরু হয়। তবে সে সবে কোনও পাত্তা দেননি রূপরাম। শুধু তাই নয়, নিজের মেয়েদের ছেলের চেয়ে কোনও অংশে কম মনে করেননি তিনি। তাই পড়াশোনাতেও কোনও খামতি রাখতে দেননি। মূলত, তাঁরই অধ্যাবসায়ের ফলে তাঁর ৬ মেয়ে এবং এক ছেলে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে একেবারে শীর্ষে পৌঁছেছেন।

প্রথম মেয়ে অঞ্জনা ৬ বছর আগে স্বামীকে পথ দুর্ঘটনায় হারিয়েও বাবার অনুপ্রেরণায় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাস করে মেয়র হয়েছেন। তাঁর দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়ে গোমতি এবং রাজেশ্বরী যথাক্রমে জেলার প্রথম মহিলা ডেন্টিস্ট এবং শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েছেন। চতুর্থ কন্যা প্রেম আইটি ইঞ্জিনিয়ার এবং এমবিএ করার পর পুলিশ সার্ভিসের পরীক্ষায় দুরন্ত ফল করেন। এখন তিনি ডিএসপি পদে কর্মরত। পঞ্চম কন্যা ধাওয়ানা সব চেয়ে কম বয়সি মহিলা হিসাবে IIT জোধপুর থেকে বি. টেক করেন। ষষ্ঠ কন্যা প্রিয়া ক্যালিফোর্নিয়াতে মাস্টার্সের পড়াশোনা করছেন।

দিদিরা যেমন তার চেয়ে কোনও অংশেই আলাদা নন ভাই হরিশ। জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে সরকারি চাকরি করতে করতে তিনি ঠিক করেন চাষাবাদে মন দেবেন। ২০১৩-য় বাবা রূপরাম অবসর নেওয়ার পর থেকে তিনি চাকরি ছেড়ে অ্যালোভেরা চাষে মন দেন। আজ বছরে কয়েক কোটি টাকার অ্যালোভেরা বিক্রি হয় তাঁর ফার্ম থেকে। রূপরাম বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় আমার কাছে মাত্র একটিই পোশাক ছিল। প্রতি রাতে আমি তা ধুয়ে দিতাম যাতে পরের দিন ফের পরতে পারি। আমার মনে হয় তোমার জন্ম কোথায় হয়েছে বা তুমি কোথা থেকে এসেছ সেটা কোনও ব্যাপারই নয়। দিনের শেষে একটি জিনিসই বিবেচ্য হবে, তুমি শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছতে পারলে। এই একই শিক্ষায় নিজের সন্তানদের শিক্ষিত করেছেন রূপরাম।


মন্তব্য